‘আমার মানিকের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না, ওর হাড়গোড় পাওয়া গেছে’

নিহত রাকিব হোসেন মোল্লা
ছবি: সংগৃহীত

রাকিবের দুই ভাই সৌদি আরবপ্রবাসী। গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর ভাইদের কাছে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু গত রোজার মধ্যে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন রাকিব। ৫ মাস ১০ দিন পর গত মঙ্গলবার রাকিবের হাড়গোড় উদ্ধার করে পুলিশ। এমন মৃত্যু মানতে পারছেন না পরিবার ও আত্মীয়স্বজন।

শরীয়তপুর সদরের পালং ইউনিয়নের নরবালাখানা গ্রামের নুরুল ইসলাম মোল্লা ও রাজিয়া বেগম দম্পতির ছেলে রাকিব হোসেন মোল্লা (২৩)। আজ বৃহস্পতিবার রাকিবদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর ছবি ও পাসপোর্ট নিয়ে আহাজারি করে চলেছেন মা রাজিয়া বেগম। কখনো কখনো মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনরা তাঁকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। কাঁদতে কাঁদতে রাজিয়া বেগম বলেন, ‘পাঁচ মাস ধরে ছেলের জন্য কেঁদে যাচ্ছি। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকতাম। এই বুঝি আমার রাকিব ফিরল, ওকে তো ভাত গরম করে খাওয়াতে হবে। আমার মানিকের জন্য আর অপেক্ষা করতে হবে না। ছেলের মুখটাও আমি দেখতে পেলাম না। ওর হাড়গোড় পাওয়া গেছে। সেগুলানরেই কবর দেওয়া হইছে।’

ছেলের জন্য আহাজারি করে চলেছেন মা রাজিয়া বেগম। আজ বৃহস্পতিবার সকালে শরীয়তপুর সদরের পালং ইউনিয়নের নরবালাখানা গ্রামে

রাকিবকে কেন হত্যা করা হলো—এই একই প্রশ্ন বারবার করে আহাজারি করে যাচ্ছিলেন রাজিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘২৫ রোজার দিন ইফতারির পর তিন হাজার টাকা দিছিলাম। পাঞ্জাবি কিনতে বন্ধুদের সঙ্গে বাজারে যাওয়ার কথা বইলা বের হইলো। আর বাড়ি ফিরল না। ঈদের পরেই সৌদি আরর চলে যাইত। এখন সে পরপারে চলে গেল। আমার মানিকরে ওরা মারল কেন? ওর বন্ধুরাই ওকে মেরে ফেলছে। ওদের শাস্তি হবে তো? আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।’

মঙ্গলবার শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর বিলাশখান এলাকার একটি বিলে কয়েকজন শিশু-কিশোর একটি জার্সি ভেসে থাকতে দেখে। ওই জার্সি তুললে তাতে মানুষের হাড় দেখে তারা চিৎকার করে।

পালং মডেল থানার পুলিশ জানায়, গত ১৭ এপ্রিল বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাকিব হোসেন নিখোঁজ হন। ১৯ এপ্রিল তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ৫ মে তিনি পালং মডেল থানায় রাকিবের বন্ধু জুয়েল সরদার (২৩), রবিউল গাজী (২৩) ও জুবায়ের মিয়ার (২৫) বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। পুলিশ ওই তিন তরুণকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তাঁদের মধ্যে জুয়েল সরদার কারাগারে রয়েছেন। আর বাকি দুজন জামিনে আছেন। রাকিবকে খুঁজে না পাওয়ায় সম্প্রতি নুরুল ইসলাম আরও তিনজনের বিষয়ে আদালতে অভিযোগ করেন। তাঁরা হলেন এনামুল খলিফা (৩০), রিফাত শিকদার (২৩) ও চম্পক খাঁ (২৫)। তাঁদের মধ্যে রিফাত শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার শরীয়তপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বিলাশখান এলাকার একটি বিলে কয়েকজন শিশু-কিশোর একটি জার্সি ভেসে থাকতে দেখে। ওই জার্সি তুললে তাতে মানুষের হাড় দেখে তারা চিৎকার করে। পুলিশ খবর পেয়ে ওই বিল থেকে রাকিবের দেহাবশেষ উদ্ধার করে। শরীরের অংশ যেখানে ছিল, তার থেকে ১০ ফুট দূরবর্তী স্থান থেকে তার মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।

রাকিবের বাবা নুরুল ইসলাম সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। রাকিবরা চার ভাই। এক ভাই অটোরিকশা চালান। দুই ভাই সৌদিপ্রবাসী। রাকিব মাংস বিক্রির দোকানে কাজ করতেন।

নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাংস বিক্রির দোকানের গরু জবাইয়ের কাজ করত রাকিব। এ কাজ ওর ভাইয়েরা পছন্দ করত না। দুই ভাই তাকে কাজের জন্য সৌদি আরবে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এ জন্য গত বছর সেপ্টেম্বর তার পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। ভিসাও প্রস্তুত ছিল। গত রোজার ঈদের পরেই তার সৌদিতে চলে যাওয়ার কথা ছিল।’

নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ছেলেটা পাঁচ মাস নিখোঁজ ছিল। পুলিশ কোনো সন্ধান করতে পারল না। যখনই পুলিশের কাছে গিয়েছি, তখনই পুলিশ বলত, আপনার ছেলে আত্মগোপনে আছে। পুলিশ তৎপর হলে ছেলেকে হয়তো ফিরে পেতাম। অন্তত লাশটা পেতাম। এখন আর হাড়গোড় দাফন করতে হতো না।’

এ ব্যাপারে পালং মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শরীফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যে ছয় ব্যক্তিকে অপহরণ মামলায় আসামি করা হয়েছে, তাঁরাই এখন রাকিব হত্যা মামলার আসামি। তাঁদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তাঁরা কোনো তথ্য দেননি। এখন দুজন কারাগারে। ওই দুজনকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে। বাকি চারজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।