ছিনতাই
ছিনতাই

ঢাকার পথে পথে–৩

‘বাঁচতে চাইলে সব দে’, ঢাকায় ঢুকেই যাত্রাবাড়ীতে তাঁরা অপরাধের শিকার

তখন ভোর। রাঙামাটির বাসে ঢাকায় এসে যাত্রাবাড়ীতে নামেন চিকিৎসক শামসুন্নাহার হেনা। যাবেন চাঁদপুরে। ভোরের লঞ্চ ধরতে রিকশায় যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা দেন সদরঘাটের উদ্দেশে।

তারপর কী হয়েছে, তা বর্ণনা করেন শামসুন্নাহার নিজেই। মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রাবাড়ী মোড়ের কাছে তিনজন ছিনতাইকারী রিকশাটি থামায়। তাদের একজন রিকশাচালকের গলায় চাকু ধরে, অন্যজন তাঁর (শামসুন্নাহার) গলায়। আরেকজন সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগে কী কী আছে, তা জানতে চায়।

শামসুন্নাহার বলেন, ‘তারা আমার গলায় চাকু ধরে বলে, “জান বাঁচাইতে চাস, নাকি মাল চাস? বাঁচতে চাইলে সব দে।” তখন আমি ভয়ে ভয়ে বলি, জান চাই। তারপর ওরা ফোন, লাগেজ—সবকিছু নিয়ে যায়।’

যাত্রাবাড়ীর এ ছিনতাইয়ের ঘটনা গত ৩ ফেব্রুয়ারির। পরদিন শামসুন্নাহার যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন। তিনি বলেন, র‍্যাবে তাঁর এক আত্মীয় চাকরি করেন। তাঁর সহায়তায় মুঠোফোনটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে অন্য কিছু ফেরত পাননি।

যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় এলাকায় ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট—এই চার দিন ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারীরা ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই ছিনতাই করে। পুলিশ বলছে, তারা নিয়মিত ছিনতাইকারীদের ধরছে। তবে ছিনতাই বন্ধ হয় না। জামিনে বেরিয়ে ছিনতাইকারীরা আবার ছিনতাই শুরু করে।

ফরিদপুর থেকে গাড়িতে যাত্রী নিয়ে ১২ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন রাজু শেখ। গাড়িটি যখন যাত্রাবাড়ীর মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে (উড়ালসড়ক) উঠছিল, তখন কিছুটা যানজটে পড়ে। উড়ালসড়কে রাজু শেখের গাড়ির সামনে থাকা অন্য একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এক ব্যক্তি। গাড়িটির চালক ও যাত্রীরা তা দেখে ফেলেন এবং নেমে ওই ব্যক্তিকে কয়েকটি কিলঘুষি দিয়ে ছেড়ে দেন।

ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। চালক ও যাত্রীরা আবার গাড়িতে উঠতেই ওই ব্যক্তি তাঁদের গাড়ির পিছু নেন। এ ঘটনার কিছু অংশ ভিডিও করেন রাজু শেখ। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন তিনি।

রাজু শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল যে ছিনতাইকারীকে ধরে মারধর করার পরও সে ভয় পাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আশপাশে তার সাথে আরও কয়েকজন যুক্ত রয়েছে। নইলে এত সাহস নিয়ে এমন কাজ করার কথা নয়।’ তিনি বলেন, ‘নিয়মিত এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি, এমন ঘটনা প্রায়ই দেখি।’

যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় এলাকায় ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট—এই চার দিন ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারীরা ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই ছিনতাই করে। পুলিশ বলছে, তারা নিয়মিত ছিনতাইকারীদের ধরছে। তবে ছিনতাই বন্ধ হয় না। জামিনে বেরিয়ে ছিনতাইকারীরা আবার ছিনতাই শুরু করে।

