এবার ৪১৫০ মিটার ওপরে আনচেলত্তির পরীক্ষা
ঘটনাটা গত মার্চ মাসের। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এল আলতো স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বলিভিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে। সেই ম্যাচের মাঝে উরুগুয়ের অধিনায়ক হোসে মারিয়া হিমিনেজকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন তিনি আর মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। শ্বাসপ্রশ্বাসে এতটাই সমস্যা হচ্ছিল যে টলতে টলতে গোলপোস্টের বাইরে চলে আসেন তিনি। এরপর মুখে অক্সিজেনের ক্যানিস্টার লাগিয়ে কোনোমতে শ্বাস নেন হিমিনেজ।
আরেকটা ঘটনাও বলা যায়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রথম আন্তর্জাতিক দল হিসেবে এল আলতো স্টেডিয়ামে খেলতে এসেছিল ভেনেজুয়েলা। বলিভিয়ার কাছে ৪-০ গোলে হারের সেই ম্যাচের আগে তাদের অনুশীলনে ফুটবলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন। কম অক্সিজেনে দম ধরে রাখার জন্য ভেনেজুয়েলার খেলোয়াড়েরা ‘হাইপারবিক চেম্বার’-এর ভেতরেও ঢুকেছিলেন।
এল আলতো শুধু বলিভিয়াই নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু শহরগুলোর মধ্যে একটি। যেসব শহরের জনসংখ্যা কমপক্ষে ১ লাখ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত, তাদের মধ্যে এল আলতো সবার ওপরে। এখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার মিটারের বেশি! আর কে না জানে, এমন উঁচু জায়গায় ফুটবলের মতো শারীরিক কসরতের খেলায় শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হবেই। এল আলতোর মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়ামের উচ্চতা ৪ হাজার ১৫০ মিটার। এই মাঠেই আগামীকাল বাংলাদেশ সময় ভোরে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে নামবে ব্রাজিল।
ব্রাজিল যেহেতু ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তাই এই ম্যাচটা তাদের জন্য হয়তো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে চ্যালেঞ্জ তো আছেই। বিশেষ করে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি এবং তাঁর শিষ্যদের জন্য। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ইউরোপে কোচিং করানোর পর এই বছরের মে মাসে ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। তাই দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের চ্যালেঞ্জটা তাঁর জন্য একেবারে নতুন।
এল আলতোর উচ্চতা জয় করার এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আনচেলত্তির নিশ্চয়ই জানা আছে। তিনি এ-ও জানেন যে অতীতে বলিভিয়ার এই উচ্চতার সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক বাঘা বাঘা দল। ২০০৯ সালের বাছাইপর্বে বলিভিয়ার লা পাজের এর্নান্দেজ সাইলেস স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এবারের বাছাইপর্বে কলম্বিয়ার কথাই ধরা যাক। যে দল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছিল, সেই কলম্বিয়াই গত বছর অক্টোবরে এল আলতোয় বলিভিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারে।
আনচেলত্তির আরও জানার কথা, ২০০৭ সালে ফিফা ২ হাজার ৭৫০ মিটারের বেশি উচ্চতার মাঠে খেলা নিষিদ্ধ করেছিল। খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা বলে ফিফা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বলিভিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘ফুটবলেও বর্ণবাদ।’ পরে অবশ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে পৃথিবীর সব দলের কাছেই বলিভিয়ায় খেলতে যাওয়াটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বিশেষ করে ব্রাজিলের কথা তো বলতেই হয়!
২০১৭ সালে এর্নান্দেজ সাইলেসে বলিভিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার পর ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড নেইমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেন। সেই ছবিতে দেখা যায়, ম্যাচের শেষে সতীর্থদের সঙ্গে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। ক্যাপশনে নেইমার লিখেছিলেন, ‘এমন পরিবেশে খেলাটা অমানবিক। মাঠ, উচ্চতা, বল...সবকিছুই বাজে।’
জানিয়ে রাখা ভালো, এল আলতোর উচ্চতা লা পাজের চেয়ে ৫৬০ মিটার বেশি। এখানে পর্যটকদেরও সেখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুদিন লেগে যায়। কারণ, এখানকার বাতাসের চাপ ও ঘনত্ব খুব কম। লেখক আন্দ্রেয়াস ক্যাম্পোমার তাঁর বই ‘গোলাজো!: আ হিস্টরি অব লাতিন আমেরিকান ফুটবল’-এ লিখেছিলেন, ‘আন্দিজ থেকে ভেসে আসা পাতলা বাতাসে দুর্গ বানিয়েছে বলিভিয়া।’
এই নিজেদের দুর্গেই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সপ্তম স্থানটির জন্য লড়বে বলিভিয়া। এই স্থান পেলে তাদের প্লে-অফ খেলে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠার সুযোগ থাকবে। সপ্তম স্থানের জন্য মূল লড়াইটা ভেনেজুয়েলা এবং বলিভিয়ার মধ্যে। ব্রাজিলের বিপক্ষে পুরো ৩ পয়েন্ট পেলে বলিভিয়া অনেকটাই এগিয়ে যাবে। বর্তমানে ১৭ ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে সাতে ভেনেজুয়েলা। আর সমান ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে আটে আছে বলিভিয়া।
