মোহাম্মদপুরে তেলের জন্য ১২ ঘণ্টার অপেক্ষা, খাওয়া–ঘুম নেই, হলো ছিনতাইও

১২ ঘণ্টা ধরে তেলের জন্য অপেক্ষা করেছেন চালক বেলাল হোসেন। হয়েছে ছিনতাইও
ছবি: আহমেদ উল্যা ইউসুফ

‘খাওয়া–ঘুম সব বাদ দিয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেছি। ছিনতাইয়ের শিকার হলাম। এখন তেল পেলাম মাত্র তিন হাজার টাকার। হাইয়েস গাড়ি হওয়ায় তা–ও তিন হাজার টাকার পেয়েছি। ব্যক্তিগত গাড়ি দুই হাজার টাকার পাচ্ছে।’

আক্ষেপ নিয়ে এ কথা বললেন বেলাল হোসেন। থাকেন রাজধানীর মিরপুর–১৪ নম্বর এলাকায়। মিরপুরের কয়েকটি পেট্রলপাম্প ঘুরেও তেল পাননি। অগত্যা মাইক্রোবাস (হাইয়েস) নিয়ে তেল কিনতে আসেন মোহাম্মদপুরে। গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১০টায় জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীর আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়ান।

জেনেভা ক্যাম্পের পাশে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের পেছনের ফটকের সামনে অবধি সারি পৌঁছে গিয়েছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়ান বেলাল হোসেন। ঘণ্টা পাঁচেক পেরিয়ে একটু একটু করে ইকবাল রোড অবধি এগিয়ে আসেন বেলাল।

ঘড়িতে তখন রাত তিনটা পেরিয়ে গেছে। পাম্পে তেল শেষ। বন্ধ করে দেওয়া হয় সরবরাহ। উপায় না পেয়ে সেখানেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন বেলাল। ১০টার পর থেকে কিছুই খাননি। ভ্যাপসা গরম ও ক্ষুধা–তৃষ্ণায় বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার ওপর ছিল পথের ধুলা আর মশার অত্যাচার।

খাওয়া–ঘুম সব বাদ দিয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেছি। ছিনতাইয়ের শিকার হলাম। এখন তেল পেলাম মাত্র তিন হাজার টাকার। হাইয়েস গাড়ি হওয়ায় তা–ও তিন হাজার টাকার পেয়েছি। ব্যক্তিগত গাড়ি দুই হাজার টাকার পাচ্ছে।
বেলাল হোসেন, গাড়িচালক।

বেলাল বললেন, ক্লান্ত শরীরে ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল। গাড়ির জানালা খোলা ছিল। তখনই একদল কিশোর ছিনতাইকারী এসে চালকের আসনের পাশে থাকা মানিব্যাগ নিয়ে দৌড় দেয়। পাশের আরেকটি গাড়ির চালক সেটা দেখে ফেলেন। ছুটে গিয়ে মানিব্যাগ উদ্ধার করে আনেন। কিন্তু সেটায় থাকা টাকা ছিনতাইকারীরা নিয়ে নেয়।

সারিতে থাকা প্রায় সব চালকই তখন ঘুমে। এ সুযোগ নেয় ছিনতাইকারীরা। বেলাল বলেন, ‘অন্ধকার থাকায় প্রথমে বুঝতে পারিনি, কী ঘটেছে। পরে পাশের চালক যখন মানিব্যাগ এনে দেয়, তখন ছিনতাইয়ের কথা বুঝতে পারি। ওরা সংখ্যায় বেশি ছিল। তাই মানিব্যাগ উদ্ধার করে আনা চালক ভয়ে চিৎকার করতে কিংবা বাগ্‌বিতণ্ডায় যেতে সাহস পাননি।’

বেলাল আরও বলেন, ‘তেল কেনার জন্য সঙ্গে আনা ১০ হাজার টাকা আর মুঠোফোন অন্য জায়গায় রাখা ছিল। তাই খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। ছিনতাইকারীরা অল্প কিছু টাকা নিয়ে গেছে।’

এরও ঘণ্টা পাঁচেক পর বেলা ১১টার কিছু পরে বেলালের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জানালেন, ১০টার দিকে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছিল। কিছুক্ষণ আগে তিনি তেল পেয়েছেন।

দাম বাড়লেও সরবরাহ সীমিত

দেশে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও মানুষের তেল পাওয়ার ভোগান্তি দূর হয়নি। সকাল ১০টা থেকে আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ও তালুকদার ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেল।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন কোম্পানিগুলোকে অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ করে বাড়াতে বলা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গতকাল রাতেই সংশ্লিষ্ট জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে চিঠি দেওয়া হয়।

