পাখি

কালো কাঁচিচোরা

গত মার্চে কালো কাঁচিচোরার এই ঝাঁকের ছবি বাইক্কা বিল থেকে তুলেছেন আদনান আজাদ
গত মার্চে কালো কাঁচিচোরার এই ঝাঁকের ছবি বাইক্কা বিল থেকে তুলেছেন আদনান আজাদ

পায়ের পাতা ডোবা জল জলাজমি। ওই জলেই হেঁটে হেঁটে তিনটি পাখি ঠোঁট চুবিয়ে খাবার খুঁজছে। একটি পাখি শামুকের পিঠের শক্ত খোলস ঠোঁটে দিয়ে ঠক ঠক শব্দে ফুটো করে ফেলল। তারপরে ঠোঁট ফাঁক করে বহির্মুখী চাপে আলগা করে ফেলল খোলসটা, খেতে শুরু করল শামুকের মাংস। দেশের চিংড়ি খামারগুলোতে এই শামুকের মাংস সরবরাহ করে যেসব লোক, তারা শামুক কুড়িয়ে তারকাঁটা-হাতুড়ি দিয়ে প্রথমে ফুটো করে শামুকের পিঠ, তারপরে ভেতরে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে খোলস আলগা করে মাংস বের করে। জলাজমির এই তিনটি পাখিও যেন একই কাজ করছে।

কাস্তের মতো লম্বা ঠোঁটটি এদের বাটা​িলর মতো শক্ত, মাথাটা যেন হাতুড়ি! শামুকের মুখের খোলটাও এরা আলগা করে ফেলতে পারে দু-এক ঠোকরে। পাখিটির নাম লাল কাঁচিচোরা, কালো কাঁচিচোরা, লালচোরা, কাচিখোঁচা, চকচকে দো-চরা ইত্যাদি। ইংরেজি নাম Glossy ibis। বৈজ্ঞানিক নাম Plegadis falcinellus। দৈর্ঘ্য ৫৫-৬৫ সেন্টিমিটার।

এদের মূল খাবার অবশ্য নানান রকম জলপোকা, ফড়িং, মাছ, অন্যান্য পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, ব্যাঙাচি ইত্যাদি। গুগলি শামুক এদের অতি প্রিয় খাদ্য। জলাভূমির পাখি এরা। জলের ভেতর দিয়ে বাঁ পাশে লম্বা পায়ে মার্চ করে এগোয় এরা খাবার সার্চ করতে করতে।

এরা আমাদের শীতের পরিযায়ী পাখি। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই এ দেশে চলে আসে। ফিরে যায় মার্চ-এপ্রিলে। একনজরে সবুজাভ-গাঢ় বাদামি দেখায়, ঘাড়-মাথা বাদামি, তাতে খাড়াভাবে সাদা সাদা সরু টান আঁকা। ডানার উপরিভাগের প্রান্তজোড়া শাড়ির আঁচলের মতো চওড়া চকচকে সবুজাভ-নীলচে। যখন প্রজনন মৌসুম, তখন এদের চেহারা যায় খুলে, একনজরে তখন ঘন-জলপাই অথবা লালচে মেরুন-সবুজ পাখি। সবুজ-বেগুনি চমৎকার ছিটছোপ ঘাড়-চিবুক-গলাজুড়ে। সারা শরীরে যেন নীলচে-সবুজ তেল মাখানো। চোখের পাশ থেকে ঠোঁটের গোড়া পর্যন্ত দুটো সাদা টান। বুক-পেট জলপাইরঙা। ঠোঁট জলপাই-ধূসর, তাতে বাদামির আভা। পা ও পায়ের পাতা রুপালি-বাদামি। পুরুষের চেয়ে মেয়েটি ছোট হয়। এরাও এদের জাতভাই ধলবদনীর (Black-headed ibis) মতো জল-কাদার ভেতরে মাথাসহ লম্বা ঠোঁটটি ঢুকিয়ে দিয়ে খাবার তল্লাশি করে। দলে দু-তিনটি কিংবা আরও বেশি থাকে। আকাশে ইংরেজি ‘V’ বা ‘U’ অক্ষর এঁকে এরা দ্রুত ডানায় ওড়ে।

 বাসা করে ছোট আকারের, সরু ডালপালা দিয়ে। ডিম দু-তিনটি, রং নীলচে-সবুজ। দুজনেই তা দেয়। ফোটে ২১ দিনে।