রাজশাহী মেডিকেলে ‘অবহেলায়’ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। রোববার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে
রাজশাহী মেডিকেলে ‘অবহেলায়’ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন। রোববার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

‘অবহেলায়’ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচার দাবি, সংসদ সদস্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ‘অবহেলায়’ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচার দাবি করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

এ ছাড়া ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘একপাক্ষিক’ কথা বলায় রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ একাত্মতা ঘোষণা করে।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো—শাহরিয়ারের চিকিৎসায় অবহেলা এবং লাশের পাশে অবস্থানকালে সহপাঠীদের ওপর হামলা, হত্যাচেষ্টা ও শিক্ষক লাঞ্ছনায় জড়িত ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয় ও আনসারদের অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণ ও তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা; এ ঘটনার প্রত্যক্ষ মদদদাতা হাসপাতালের পরিচালক শামীম ইয়াজদানীকে অপসারণ করা; হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও জরুরি মুহূর্তে ফর্মালিটিজের নামে হয়রানি, চাঁদাবাজি ও ক্লিনিকের সঙ্গে যোগসাজশ বন্ধ করা; হাসপাতালে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভাঙা এবং চিকিৎসকের দোষ ওয়ার্ড বয়ের ওপর আর ওয়ার্ড বয়ের দোষ চিকিৎসকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে।

অন্য দাবির মধ্যে আছে—সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে; ইন্টার্ন চিকিৎসকদের স্বেচ্ছাচারিতা, রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ পরিহার করতে হবে; জরুরি বিভাগে নার্স ও ওয়ার্ড বয় দিয়ে প্রক্সি দেওয়া বন্ধ করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা; আইসিইউ ব্যবস্থা সহজ করা এবং অনতিবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির কাছে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি থেকে ৯ দফা দাবি জানানো হয়। রোববার সকালে

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম, অধ্যাপক মো. সেলিম রেজা, অধ্যাপক শুভ্রা রানী চন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আসাবুল হক, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদসহ মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে মার্কেটিং বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কয়েক শ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের ৯ দফার সঙ্গে তাঁরা একাত্মতা ঘোষণা করছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান, নির্বাচিত প্রতিনিধি যখন একটি বিষয় সুরাহার দিকে যায়, সেই বিষয় নিয়ে অবিবেচকের মতো পথচলা শুরু করেন, তখন শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো পথ থাকে না। শিক্ষার্থীরা সেদিন বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কি না, সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাই জানে। শুধু তাঁদের শিক্ষার্থী অবহেলায় মারা যাননি। গণমাধ্যমে দেখা গেছে, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর সন্তানের লাশের সামনে কীভাবে পেটানো হয়েছিল। সাংবাদিকেরা ছয় বছর ধরে হাসপাতালে ঢুকতে পারেন না।

অধ্যাপক শুভ্রা রানী চন্দ বলেন, একজন শিক্ষার্থী তো অবহেলায় মারা গেল। আরও কয়েকজনকে চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে রক্তাক্ত করা হলো। সেখানে আরও লাশ পড়তে পারত। একজন ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে মেডিকেল কলেজের সামনে মানববন্ধন হয়েছে। সেখানে সবার ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য তাঁদের পক্ষে কথা বলেছেন। এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাঁর উচিত ছিল, দুই পক্ষের কথা শুনে মতামত দেওয়া।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীরা সেদিন শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলতে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁদের ওপর হামলা করা হলো। তাঁরা এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু উল্টো ৩০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়কে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ একাত্মতা ঘোষণা করে।

ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাকে তাঁরা সম্মান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে উনি এভাবে বক্তব্য দিতে পারেন না। উনি যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্যে একটি পক্ষ উসকানি পাচ্ছেন এবং এ ঘটনাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ওনার ওই বক্তব্য প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে প্রক্টর আসাবুল হক বলেন, ‘শাহরিয়ারকে আইসিইউতে নিতে আমি বারবার ইন্টার্ন চিকিৎসককে অনুরোধ করি। কিন্তু কাজ হয়নি। পরে ব্রিগেডিয়ারকে বলি। তখন তাঁর কথা শুনে মনে হলো কেন এ শহরের সবাই তাঁর কাছে অসহায়। তিনি আমাকে বোঝান, “কীভাবে আইসিইউ পেতে হয় সেটা আপনার জানা উচিত, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জানা উচিত।” আমি তখন বলি, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ বছর ধরে চাকরি করি, আমি জানি না, আমাকে জানান। তখন তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবেদন করলেও তাঁকে ওয়েট করতে হবে।”’ তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাত্মতা পোষণ করেছে।

তবে ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে অবাঞ্ছিত বলা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, জঙ্গিবাদী ও খুনিদের ষড়যন্ত্রের ফসল। কিন্তু এটা কোনো দিন বাস্তবায়ন হবে না। আমরা ক্যাম্পাসে যাব, সভা করব। এটার জন্য তারা যেন অপেক্ষা করে।’