দেশের চার বিভাগের মানুষকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয় যাত্রাবাড়ী হয়ে। কিন্তু ঢাকার এ প্রবেশমুখ অনিরাপদ ও বিশৃঙ্খল। সাধারণ মানুষ শুধু সম্পদ নয়, প্রাণও হারাচ্ছেন। যাত্রাবাড়ী থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত জুলাই পর্যন্ত যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের হাতে হত্যার শিকার হয়ছেন অন্তত তিনজন। থানায় ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার মোট মামলা হয়েছে ১১৯টি।

চার বিভাগের মানুষের যাতায়াত

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কের সংযোগস্থল যাত্রাবাড়ী। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, অর্থাৎ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের মানুষের সড়কপথে যাতায়াতের মূল পথ এখন ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়ক, যা শুরু হয় যাত্রাবাড়ী থেকে। যাত্রাবাড়ীর কাছেই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। পদ্মা সেতু চালুর পর সায়েদাবাদে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাসমালিকেরা।

দেশের চার বিভাগের মানুষকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয় যাত্রাবাড়ী হয়ে। কিন্তু ঢাকার এ প্রবেশমুখ অনিরাপদ ও বিশৃঙ্খল। সাধারণ মানুষ শুধু সম্পদ নয়, প্রাণও হারাচ্ছেন। যাত্রাবাড়ী থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত জুলাই পর্যন্ত যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের হাতে হত্যার শিকার হয়ছেন অন্তত তিনজন। থানায় ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার মোট মামলা হয়েছে ১১৯টি। এ সময়ে ছিনতাই, ছিনতাইচেষ্টা ও ডাকাতিচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ১৫১ জনকে প্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ। এর মধ্যে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এমন আসামিও রয়েছেন।

অবশ্য মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে অপরাধের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা করেন না ভুক্তভোগীরা।

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজুর দাবি, ছিনতাইকারীদের কেউ প্রশ্রয় দেয় না। তারা ভাসমান। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছিনতাই করে চলে যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ছিনতাই কমাতে অভিযান পরিচালনা করি। আগের থেকে অপরাধ অনেকটাই কমে এসেছে। ছিনতাইকারীদের ধরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়।’

২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা থানার অপরাধ মানচিত্র ও বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়ক অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে অপরাধ বেশি হয়। ব্যস্ত সড়ক, বেশি মানুষের চলাচল ও দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব স্থান অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। ভোর ও সন্ধ্যায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি।

ভোর ও সন্ধ্যায় ঝুঁকি বেশি

অপরাধে যাত্রাবাড়ীর নাম এত বেশি আসছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এলাকাটি নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা থানার অপরাধ মানচিত্র ও বিশ্লেষণ’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়ক অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে অপরাধ বেশি হয়। ব্যস্ত সড়ক, বেশি মানুষের চলাচল ও দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব স্থান অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। ভোর ও সন্ধ্যায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি।

সায়েদাবাদ থেকে ছাড়ার সময় সুপরিচিত বাস কোম্পানির কর্মীরা যাত্রীদের ছিনতাইয়ের বিষয়ে সতর্ক করেন। তারপরও অনেকে ছিনতাইয়ের শিকার হন। যেমন বান্দরবানে যাওয়ার উদ্দেশে ১২ আগস্ট সায়েদাবাদ থেকে বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী এস আল আমিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাসটি রাত ১০টার দিকে সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ীতে যায়। তার আগেই বাসের সুপারভাইজার সতর্ক করেছিলেন যে জানালা দিয়ে মুঠোফোন ও গয়না ছিনতাইয়ের চেষ্টা হতে পারে। বাসের জানালা বন্ধ রাখতে হবে।

যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়েও কয়েকটি কোম্পানির দূরপাল্লার বাস থামে। এসব বাসের যাত্রীদের মুঠোফোন ও গয়না ছিনিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা ঘুর ঘুর করে।

আল আমিন বলেন, ‘আমরা জানালা বন্ধ রেখেছিলাম। যাত্রাবাড়ীতে ৭ থেকে ৮ বার বাইরে থেকে আমাদের বাসের জানালা খোলার চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। কিন্তু খুলতে পারেনি। আমরা দেখলাম, ওই ব্যক্তিই সামনের বাসের জানালা দিয়ে একজনের মুঠোফোন ছোঁ মেরে নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। আশপাশে পুলিশ থাকার পরও এমন ঘটনা ঘটল।’

যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়েও কয়েকটি কোম্পানির দূরপাল্লার বাস থামে। এসব বাসের যাত্রীদের মুঠোফোন ও গয়না ছিনিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা ঘুর ঘুর করে। ১৬ আগস্ট দুপুরে জনপদ মোড়ে এক ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন চায়ের দোকানদার শরীফুল মিয়া। বলছিলেন, আর দেখলে পা ভেঙে দেবেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এরা ছিনতাইকারী। দেখছেন না ঘুর ঘুর করছে! চুপ করে বসে থেকে ফোন টান দিয়ে নিয়ে দৌড় দেবে। এরা আমাদের ব্যবসার বদনাম করে।’

গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় কাওসার হাওলাদারকে ছিনতাইকারীরা খুন করে বলে পুলিশ বলছে। গত বছরের ১৫ নভেম্বর খুন হন মো. ইউসুফ নামের এক অটোরিকশাচালক। ২০ ডিসেম্বর যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তা এলাকায় রাতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদার নিহত হন।

‘ছুরিকাঘাতে’ তিন খুন

যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে বিগত ১৯ মাসে যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের একজন কাওসার হাওলাদার (২৫)। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় তাঁকে ছিনতাইকারীরা খুন করে বলে পুলিশ বলছে। গত বছরের ১৫ নভেম্বর খুন হন মো. ইউসুফ নামের এক অটোরিকশাচালক। ২০ ডিসেম্বর যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তা এলাকায় রাত একটার দিকে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদার নিহত হন।

ইউসুফের বাবা মো. খোকন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। রাত ১০টার পর থেকে ছেলে আর ফোন ধরেননি। তিনি বলেন, ভোররাত ৪টার দিকে তাঁর মেয়ের ফোনে এক ব্যক্তি ইউসুফের লাশ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

খোকন আরও বলেন, পুলিশ এক আসামিকে ধরেছিল। তিনি জামিন পেয়ে গেছেন। তিনি আরও বলেন, ছেলে হত্যার বিচার তিনি চান। তবে বিচার পাবেন কি না, সে সংশয় তাঁর রয়েছে।

এদিকে গত সোমবার ছিনতাইয়ের অভিযোগে মারধরের শিকার হয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। যুবকের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই যুবককে নিয়ে আসা অটোরিকশাচালক ইসরাফিল সাংবাদিকদের বলেন, যাত্রাবাড়ী বাসস্টেশন এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ওই যুবক হাতেনাতে ধরা পড়েন। পরে ওই নারী তাঁকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে চলে যান। এরপর সেখানে উপস্থিত লোকজন ওই যুবককে পিটুনি দেন।

‘এ রাস্তা খুবই ভয়ংকর’

কুড়িগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী পিংকি পরিবহনের একটি বাস গত ২৫ মে রাতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে। বাসটির সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে পরদিন মামলা করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, বাসটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ৩৬ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসে। রাত দুইটার দিকে বাসটি শনির আখড়া পার হওয়ার পরপরই ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতেরা বাসে উঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখায় এবং যাত্রীদের কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও গয়না নিয়ে যায়।

বাসের সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক ১৭ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, এ রাস্তা খুবই ভয়ংকর। কিন্তু কিছু করার নেই। তাঁদের বাস নিয়ে রাস্তায় নামতেই হয় এবং ঢাকায় যেতে হলে যাত্রাবাড়ী এলাকা পার হতেই হয়।