
ঢাকার উত্তরায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে গৃহকর্ত্রীকে হত্যার পর স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের ঘটনায় শুরুতে কার্যত অন্ধকারে ছিলেন তদন্তকারীরা। গৃহকর্মীর নাম-পরিচয় ভুয়া, কোনো মুঠোফোন নম্বর নেই, বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাও নষ্ট। পাশের বাড়ির একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় যে ফুটেজ পাওয়া যায়, তাতেও মুখ স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত ওই ফুটেজে ধরা পড়া হাঁটার বিশেষ ভঙ্গিই হয়ে ওঠে সূত্র। সেই সূত্র ধরেই খুনিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপপরিদর্শক (এসআই) রবিউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে মুখ দেখে শনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি আমার পরিচিত মনে হয়। তিন বছর আগে একটি চুরির মামলায় এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। তাঁর হাঁটার ভঙ্গির সঙ্গে এই ফুটেজের নারীর মিল পাই। এরপর পুরোনো নথি ও গুগল ড্রাইভে সংরক্ষিত ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হই।’
১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার উত্তরা-৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসার গৃহকর্ত্রী আয়শা আক্তার (৬২) ও তাঁর স্বামী মো. আনোয়ার হোসেনকে (৬৮) চেতনানাশক খাইয়ে লুটপাটের অভিযোগ ওঠে ওই বাসার গৃহকর্মী ‘মারুফার’ বিরুদ্ধে। অতিরিক্ত চেতনানাশক প্রয়োগে গৃহকর্ত্রী আয়শা আক্তারের মৃত্যু হয়। আর আনোয়ার হোসেনকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে জানা যায়, ওই গৃহকর্মীর নাম মারুফা নয়, বিলকিছ বেগম। ঘটনার দুদিন আগে ছদ্মনামে কাজে যোগ দিয়েছিলেন গৃহকর্মী। তিনি আসলে একজন চোর। ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী সেজে কাজ নেন। সুযোগ বুঝে বাসার লোকজনকে চেতনানাশক খাইয়ে অজ্ঞান করে মালামাল লুট করেন তিনি। গত ২১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর থেকে পিবিআই তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তিনি গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিলকিছ বেগমের বয়স ৪৩ বছর। তিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ছদ্মনামে কাজ নেন। তাঁর উদ্দেশ্য চুরি করা। তাঁর চুরির কৌশল হচ্ছে, বাসার লোকজনকে কৌশলে চেতনানাশক খাইয়ে লুট করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়া। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি একই কৌশলে ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় চুরি করছিলেন। এই কৌশলে দীর্ঘদিন চুরি করলেও তিনি ধরা পড়েন কম। কারণ, বাসাবাড়িতে কাজ নেওয়ার পর তিনি নিজের সঠিক পরিচয় দেন না। এমনকি কাজ নেওয়ার সময় ছবি, এনআইডি এবং মুঠোফোন নম্বরও দেন না। ফলে তাঁকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিলকিছের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় নামে-বেনামে অন্তত ৫টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হাতিরঝিল থানার একটি চুরির মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল পিবিআই। ওই মামলায় তিনি দেড় মাস কারাগারে ছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি আবারও একই কৌশলে চুরি করছিলেন। এবার তাঁর প্রয়োগ করা চেতনানাশকে একজনের মৃত্যু হলো।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, বিলকিছ বেগম কাজ নেওয়ার সময় কৌশলে নিজের পরিচয় গোপন রাখেন। তাঁকে শনাক্ত করা যায়, এমন কোনো তথ্য তিনি দেন না। তিনি ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে কাজ নেন। তারপর বাড়ির লোকজনকে চেতনানাশক খাইয়ে মালামাল লুট করে পালিয়ে যান।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হাতিরঝিল থানার মগবাজারের একটি বাসায় ‘নূরজাহান’ পরিচয়ে গৃহকর্মীর কাজ নেন বিলকিছ বেগম। কাজ নেওয়ার তিন দিনের মাথায় গৃহকর্ত্রীকে চেতনানাশক খাইয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা ও দেড় ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হলেও তখন তাঁকে শনাক্ত করা যায়নি। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়। চার মাস তদন্তের পরও পুলিশ তাঁকে শনাক্ত করতে না পেরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। বাদীর আপত্তির পর মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান এসআই রবিউল ইসলাম।
রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তখনো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বিলকিছকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ভিন্নকৌশল নেন। বিভিন্ন থানায় খোঁজ করে দেখেন, চেতনানাশক প্রয়োগের পর লুটপাটের কোনো মামলা আছে কি না। এ ধরনের অন্তত পাঁচটি ঘটনার তথ্য পান তিনি। কোথাও আসামির নাম ‘কণা’, কোথাও ‘মারুফা’, কোথাও ‘নূরজাহান’। এসব মামলার নথি ঘেঁটে এবং আদালতে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, একই ধরনের এক মামলায় ‘বিলকিছ’ নামের এক নারী হাজিরা দিয়েছেন।
এরপর বিলকিছের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে নিশ্চিত হন, ‘নূরজাহান’ পরিচয়ধারী সেই গৃহকর্মীই আসলে বিলকিছ বেগম। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পুরান ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
১৪ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী উত্তরা-৭ নম্বর সেক্টরে আয়শা আক্তারের বাসায় মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নেন। কেয়ারটেকারের কাছে নিজের নাম বলেন ‘মমতাজ’, আর বাসার সদস্যদের কাছে পরিচয় দেন ‘মারুফা’ হিসেবে। জাতীয় পরিচয়পত্র পরে দেবেন বলে জানান তিনি; কিন্তু সেটি আর দেওয়া হয়নি।
১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা বাসায় ফিরে আয়শা আক্তার ও তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেনকে অচেতন অবস্থায় পান। পরে তাঁদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা আয়শা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। আনোয়ার হোসেনকে চিকিৎসাধীন রাখা হয়।
গৃহকর্ত্রীর মৃত্যুর পর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পাশের বাসার একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটের দিকে গৃহকর্মী বাসায় ঢুকছেন এবং বেলা আড়াইটার দিকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তবে ফুটেজে তাঁর চেহারা স্পষ্ট নয়।
ওই ফুটেজ দেখেই পিবিআইয়ের এসআই রবিউল ইসলামের সন্দেহ হয়, এই নারী বিলকিছ হতে পারেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে ঘটনার দিন রাতেই তিনি দপ্তরে ফিরে রেকর্ড রুম থেকে হাতিরঝিল থানার একটি পুরোনো মামলার ডকেট বের করেন। সেখান থেকে বিলকিছ বেগমের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে গুগল ড্রাইভে সংরক্ষিত তাঁর একটি ছবি বের করে আয়শা আক্তারের বাসায় নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা ছবিটি দেখে বিলকিছকে শনাক্ত করেন। তখনই তিনি নিশ্চিত হন, আয়শা আক্তারকে চেতনানাশক প্রয়োগ করেছিলেন বিলকিছ বেগম। তারপর প্রযুক্তির সহায়তায় বিলকিছ বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।