বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার রাতেও ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সাত শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে গত তিন দিনে রাজধানীতে মোট ১ হাজার ২৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির অভিযোগ, তাদের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে দলের নেতা-কর্মীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
এ ছাড়া বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে গতকালও ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশমুখে পুলিশের তল্লাশিচৌকি ছিল। সেখানে পুলিশ যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাস ও কারে তল্লাশি করে। এ সময় যাত্রীদের মুঠোফোন ঘেঁটে বিএনপির মহাসমাবেশে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে জেরা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর খেয়াঘাটগুলোতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন বলেও জানা গেছে।
আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, আগের রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার সাত শতাধিক ব্যক্তিকে গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে।
বিএনপির অভিযোগ, তাদের মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার রাত থেকে পুলিশ রাজধানী ও আশপাশের জেলায় অভিযান শুরু করে। এ পর্যন্ত তাদের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে আটক করে পুরোনো মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। অনেককে সন্দেহমূলক বা ভবঘুরে দেখিয়েও গ্রেপ্তার করা হয়।
অপর দিকে পুলিশের দাবি, এটা পুলিশের নিয়মিত অভিযান। তারা মামলা ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করছে।
আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, আগের রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার সাত শতাধিক ব্যক্তিকে গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে।
ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ উত্তরার আবদুল্লাহপুর মোড়। ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক এসে যুক্ত হয়েছে আবদুল্লাহপুর মোড়ে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে এ পথে মানুষ ঢাকায় আসে। ঢাকা-আশুলিয়া সড়ক হয়ে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ রাজশাহী বিভাগের একাধিক জেলার লোকজনও এই পথে রাজধানীতে আসেন। এই দুটি সড়ক ঘিরেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত পুলিশের তল্লাশি ছিল।
সরেজমিন গতকাল সকালে আবদুল্লাহপুর এলাকায় দেখা যায়, বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কের নিচে পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে ১০ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। দূরপাল্লার কোনো বাস এলেই গতি রোধ করেছেন তাঁরা। বাসে উঠে যাত্রীদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা জিজ্ঞাসা করছেন পুলিশের সদস্যরা। কাউকে কাউকে বাস থেকে নামিয়ে তল্লাশি করছেন। এ সময় মুঠোফোন ঘেঁটে কয়েকজন যাত্রীকে আটক করতে দেখা যায়।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওই তল্লাশিচৌকিতে ৩০ জনকে আটক করতে দেখা গেছে। পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা দলবদ্ধ হয়ে বিএনপির মহাসমাবেশে যাচ্ছিলেন। বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকায় তাঁদের আটক করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের দাবি, পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই তাঁদের আটক করেছে।
আমরা বৃহস্পতিবার রাত থেকে তল্লাশি চালাচ্ছি। তবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির
রফিকুল ইসলাম নামের এক যাত্রীর দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি কোনো সভা-সমাবেশেও যাচ্ছেন না। তবু বাসে তল্লাশির সময় তাঁর ব্যাগ, মুঠোফোন তল্লাশি করা হয়েছে। এতে তিনি বিরক্ত। তাঁর ভাষ্য, ‘তল্লাশির নামে এটা যাত্রী হয়রানি ছাড়া আর কিছু না। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করা হচ্ছে।’
উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বৃহস্পতিবার রাত থেকে তল্লাশি চালাচ্ছি। তবে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।’
আবদুল্লাহপুরের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায়ও পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। ফলে ওই পথে গতকাল সকাল থেকে যানবাহন চলাচল কম ছিল। সকালে সেখানে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাকরাইলে যাব। এক ঘণ্টা ধরে গাড়ির জন্য সাইনবোর্ড এলাকায় অপেক্ষা করছি; কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ পর কোনো গাড়ি এলেই থামতে না দিয়ে পুলিশ তাড়িয়ে দিচ্ছে, যাত্রীরা যেতে পারছে না।’
শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের মহাসমাবেশে যেতে দেয়নি। তারা আমাদের ১০ জনের নাম-ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর লিখে রেখেছে। আমাদের গাড়িটি চালকসহ আটক করেছে।মাইক্রোবাসের যাত্রী আবদুল কাইয়ুম
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব সুলতানা কামাল সেতু এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, পুলিশ ঢাকামুখী বাস, কার ও মাইক্রোবাসে তল্লাশি করছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছে ঢাকায় যাওয়ার কারণ জানতে চাইছে। অনেক যাত্রীর মুঠোফোনও ঘেঁটে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থক কি না, পুলিশ বোঝার চেষ্টা করে। ঢাকামুখী তিনটি মাইক্রোবাস থামিয়ে ফেরত পাঠায় পুলিশ।
একটি মাইক্রোবাসের যাত্রী আবদুল কাইয়ুম নিজেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর পৌরসভা শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের মহাসমাবেশে যেতে দেয়নি। তারা আমাদের ১০ জনের নাম-ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর লিখে রেখেছে। আমাদের গাড়িটি চালকসহ আটক করেছে। পুলিশ হুমকি দিয়ে বলেছে, ঢাকার সমাবেশে গেলে আমাদের নামে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চুরির মামলা দেবে। মহাসমাবেশে কোনো গ্যাঞ্জাম হলে আমাদের নামে মামলা করবে।’
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, সাভার, হেমায়েতপুর ও আমিনবাজার এলাকায়ও তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়া, আশুলিয়ার ধউর, জিরানী, জিরাবো ও বাইপাইলেও তল্লাশি করা হয়। সাভারের আমিনবাজার এলাকার তল্লাশিচৌকিতে রাখা প্রিজন ভ্যানে আটকে রাখা কয়েকজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দল করি বইলা হেরা গ্রেপ্তার করল।’
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার মানিকগঞ্জ-হেমায়েতপুর আঞ্চলিক মহাসড়কেও পুলিশকে তল্লাশি করতে দেখা যায়।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জের বছিলা সেতুর কাছে ঘাটারচর, বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর কাছে কদমতলী ও ঢাকা-মাওয়া সড়কের হাসনাবাদে ঢাকাগামী যানবাহনগুলোতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। পুলিশ সূত্র জানায়, বছিলা সেতুর কাছ থেকে ১৩ জন এবং হাসনাবাদ ও বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ৭২ জনকে আটক করা হয়েছে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রথম আলোর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার ও কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি]