শরীয়তপুরের জাজিরায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ। ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল বিলাসপুর ইউনিয়নের দূর্বাডাঙ্গা এলাকায়
শরীয়তপুরের জাজিরায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ। ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল বিলাসপুর ইউনিয়নের দূর্বাডাঙ্গা এলাকায়

বিলাসপুরে ককটেল বিস্ফোরণ : তিনজন নিহত হওয়ার পাঁচ মাস পরও অভিযোগপত্র জমা হয়নি

বালতি হাতে দুই দল মানুষ ছুটছে; আর ককটেল ছুড়ছে। গত বছর ৫ এপ্রিল এমন ঘটনা ঘটে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিলাসপুরে। তখন থেকেই আলোচনায় আছে ওই এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা।

চলতি বছর ৮ জানুয়ারি ওই এলাকায় ককটেল তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন। এরপর পুলিশ ওই এলাকায় ব্যাপক অভিযান চালায়। ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। ককটেল ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে।

গত রোববার ওই এলাকার জানখারকান্দি গ্রামের একটি কবরস্থানের পাশের বাগানে ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এতে এলাকার বাসিন্দারা নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ওই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। এর আগে গত শুক্রবার বিলাসপুরের পাশের চরধুপুর চরকান্দি এলাকায় ফসলি জমিতে পাওয়া ককটেল নিয়ে খেলার সময় বিস্ফোরণে রাহাত (১০) নামের এক শিশুর হাতের কবজি উড়ে গেছে। তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহাম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, গত শুক্রবার ফসলি জমি থেকে পাওয়া ককটেল বিস্ফোরণে যে শিশু আহত হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে এখনো কোনো মামলা করেনি। পুলিশও কোনো মামলা করেনি। আর রোববার বিলাশপুরের জানখারকান্দি  গ্রামের একটি কবরস্থানের পাশের বাগানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তেমন উল্লেখযোগ্য আলামত এখনো পাওয়া যায়নি। তাই একটি জিডি করে তদন্তকাজ করা হচ্ছে।

আহত শিশু রাহাতের চাচা চুন্নু মাদবর প্রথম আলোকে বলেন, বাড়ির পাশের ফসলি জমিতে ককটেল কীভাবে এল, তা আমরা বুঝতে পারছি না। পুলিশও কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছি। রাহাতের হাতে ককটেল বিস্ফোরণের দুই দিন পর বিলাশপুরে আবার বিস্ফোরণ আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

এদিকে ককটেল তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনাসহ গত ৬ মাসে অন্তত ৪টি মামলা হয়েছে বিলাশপুরে। যার একটিরও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ।

জাজিরা থানা ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জাজিরার বিলাসপুরের রাজনীতি নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল জলিলের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধের জের ধরে গত এক বছরে বিলাসপুরে অন্তত পাঁচটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রতিটিতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। গত ৮ জানুয়ারি ইউপি চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারীর সমর্থকেরা তার মুলাই ব্যাপারীকান্দি এলাকার বাড়ির কাছে ককটেল তৈরি করছিলেন। তখন সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। ওই বিস্ফোরণে তিনজন নিহত হন।

জাজিরার বিলাসপুরের রাজনীতি নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুদ্দুস ব্যাপারী ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল জলিলের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধের জের ধরে গত এক বছরে বিলাসপুরে অন্তত পাঁচটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রতিটিতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।

ওই ঘটনায় জাজিরা থানার উপপরিদর্শক আবুল কালাম বাদী হয়ে ৫৩ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ওই মামলায় কুদ্দুস ব্যাপারী ও তার তিন ভাইকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলার সব আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।

মামলাটি তদন্ত করছেন জাজিরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুস সালাম। গত ৬ মাসেও ওই মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারেননি। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ককটেল বিস্ফোরণে তিন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে, যার কারণে সময় লাগছে। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তিদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। আর বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে যেসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে, তার রাসায়নিক (ফরেনসিক) পরীক্ষা করছে সিআইডি। সেই প্রতিবেদনও এখানো আসেনি। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করার জন্য।’

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিলাসপুরে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানের কাজ চলছে। বিলাসপুরে স্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করার জন্য একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তানভীর হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ)

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিলাসপুরের ককটেল বিস্ফোরণ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক সিদ্ধান্ত নেন বিলাশপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ইউনিয়নটির বিভিন্ন গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওই সিসি ক্যামেরা বসানোর ব্যয় নির্বাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি বসানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ ফাঁড়ি বসানোর একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তানভীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিলাসপুরে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে। কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। বেশ কিছু মামলা হয়েছে, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই সকল মামলার আসামিরা বিভিন্ন আদালত থেকে জামিনে আছেন। আমরা তাদের ওপরে নজর রাখছি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিলাসপুরে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানের কাজ চলছে। বিলাসপুরে স্থায়ীভাবে শান্তি স্থাপন করার জন্য একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।’