বলিভিয়ার প্রতিপক্ষ যে ব্রাজিল, সেটা তো আর ভুলে গেলে চলবে না। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারা। কোচ আনচেলত্তি আগেই সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর অভিধানে ‘আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচ’ বলে কিছু নেই। প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এল আলতোর উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সব তথ্য সংগ্রহ করছেন এই ইতালিয়ান কোচ।
ব্রাজিল দল ইতিমধ্যেই বলিভিয়ায় পৌঁছেছে। সেখানকার তুলনামূলক কম উচ্চতায় অবস্থিত শহর সান্তা ক্রুজে রাত কাটিয়েছে তারা। উচ্চতার কারণে ম্যাচের আগে যেন খেলোয়াড়দের ফুসফুসে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে জন্য সান্তা ক্রুজেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রাজিলের কোচিং স্টাফ। ম্যাচ শুরুর মাত্র তিন ঘণ্টা আগে তারা সরাসরি এল আলতো স্টেডিয়ামে যাবে।
শুধু তা-ই নয়, এত উচ্চতায় ডাগআউটে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা যেহেতু আনচেলত্তির নেই, তাই তিনি অভিজ্ঞ কারও সহায়তাও নিয়েছেন। তিনি হলেন আনচেলত্তিরই ছেলে এবং বোতাফোগোর কোচ দাভিদ আনচেলত্তি। গত মাসে কোপা লিবার্তাদোরেসের শেষ ষোলো থেকে বাদ পড়েছিল বোতাফোগো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৮৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ইকুয়েডরের ক্লাব এলডিইউয়ের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিলের ক্লাবটি।
সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি এ নিয়ে বলেছেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা হয়। সে আমাকে তার অভিজ্ঞতার কথা বলেছে। খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গেও কথা বলেছি। ভুল না করতে আমাদের যা যা তথ্য দরকার, সবই আমরা পেয়েছি। ’ বলিভিয়ার অভিজ্ঞতা অর্জনে তিনি কতটা আগ্রহী, সেটা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, ‘আমি এটাকে সুন্দর অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করছি। কখনো বলিভিয়ায় যাইনি, লা পাজেও না। এটা হবে গুরুত্বপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা। আমি চাই দল ভালো খেলুক। জয়ই আমাদের লক্ষ্য। ’
বলিভিয়ায় খেলার ধরনে যে পরিবর্তন আনতে হবে, সে কথাও বলেছেন আনচেলত্তি। সর্বশেষ চিলির বিপক্ষে ম্যাচের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘চিলির বিপক্ষে যেমন খেলেছি, তার থেকে আলাদা ফুটবল খেলতে হবে। ম্যাচটা খুব চাপের ছিল। কিন্তু উচ্চতায় সেটা করা যাবে না। রক্ষণ ও আক্রমণে আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকবে। আক্রমণে বল তুলনামূলক আরেকটু দ্রুত গতিতে যাবে। কৌশলগতভাবে আমাদের এ বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। ’
ইউরোপিয়ান ফুটবলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আনচেলত্তি তাঁর নিজের চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছেন, ‘জাতীয় দলের জন্য এটা নতুন কিছু না। হয়তো আমার জন্য নতুন। ইউরোপের কোনো শহরই ২ হাজার ৮৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত নয়। আর ম্যাচ খেলার জন্য ছয় ঘণ্টাও ভ্রমণ করতে হয় না। তাই মানিয়ে নিতে হবে। ’
ব্রাজিলের একাদশেও কিছু পরিবর্তন আনবেন আনচেলত্তি। কাসেমিরোর জায়গায় আন্দ্রে সান্তোসের খেলা মোটামুটি নিশ্চিত। আক্রমণে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হতে পারে ফ্ল্যামেঙ্গোর স্ট্রাইকার স্যামুয়েল লিনোর। রাইটব্যাক ওয়েসলি হালকা চোট পাওয়ায় তাঁর জায়গায় দেখা যেতে পারে ভিতিনিওকে। তবে আনচেলত্তি চিলির বিপক্ষে ম্যাচের একাদশ থেকে একেবারে পাল্টে ফেললেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
১৯৭৩ সালে আর্জেন্টিনা দলের একটি কৌশল থেকে শিক্ষাটি নিতে পারেন আনচেলত্তি। ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে এই ঘটনার কথা বলেছিলেন বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি মারিও কেম্পেস।
বলিভিয়ার বিপক্ষে হোম ও অ্যাওয়ে ম্যাচের জন্য তৎকালীন আর্জেন্টিনা কোচ ওমর শিভোরি দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দল গঠন করেছিলেন। বলিভিয়ার মাঠের ম্যাচের জন্য একটি স্কোয়াডকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন বেশ কিছুদিন আগেই। বলিভিয়ার মাঠে ১-০ গোলে সেই ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
ব্রাজিল কী করে, সেটা জানতে আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর সাড়ে পাঁচটায় এই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে আনচেলত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু ম্যাচ না বলে এটাকে ‘উচ্চতার পরীক্ষা’ বলাই শ্রেয়।