পেট্রলপাম্পগুলো সোমবার থেকেই বাড়তি সরবরাহের জ্বালানি তেল পাওয়ার কথা। আজ সকাল ১০টায় সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে নতুন করে এক ট্রাক তেল আসে। জানতে চাইলে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হৃদয় চন্দ্র দাস বলেন, ‘নতুন করে যে ট্রাকটি এসেছে, সেটায় বাড়তি তেল নেই। ডিপো থেকে কখন সরবরাহ করা হবে, সেটা জানা যায়নি।’

জানা গেল, ওই সময় পেট্রলপাম্পটিতে ২২ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন ছিল। সরবরাহ বাড়ানো হলে তা ২৫ হাজার লিটারে উন্নীত হবে। আর পেট্রল ও ডিজেল আছে ৪ হাজার ৫০০ লিটার। সরবরাহ বাড়লে তা ৫ হাজার লিটার হবে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী অকটেন দিতে গেলে সরবরাহ ৫০–৬০ হাজার লিটার করতে হবে বলে জানান হৃদয়।

হৃদয় আরও বলেন, ‘আমরা এখনো বাড়তি সরবরাহ পাইনি। খোঁজ নেওয়া হয়েছে, কখন থেকে বাড়তি সরবরাহ শুরু হবে, সেটাও পরিষ্কার নয়। আজ বিকেলে বোঝা যাবে, সরবরাহ বাড়ে কি না।’

অপেক্ষায় কয়েক শ গাড়ি

তেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে রাস্তার পাশেই বসে ঝিমাচ্ছেন এই মোটরসাইকেলচালক। তিনি চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। আজ সোমবার আসাদ গেট সোনার বাংলা পাম্পের সামনে

সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা গাড়ির লম্বা সারি মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড হয়ে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের পাশ দিয়ে গজনবী রোড পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। সারিতে রয়েছে কয়েক শ প্রাইভেট কার, হাইয়েস আর পিকআপ। আর মোটরসাইকেলের সারি আসাদ অ্যাভিনিউ হয়ে টাউন হল ছাড়িয়েছে। কথা বলে জানা গেল, বেশির ভাগ মোটরসাইকেলের চালক ভোর থেকে সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন।

হাজারীবাগ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে সকাল ছয়টায় এসে সারিতে দাঁড়িয়েছেন ওমর ফারুক। রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। ওমর ফারুক বলেন, ‘যেদিন তেল নিতে আসি, সেদিনের উপার্জন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসে।’

সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাস থাকলে ১ হাজার ২০০ টাকার, না থাকলে ৫০০ টাকার অকটেন দেওয়া হচ্ছে। সকাল ১০টার দিকে ওমর ফারুকের সঙ্গে যখন কথা হলো, সবে তেল পেয়েছেন তিনি। বললেন, ‘এতক্ষণে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার রাইড শেয়ারিং করতে পারতাম। অফিসের সময় শেষ। খাওয়া–গোসল শেষে আবার বের হতে বিকেল হয়ে যাবে। তেল নিতে এলে এমনই হয়। কখনো পুরোটা দিন চলে যায়।’

‘তেল আসবে সন্ধ্যা ৬টার পর’

বেলা ১১টার দিকে আসাদ গেটের আরেকটি পেট্রলপাম্প তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাশ কাউন্টারের সামনে একটি ছোট প্ল্যাকার্ড টাঙানো। তাতে লেখা, ‘তেল আসবে সন্ধ্যা ৬টার পরে।’

প্রতিষ্ঠানটির ক্যাশিয়ার নূর ইসলাম বলেন, ‘মানুষ এত বেশি প্রশ্ন করে, কাজ করতে পারি না। তাই বাধ্য হয়ে প্ল্যাকার্ড টাঙিয়ে দিয়েছি।’

আসাদ গেটের আরেকটি পেট্রলপাম্প তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাশ কাউন্টারের সামনে একটি ছোট প্ল্যাকার্ড টাঙানো। তাতে লেখা, ‘তেল আসবে সন্ধ্যা ৬টার পরে’

ওই সময় তালুকদার পাম্প থেকে তেল কেনার অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি গণভবন মোড় হয়ে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। সারিতে ব্যক্তিগত গাড়ি বেশি ছিল। মোটরসাইকেলের সারি দেখা যায়নি।

নূর ইসলাম জানান, সকাল সাতটার কিছু পরে তাঁদের পাম্পে তেল শেষ হয়ে যায়। তাই সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাড়তি তেল সরবরাহ হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।