
২০টি ট্যাংকার চলাচলের অনুমতিকে ‘কূটনৈতিক জয়’ বলছে হোয়াইট হাউস। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামান্য ছাড়ের জন্য পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এমন সমঝোতা করাটা বেশ দৃষ্টিকটু।
রাশিয়া–ইউক্রেনের ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে ইউক্রেনের হাতে কোনো ‘তুরুপের তাস’ নেই বলতে পছন্দ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ে তাঁর নিজের হাতের তাস কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে।
আপাতদৃষ্টিতে শক্তির ভারসাম্যে ইরানের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের চেয়ে তিন গুণ বেশি জনসংখ্যা ছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এর সঙ্গে ইসরায়েলের পোড়খাওয়া সেনাবাহিনী আর তীক্ষ্ণ গোয়েন্দা জাল যুক্ত করলে লড়াইটা একেবারেই অসম মনে হয়।
তবে ইরান তার সীমিত সামর্থ্যকেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গলার কাঁটা বানিয়ে ছেড়েছে। নিজেদের জনগণের ওপর তারা চরম ভোগান্তির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে ঠিকই। তবে দেশটি কেবল টিকেই থাকেনি; অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতেই।
যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর লড়াইটা এখন দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্পের শক্তি হয়তো বেশি। কিন্তু নিরঙ্কুশ বিজয় পেতে হলে তাঁকে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে, তা সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি তাঁর নেই।
ইরান হয়তো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে হারাতে পারবে না। তবে জ্বালানি রপ্তানির প্রাণকেন্দ্র ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়ে তারা তাদের তুরুপের তাসটির চাল দিয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে দেশটি।
ট্রাম্পের ‘অন্তঃসারশূন্য’ কূটনৈতিক সাফল্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য নিয়ে হোয়াইট হাউসের দাবি আসলে কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের আড়ালের কৌশলগত দুর্বলতাগুলোই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট দাবি করেছেন, আগামী কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরও ২০টি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান। একে ‘প্রেসিডেন্টের কূটনীতির জয়’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি বেশ দৃষ্টিকটু। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তির এমন জায়গায় থাকার কথা নয়, যেখানে সামান্য কিছু ছাড় পাওয়ার জন্য তাদের আলোচনা করতে হয়।
তা ছাড়া জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে দিনে গড়ে ১০০টির বেশি ট্যাংকার চলাচল করত। সেই তুলনায় ২০টি ট্যাংকারের অনুমতি পাওয়া একেবারেই নগণ্য। যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি না হলে এ পথ এমনিতে উন্মুক্ত থাকত।
ফলে লেভিট যেটাকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য কূটনৈতিক বিজয় বলছেন, সেটি আসলে ট্রাম্পের নিজের তৈরি করা সংকটের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মেরামতের চেষ্টামাত্র।
ট্রাম্পের জন্য অপ্রিয় বাস্তবতাটা হলো, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিতভাবেই আছে। কিন্তু সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীকে পাঠালে ইরান যদি কোনোভাবে একটি জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারে, তবে তা তেহরানের জন্য হবে বড় ধরনের ‘প্রোপাগান্ডা’ বিজয়।
আবার ইরানকে পিছু হটাতে হলে ট্রাম্পকে হয়তো শেষ পর্যন্ত স্থলসেনা মোতায়েন করতে হবে। এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে। যেটা ট্রাম্পের নড়বড়ে রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটে ফেলতে পারে।
একই ধরনের দোটানা কাজ করছে পারস্য উপসাগরের উত্তরে ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখল করা নিয়ে। রোববার ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’–কে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি হয়তো ইরানের তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে নিতে পারেন। এমন পদক্ষেপে ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যেতে পারে ঠিকই। কিন্তু তাতে ইরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; বরং এতে ইরান আরও মরিয়া হয়ে পাল্টা আঘাত করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার সুযোগ পাবে।
নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে ট্রাম্প এখন দাবি করছেন, পর্দার আড়ালে ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে। যদিও সরাসরি আলোচনার বিষয়টি ইরান অস্বীকার করেছে। আলোচনার প্রস্তাবের পাশাপাশি তিনি তেহরানকে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
ইতিমধ্যে এ অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা ও এক হাজারের বেশি ‘এয়ারবোর্ন’ সেনা পাঠানো হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তিনি খারগ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালির দ্বীপগুলো দখলের নির্দেশ দিতে পারেন।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান ব্রেমার সোমবার সিএনএনকে বলেন, পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক হওয়ার পথে নেই; বরং এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বড় ধরনের সংঘাতের দিকে যাচ্ছে।
এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি চুক্তিতে না আসে তবে তিনি মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দেশটির সব বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ ও খারগ দ্বীপ ধূলিসাৎ করে দেবেন। এমনকি সুপেয় পানি তৈরির প্ল্যান্টগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মার্কিন বাহিনী হামলা চালালে ইরানও নিশ্চিতভাবেই পাল্টা আঘাত করবে। আর সেই আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো। এমনটা ঘটলে বিশ্ববাজারে চরম ধস নামবে এবং ভয়াবহ মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
বিশেষ করে মরুবেষ্টিত এ অঞ্চলে মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য ‘ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট’ বা লোনাপানিকে মিষ্টি করার কারখানায় বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের জন্য নতুন বিপদ ডেকে এনেছে। এটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে কি না, সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের মুখেই পড়তে হয়েছে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে।
ওয়াশিংটনের হাতে অবশ্য এখনো একটি বড় তুরুপের তাস রয়ে গেছে। তারা চাইলে ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতির ওপর থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। স্বাভাবিক পথে তেল বিক্রি করতে না পেরে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটিতে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে গণবিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনী নৃশংসভাবে দমন করেছে, তার পেছনেও বড় কারণ ছিল এই অর্থনৈতিক বঞ্চনা।
এদিকে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রতিদিনকার যে হিসাব যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে, তা নিয়ে অনেক বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই ‘বডি কাউন্ট’ বা লাশের হিসাবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যা আসলে যুদ্ধের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও ভয়াবহতাকে আড়াল করত।
সোমবার ক্যারোলাইন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, ইরান সরকার যে তাদের হাতে থাকা অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে এবং আলোচনার টেবিলে বসতে ক্রমেই আগ্রহী হয়ে উঠছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে লেভিটের এ বক্তব্যের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতার খুব একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ইরানের হাতে ছোট, কিন্তু মোক্ষম চাল
সামরিক শক্তিতে ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছেও নেই, কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা বিশ্বকে একটি অসম চাপের মুখে ফেলেছে। দেশটির এ পদক্ষেপের ফলে ইতিমধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল আরও কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আর এমন পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার এ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব দেশ তাদের পর্যটন, ট্রানজিট ও ক্রীড়া কেন্দ্র তৈরির মাধ্যমে খনিজ তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছিল, যুদ্ধের কারণে তা এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভবত ঠিকই বলছে, তারা ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রসক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানতে তেহরানের খুব বেশি অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। তারা কেবল হরমুজ প্রণালি বা উপসাগরীয় শহরগুলোয় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেই যে বিপুল অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হবে, তা সামলানোর সাধ্য কারও নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচ তত বাড়বে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, একসময় ট্রাম্পকে বাধ্য হয়ে এমন কোনো চুক্তিতে সই করতে হবে। এটা তাঁকে বিশ্বের সামনে ‘শক্তিশালী নেতার’ বদলে একজন ‘অনুনয়কারী নেতার’ মতো তুলে ধরবে।
তবে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা জরুরি। অন্যদিকে ট্রাম্পের ধৈর্যের বাঁধও দ্রুতই ভেঙে যাচ্ছে। শিগগিরই যদি কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে ট্রাম্প হয়তো পরিস্থিতিকে এমন এক অপ্রতিরোধ্য সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবেন, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না, তাতে ক্ষয়ক্ষতি যা–ই হোক না কেন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি বলেন, একবার যদি তিনি (ট্রাম্প) সেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, তবে যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার বদলে তিনি হামলা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার দিকেই ঝুঁকবেন। তাই ইরানকে বুঝতে হবে, তাদের হাতে অফুরন্ত সময় নেই। যদিও ট্রাম্পের তুলনায় ইরানের হাতে সময় হয়তো কিছুটা বেশি।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে তুরুপের তাস কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন তা কোনো কৌশলগত বিজয় এনে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের হাতেই এমন কিছু সুবিধা রয়েছে, যা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তাদের এই তাসগুলো খুব সাবধানে খেলতে হবে। কোনো পক্ষই যদি অপর পক্ষকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ না দেয়, তবে তা উভয় দেশ এবং পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।