নিহতদের লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। আজ সোমবার সকালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকেরবাড়ি এলাকায়
নিহতদের লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। আজ সোমবার সকালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকেরবাড়ি এলাকায়

মাদারীপুরে সড়ক দুর্ঘটনা

নিহত পাঁচ নারী দিনমজুরের কাজে এসেছিলেন, বাড়ি ফিরতে পারলেন না

কাজের সন্ধানে তাঁরা প্রায়ই দল বেঁধে পাশের জেলা মাদারীপুরে আসতেন। ফসলি জমিতে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন, আবার দল বেঁধে ফিরে যেতেন বাড়িতে। তবে পাঁচ নারী আর জীবিত বাড়িতে ফিরতে পারলেন না। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় মাদারীপুরে বাসের চাপায় একই সঙ্গে তাঁরা নিহত হয়েছেন।

নিহত পাঁচ নারী হলেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকেরবাড়ি এলাকার রণজিত বাড়ৈর স্ত্রী শেফালী বাড়ৈ (৪২), পলাশ বাড়ৈর স্ত্রী দুলালী বাড়ৈ (৪২), প্রকাশ বাড়ৈর স্ত্রী আভা বাড়ৈ (৪৫), জয়ন্ত বাড়ৈর স্ত্রী অমিতা বাড়ৈ (৪০) ও মৃত পংকজ বিশ্বাসের স্ত্রী কামনা বিশ্বাস (৪৫)।

গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে মিলগেট এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন। ওই বাসের নিচে চাপা পড়ে পাঁচ নারীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় ইজিবাইকের চালক ও বাসের সুপারভাইজার নিহত হয়েছেন। গতকাল রাত দুইটার দিকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল থেকে পাঁচ নারীর লাশ গাড়িতে করে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিহত নারীরা পেশায় দিনমজুর ছিলেন। তাঁদের আয় দিয়েই চলত সংসার। আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত তাঁদের সৎকার হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা চাঁদা তুলে তাদের সৎকার করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

নিহত শেফালী বাড়ৈর এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে রনি বাড়ৈ (১৭) মিষ্টির দোকানের কর্মচারী। সে প্রথম আলোকে বলে, ‘আমি বাড়িতে থাকি না। কাজের জন্য দূরে থাকি। মা সংসার চালাতে হিমশিম খায়। তাই মাঝেমধ্যে কৃষিকাজ করতে খেতে যাইত। আমি বাড়ি থাকলে মারে দূরে কামে পাঠাইতাম না। আমার মা–ডা তাহলে মরত না। আমার বোনডারে এখন কে দেইখা রাখবে?’

পাইকেরবাড়ি গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা অসিম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিহত পাঁচ নারীর পরিবার খুব দরিদ্র। তাঁদের মধ্যে কামনার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। সবাই ছোট্ট। ছেলেটা ক্লাস টুতে পড়ে। তাঁর স্বামী মারা গেছেন, থাকার জায়গাটুকুর ঠিক নেই। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। দাহ করার মতো খরচটাও এই পরিবারগুলোর নেই। গ্রাম থেকে টাকা তুলে তাঁদের দাহ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সুজিৎ মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘দল বেঁধে এই গ্রামের দরিদ্র নারীরা মাদারীপুরের কৃষিজমিতে বর্গা দিতে যেতেন। আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। দিনে প্রত্যেকে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পেতেন; কিন্তু দুর্ঘটনায় তাঁদের সব শ্যাষ হয়ে গেল।’

হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মাদারীপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল সার্বিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। বাসটি সন্ধ্যায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মিলগেট এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ইজিবাইকটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন এবং হাসপাতালে আরও দুজন মারা যান। এ ঘটনায় যাত্রীবাহী বাসের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

মস্তফাপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন আল রশিদ বলেন, নিহত নারীদের স্বজনদের কাছে গতকাল রাতে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাইওয়ে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করবে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি জব্দ করা হলেও চালক পালিয়ে গেছেন। তাঁকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।