
রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় বাঘ দম্পতি বেলি–টগর জন্ম দিয়েছে চারটি বাচ্চা। এর মধ্যে তিনটি বাচ্চার গায়ের রং সাদা (অ্যালবিনো) বা সাদার মধে৵ কালো দাগ। আরেকটি বাচ্চার গায়ের রং হালকা হলুদ ও সাদার মধে৵ কালো দাগ।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার শনিবার প্রথম আলোকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই মাস আগে ৪ জানুয়ারি বাঘিনী বেলি চারটি বাচ্চার জন্ম দেয়। জন্মের পর থেকে বাচ্চাগুলো সুস্থ–সবল আছে। জাতীয় চিড়িয়াখানায় এই প্রথম কোনো বাঘিনী চারটি বাচ্চা জন্ম দিল।
এর আগে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল জুঁই, জবা ও রঙ্গন নামে তিনটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল বেলি–টগর দম্পতি। এ ছাড়া তারা আরও দুবার দুটি করে বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল। বেলি প্রথম বাচ্চা দিয়েছিল ২০২১ সালের ২৫ মে। তার জন্ম ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর।
২০২২ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় রাজ ও পরি নামের বাঘ দম্পতি চারটি সাদা বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল।
বেলি–টগর এবার যে চারটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, তাদের নাম এখনো রাখেনি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। তারা বাঘের বাচ্চা চারটির লিঙ্গও এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি।
জাতীয় চিড়িয়াখানার অ্যানিমেল রেয়ারিং শাখার (মাংসাশী) কার্যালয়ের কাছেই একটি খাঁচায় মা বেলিসহ চারটি ব্যাঘ্রশাবককে রাখা হয়েছে। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, জাল দিয়ে খাঁচার আশপাশ এলাকা আটকে রাখা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা কাছাকাছি যেতে না পারেন। এ ছাড়া খাঁচাজুড়ে মশারি দেওয়া হয়েছে, যাতে মাছি বা পোকামাকড় যেতে না পারে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর আগে মাছির কামড়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এখানে বাঘের বাচ্চা মারা গেছে। সে কারণে তারা এবার এমন ব্যবস্থা নিয়েছে।
মা বেলি ও বাঘের বাচ্চা চারটিকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অ্যানিমেল রেয়ারিং শাখার (মাংসাশী) সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, বাচ্চারা ঘোরাফেরা করছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, মা বেলি ও বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে।
দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বেলি গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে টগরকে আলাদা রাখা হচ্ছে। বাচ্চা জন্মের পরও টগর আলাদা আছে। বাচ্চা চারটি এখনো মায়ের দুধ খাচ্ছে। তবে মা বেলিকে দেওয়া মাংস বাচ্চারা চেখে দেখে, কখনো খাওয়ার চেষ্টা করে। বাঘের বাচ্চারা সাধারণত চার মাস বয়সে মাংস খাওয়া শুরু করে। এই বাচ্চাদের বয়স আট মাস হলে তাদের দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, চারটি বাচ্চাসহ এখানে মোট বাঘের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬। জাতীয় চিড়িয়াখানায় মোট পাখি–প্রাণীর সংখ্যা এখন ৩ হাজার ৫০৬।
সাদা বাঘিনীর মৃত্যু যেভাবে
বেলি–টগর দম্পতির ঘরেই ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল এসেছিল জুঁই, জবা ও রঙ্গন নামে তিনটি বাচ্চা। এর মধ্যে জুঁই ছিল সাদা (অ্যালবিনো)। জাতীয় চিড়িয়াখানায় এটিই ছিল প্রথম কোনো সাদা বাঘের জন্ম। ছোট্ট জুঁই একসময় বড় হয়, হয় প্রজননক্ষম। এ অবস্থায় জুঁই ও কসমসকে রাখা হয় এক খাঁচায়। ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর মিলনের সময় কসমসের কামড়ে মৃত্যু হয় জুঁইয়ের।
কসমসের জন্মও জাতীয় চিড়িয়াখানায়। তার জন্ম ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল শিউলী–কদম দম্পতির ঘরে।
এ বিষয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, পুরুষ বাঘ মিলনের সময় বাঘিনীর ঘাড় ও গলায় কামড় দিয়ে ধরে রাখে। বাঘিনী যখন মিলনে সহযোগিতা করে, তখন সেই কামড়ে তার ক্ষতি হয় না। বাঘিনী মিলনে সহযোগিতা না করলে অনেক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে পুরুষ বাঘ শক্ত করে কামড় দেয়। তখন বাঘিনীর মৃত্যু হওয়ার ঘটনা প্রকৃতিতে আছে। জুঁইয়ের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়েছিল। পুরুষ বাঘের (কসমস) কামড়ে জুঁইয়ের শ্বাসনালি ছিদ্র হয়ে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। জাতীয় চিড়িয়াখানায় এটিই প্রথম কোনো বাঘের কামড়ে বাঘিনীর মৃত্যুর ঘটনা।
জুঁইয়ের বিদায়ের কয়েক দিন পরই বেলি তিনটি (চারটির মধ্যে তিনটি) সাদা বাঘের জন্ম দেয় এখানে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেঙ্গল টাইগারের প্রকৃত রং অ্যালবিনো বা সাদা নয়। বেঙ্গল টাইগারের গায়ের রং সাধারণত হয় হলুদ–কালো ডোরাকাটা। যখন সাদা হয়, তখন এটি জিনগত বিচ্যুতি, যা স্বাভাবিক নয়। ব্যতিক্রম হওয়ায় দর্শনার্থীরা সাদা বাঘ দেখতে পছন্দ করেন।
জিরাফের ঘরেও নতুন অতিথি
জাতীয় চিড়িয়াখানায় জিরাফ দম্পতি রাজা–লাবণ্যের ঘরে জন্ম হয়েছে একটি বাচ্চার। গত ১০ জানুয়ারি বাচ্চাটির জন্ম হয়। রাজা–লাবণ্য এর আগে আরও তিনবার বাচ্চা দিয়েছে। এ নিয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানায় বাচ্চাসহ জিরাফের সংখ্যা দাঁড়াল ৭–এ।
জিরাফের এই বাচ্চা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা আছে। চিড়িয়াখানায় গতকাল দেখা যায়, মা লাবণ্যের সঙ্গে চঞ্চল বাচ্চাটিকে। মা জিরাফ এদিক–সেদিক গেলে পেছনে পেছনে সে–ও যাচ্ছে। মা লাবণ্য কখনো কখনো সন্তানকে আদর করে দিচ্ছে।