
সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানের শিশু প্রভাত গোয়ালা। সে ওই এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বাড়িতে নিজ ভাষাতেই কথা বলার কারণে বিদ্যালয়ে প্রথমদিকে কথা বলায় স্বাচ্ছন্দ্য পেত না শিশুটি। ভাষাগত সমস্যার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়ায় অনীহা দেখা দিয়েছিল তার। তবে এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। প্রভাতের বিদ্যালয়ে বাংলার পাশাপাশি তার জনগোষ্ঠীর ভাষাতেও এখন পাঠদান করা হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহও বেড়েছে তার।
ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এ রকম ৭৫টি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজ নিজ ভাষাভাষী শিক্ষকের মাধ্যমে দ্বিভাষিক পাঠদানের সুযোগ পাচ্ছে। সিলেটে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে চা-শ্রমিক ও পাত্র সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য এ শিক্ষা প্রকল্প চালু করে। এর মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের প্রাথমিকে ঝড়ে পড়া রোধ হচ্ছে।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ চা-শ্রমিক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাদের অভিভাবকরাও কম শিক্ষিত হওয়ায় শিশুদের পড়াশোনার ব্যাপারে ঠিকমতো খোঁজখবর নেন না। যার ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো দায় হয়ে যায় এসব পরিবারের শিশুদের। আবার কিছু শিক্ষার্থী প্রাথমিক পেরোলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে ঝড়ে পড়ছে।
পাত্র বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে পাত্র ও চা-শ্রমিক অধ্যুষিত তিনটি এলাকায় ‘এডুকেশন সাপোর্ট সেন্টার’ (ইএসসি) শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে নিজ ভাষাভাষী স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দ্বিভাষিক পাঠদান করানো হচ্ছে। এতে ওই এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুরা শিক্ষার আলো পাচ্ছে। তিনটি দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে সিলেট সদর উপজেলার লাক্কাতুরা চা-বাগান এলাকায় একটি, দলদলি চা-বাগান এলাকায় একটি ও আলাইবহর এলাকায় একটি কেন্দ্র রয়েছে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা পরিবারে নিজ ভাষাতেই কথা বলার কারণে বিদ্যালয়ে অন্যদের সঙ্গে মিশতে হীনমন্যতায় ভুগে। এ জন্য নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ালেখায় সহযোগিতা করছি। এমন উদ্যোগ বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সরকারিভাবে নেওয়া হলে শিশুরা পড়াশোনায় আরও উৎসাহী হতো।বারেন্দ্র পাত্র, পাত্র সম্প্রদায়ের দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক
একডোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন ইন দ্য টি গার্ডেন অ্যান্ড এথনিক মাইনরিটি কমিউনিটিজ’ শীর্ষক ২০০৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ৬ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে প্রতি ৫ জনে ২ জন বিদ্যালয়ে যায় না। গবেষকেরা বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন, দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, সচেতনতার অভাব, ভাষার পার্থক্য, জীবনধারা, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, বাগান থেকে বিদ্যালয়ের অধিক দূরত্ব, যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যার ইত্যাদিও কারণে তারা বিদ্যালয়ে যেতে চায় না।
লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, ‘আমরা প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে থাকি। আমরা চাই, স্বাধীন দেশে তাঁরাও স্বাধীনভাবে বসবাস করুক। নাগরিক হিসেবে সব সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করুক।’
আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া রোধ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারিভাবে এমন সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা জানান, দেশে ১৬৭টি চা-বাগানের মধ্যে সিলেটে ১৩৫টি চা-বাগান রয়েছে। যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর বাস। চা-শ্রমিক পরিবারের অধিকাংশ বাবা-মা কাজ শেষে যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন আর তাঁদের পক্ষে সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজেরা নিরক্ষর হওয়ার কারণে বিদ্যালয় থেকে শিশুদের দেওয়া বাড়ির পড়া শেষ করতে সহযোগিতা করতে পারেন না। ফলে মা-বাবার অনাগ্রহের কারণে অধিকাংশ শিশুই বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে, ভাষাগত সমস্যার ফলে এ অনীহা দেখা দেয়।
ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া দূর করতে দ্বিভাষিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন প্রাথমিক পর্যায়ে ঝড়ে পড়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তিনটি শিক্ষাকেন্দ্রে নিজ ভাষাভাষী শিক্ষকেরা প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠদান করার পাশাপাশি নতুন নতুন বিষয় শেখাচ্ছেন।
লাক্কাতুরা এলাকার দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রে প্রাথমিকের শিশুদের পাঠদান করেন দীপ্তি লোহার। তিনি বলেন, প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শিশুরা নিজেদের ভাষাতেই কথা বলে। এ কারণে তিনি তাদের সঙ্গে নিজ ভাষাতে কথা বলেন। পাশাপাশি বাংলাতেও কথা বলেন। এতে শিশুদের মধ্যে বাংলা বলার জড়তা কেটে যায়।
ওই দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রের পড়ুয়াই প্রভাত। প্রভাতের বাবা প্রদীপ গোয়ালা বলেন, বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারিভাবে তাঁদের জনগোষ্ঠীদের শিশুদের জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে তাঁদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুরা পড়াশোনায় এগিয়ে যাবে।
পাত্র সম্প্রদায়ের দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক বারেন্দ্র পাত্র বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা পরিবারে নিজ ভাষাতেই কথা বলার কারণে বিদ্যালয়ে অন্যদের সঙ্গে মিশতে হীনমন্যতায় ভুগে। এ জন্য নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের দ্বিভাষিক শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ালেখায় সহযোগিতা করছেন তিনি। এমন উদ্যোগ বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সরকারিভাবে নেওয়া হলে শিশুরা পড়াশোনায় আরও উৎসাহী হতো বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে সিলেট সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল জলিল তালুকদার বলেন, যদিও সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা কে কোন সামাজিক-আর্থিক শ্রেণির, তার ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ নেই। এরপরও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা ভাষাগত কারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রথম দিকে কিছুটা পিছিয়ে থাকে। তবে দ্বিভাষিক কার্যক্রমের ফলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর হবে বলে মনে করেন তিনি।