যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির মেলন অডিটরিয়ামে এআই-চালিত নতুন সরকারি ওয়েবসাইট ‘আমেরিকা.জিওভি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাক্ষরিত একটি নির্বাহী আদেশ দেখাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৯ সেপ্টেম্বর
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির মেলন অডিটরিয়ামে এআই-চালিত নতুন সরকারি ওয়েবসাইট ‘আমেরিকা.জিওভি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাক্ষরিত একটি নির্বাহী আদেশ দেখাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৯ সেপ্টেম্বর

এআই নিরাপত্তায় প্রযুক্তি নির্বাহীদের সঙ্গে চুক্তি, ডেটা সেন্টার বাড়াতে ট্রাম্পের সমর্থন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ড তৈরিতে সম্মত হয়েছেন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণে সমর্থন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টারের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ার মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার এ কথা বলেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ড তৈরিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

এআইয়ের ঝুঁকি এবং ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই গতকাল হোয়াইট হাউসে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এ কথা বলেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, এআই সিস্টেমগুলো নির্মাতাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ে ‘স্বাধীন নিরীক্ষকদের’ সঙ্গে কাজ করবে তারা। এ ছাড়া তাদের এআই সরঞ্জাম যেন ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রযুক্তিগত সিস্টেমে হ্যাক বা প্রবেশ’ না করে, তা নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুক্তিটির একটি অনুলিপি প্রকাশ করেছেন।

উন্নত এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। সম্প্রতি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অন্য কোম্পানির সিস্টেমে হ্যাক করেছে।

হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতাদের জন্য আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ, স্পেসএক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সিইও জেনসেন হুয়াং। ওয়াশিংটন ডিসি, ২৯ সেপ্টেম্বর

ডেটা সেন্টারগুলো এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং শক্তি সরবরাহ করে। তবে এসব স্থাপনায় বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, ইউটিলিটি খরচ ও স্থানীয় পর্যায়ের নানা প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এ পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর করা চুক্তিকে ‘অনেকটা সংবিধানের মতো’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এতে স্বাক্ষর করেছেন, আর আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতে স্বাক্ষর করেছি। এটা সত্যিই একধরনের সুরক্ষা।’

হোয়াইট হাউসের বাইরে বিরল আয়োজন

প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকটি শুরু হয়েছিল রুদ্ধদ্বার মধ্যাহ্নভোজ দিয়ে। পরে হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে আসেন ট্রাম্প। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হাউস স্পিকার মাইক জনসন এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। হোয়াইট হাউসের ওই জায়গা সাধারণত প্রেসিডেন্টের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য খুব একটা ব্যবহার করা হয় না।

প্রায় ৩০ মিনিট সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন ট্রাম্প। এআইয়ের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের সময় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ার সময় এমন আয়োজন করা হলো। একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নির্বাহীদের মধ্যে ছিলেন ওপেনএআইয়ের গ্রেগ ব্রকম্যান, অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেই, মেটার মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের সুন্দর পিচাই ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।

জাকারবার্গ বলেন, এআই সিস্টেমের জন্য ‘শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে কোম্পানিগুলো সম্মত হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, এআই সরঞ্জামের নিরাপত্তা তদারকিতে ১০ সদস্যের একটি বোর্ড গঠনের কথা বিবেচনা করছেন তিনি। তবে সম্ভাব্য সদস্যদের নাম জানাননি। হোয়াইট হাউসের এআই নীতির নেতৃত্বে শিগগিরই নতুন একজন কর্মকর্তার নাম ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

মধ্যাহ্নভোজ শেষে হোয়াইট হাউসের ড্রাইভওয়েতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে আছেন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতারাও। ওয়াশিংটন ডিসি, ২৯ সেপ্টেম্বর

ডেটা সেন্টার নিয়ে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত

ডেটা সেন্টারের প্রতি তাঁর সমর্থন নভেম্বরে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে কি না, তা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ‘খুশি’ রাখতে কাজ করবে।

পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এই বড়, শক্তিশালী, অত্যন্ত ধনী ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান কোম্পানিগুলো মানুষের জন্য ব্যাপক অবদান রাখবে।’

তবে এআইকে আরও নিরাপদ করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সমালোচনার মুখে পড়েছে। ১৭ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোসের দেশব্যাপী এক জরিপে ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এআইয়ের কারণে সমাজে গুরুতর ক্ষতি ঠেকাতে কোম্পানিগুলো যথেষ্ট কাজ করেনি। আর ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করা ভালো হবে।

ট্রাম্পের প্রচারে এআই নির্বাহীদের অনুদান

২০২৫ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) মাগা ইনকরপোরেটেডে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত অনুদানদাতাদের মধ্যে ছিলেন এআই কোম্পানির নির্বাহী ও বিনিয়োগকারীরা।

প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যাহ্নভোজ শেষে হোয়াইট হাউসের ড্রাইভওয়েতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ। পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, ২৯ সেপ্টেম্বর

ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের গ্রেগ ব্রকম্যান ও তাঁর স্ত্রী আনা ব্রকম্যান ২০২৫ সালে ওই কমিটিকে সম্মিলিতভাবে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন।

সরকারি সেবায় নতুন এআই সরঞ্জাম

ট্রাম্পের প্রযুক্তি নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের দিনই নতুন একটি এআই সরঞ্জাম চালুর ঘোষণা দিয়েছে তাঁর প্রশাসন। কর্মকর্তাদের দাবি, এর মাধ্যমে সরকারি সেবা ব্যবহার সহজ হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেটার দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিক, সিকোয়া ক্যাপিটালের শন ম্যাগুয়ারসহ সিলিকন ভ্যালির নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। এয়ারবিএনবির সহপ্রতিষ্ঠাতা জো গেবিয়া সরঞ্জামটির নকশায় নেতৃত্ব দেন। অনুষ্ঠানের কর্মসূচিতে গুগল, স্পেসএক্স, মেটা ও এইটভিসিকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতাদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, ২৯ সেপ্টেম্বর

অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তাত্ত্বিকভাবে নতুন এআই সরঞ্জামটি ‘খারাপ উদ্দেশ্যের লোকজনের মাধ্যমে হ্যাক করা সম্ভব নয়’। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি তিনি।

একই দিন সরকারি সংস্থাগুলোকে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র বদলে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দ ব্যবহার করার নির্দেশ দেন ট্রাম্প।