দিনমজুরির কাজ করে দুই ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন ফয়েজ উল্লাহ। শুক্রবার সকালে কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকায়
দিনমজুরির কাজ করে দুই ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন ফয়েজ উল্লাহ। শুক্রবার সকালে কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকায়

মানুষের কথা

‘সন্তানদের লাইগ্যা কষ্ট করতাছি, আল্লাহ একদিন ফল দিব’

সকালের আড়মোড়া ভেঙে ব্যস্ত নগর তখনো জেগে ওঠেনি। সড়কের ওপর স্তূপ করে রাখা টুকরা পাথর টুকরিতে করে নির্মাণাধীন ভবনে নিচ্ছেন কয়েকজন শ্রমিক। তাঁদের একজন ফয়েজ উল্লাহ। বয়স জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ৪৬ বছর; ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছেন। কিন্তু শরীরের গঠন আর পাকা চুল-দাড়ি বয়সটা যেন কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। কথা বলতেই বোঝা গেল জীবনের চাকা ঘোরাতে অনেকটাই ক্লান্ত তিনি।

ফয়েজ উল্লাহ কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী রানু আক্তার, দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেও অভাবের সংসারে পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি তিনি। বিভিন্ন স্থানে করেছেন জীবিকার সন্ধান। প্রায় ১০ বছর ধরে শ্রমজীবী মানুষ তিনি। যখন যে কাজ পানম সেটাই করেন। তবে বেশির ভাগই মালামাল পারাপার করেন।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ছয়টায় কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকায় কাজের ফাঁকে কথা হয় ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে। সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘কোদালের পয়সা দিয়া (দিনমজুরির আয়) দুইটা গাছ লাগাইছি। আল্লাহ একদিন ফল দিব। সন্তানদের লাইগ্যা কষ্ট করতাছি। আল্লাহ আমার মনের আশা পূরণ করছে। বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ে; সে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতাছে। ছোট ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনার্সে পড়ে। আমি উচ্চশিক্ষিত হইতে না পারলেও ছেলেরা আমার স্বপ্ন পূরণ করছে। ইচ্ছা আছে মেয়েটারেও (এসএসসি পরীক্ষার্থী) উচ্চশিক্ষিত বানামু।’

দিনমজুর হিসেবে কাজ করলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হাজিরা পান। বাড়তি আয়ের আশায় মাঝেমধ্যে চুক্তিতে বিভিন্ন কাজ করেন ফয়েজ উল্লাহ। ছোটরা এলাকায় রাস্তা থেকে পাথরগুলো নির্মাণাধীন ভবনে নেওয়ার চুক্তি নিয়েছেন তাঁরা চারজন। কাজটি শেষ হলে জনপ্রতি এক হাজার টাকার একটু বেশি করে পাবেন। তাই সাতসকালেই লেগে পড়েছেন কাজে।

পাথরগুলো নির্মাণাধীন ভবনে নেওয়ার চুক্তি নিয়েছেন ফয়েজ উল্লাহসহ চারজন। শুক্রবার সকালে কুমিল্লা নগরের ছোটরা এলাকায়

ফয়েজ উল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যা আয় করেন তা দিয়ে সংসারের চাকা চলছে না। নিজের আয়ের বড় একটি অংশ সন্তানদের পড়াশোনার জন্য ব্যয় করতে হয়। স্ত্রী জন্য প্রতিদিন ১০০ টাকা আর নিজের ৩০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। সব মিলিয়ে দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতির কারণে খুব একটা ভালো খাবার খাওয়া জোটে না।

ফয়েজ উল্লাহ আরও বলেন, ‘তেলাপিয়া আর পাঙাশ ছাড়া অন্য মাছ কিনতে পারি না। সবশেষ মাছ কিনেছি এক মাস আগে। আর গরুর মাংস কবে কিনেছি, সেটা মনে নেই। বেশির ভাগ সময়ই ডাল, আলুভর্তা আর কম দামি শাক খাই। দিনরাত পরিশ্রম করি, অনেক কষ্ট করি; আমি চাই না আমার সন্তানেরা কোনো কষ্ট করুক।’

‘আল্লাহ চালাউছে ত্যাই চলিছু’

পঞ্চাশোর্ধ্ব আবদুল জাব্বার শুক্রবার ভোর থেকে কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকার টাউন হল মাঠের পাশে অপেক্ষা করছিলেন কাজের জন্য। সকাল ছয়টা পর্যন্ত এই ‘শ্রম বিক্রির’ হাটে তিনি নিজের শ্রম বিক্রির কোনো গ্রাহক পাননি। মনে মনে ভয়ে আছেন, বৃহস্পতিবারের মতো শুক্রবারও অবিক্রীত থাকলে খাবেন কীভাবে?

কাজের সন্ধানে আছেন দিনমজুর আবদুল জাব্বার। শুক্রবার সকালে কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকায়

আবদুল জাব্বারের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন জটলা বেঁধে থাকা একদল লোক টুকরি–কোদাল সামনে নিয়ে হাঁকডাক করছিলেন শ্রম বিক্রির জন্য।

আবদুল জাব্বার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আটবিগি গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী, এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বছরের বেশির ভাগ সময় কুমিল্লায় থাকেন কাজের সন্ধানে। এ বছরও তাঁরা দল বেঁধে কুমিল্লায় এসেছেন। কান্দিরপাড়ের এই হাটে প্রতিদিন আসেন নিজের শ্রম বিক্রি করতে। যেদিন শ্রম বিক্রি করতে পারেন, সেদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা মজুরি পান। এর বিনিময়ে যেই কাজ পান, সেটাই করেন তিনি। তবে বেশির ভাগ দিনই কাজের জন্য অপেক্ষা শেষে শূন্য হাতে ফিরতে হয় বলে জানান তিনি।

আবদুল জাব্বার তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘খুব কষটো করি দিন কাটছে গো। জিনুসপাতির যে দাম, আর চলা য্যাছে না। বাড়িত বিটি-ছলপলে লিয়ে বউকে বেশি টাকা দিবার পারি না। মাছ-গোস এ্যালা আমাগি তায় সপন হয়া গেছে। নুন-ভাতে কোনো রকমে পরিবার লিয়ে দিন কাটছে। আল্লাহ চালাউছে ত্যাই চলিছু, লয়তো এই আয়ে চলার মতোন পরিস্তিতি নাই।’

আবদুল জাব্বার জানান, কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা এলাকার একটি মেসে এক হাজার টাকায় থাকেন তিনি। সেখানে দৈনিক খাওয়া খরচ ১৫০ টাকা। নিজের হাতখরচ আছে ৫০ টাকা। সপ্তাহের মধ্যে দুই-তিন দিন কাজ পেতে কষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে তিনি নিজে চলতে এবং পরিবারকে টাকা পাঠাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতিতে চরম সংকটে পড়েছেন তিনি।

মুলিবাঁশে টেনেটুনে চলে রফিক মিয়ার

জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া বাজার এলাকায় কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে মুলিবাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির কাজ করেন রফিক মিয়া। সারা দিন কাজ করলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পান। এই টাকায় রফিকের জীবনের চাকা চলছে না বলে জানান তিনি।

মহাসড়কের পাশে বসে মুলিবাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির কাজ করেন রফিক মিয়া। শুক্রবার সকালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া বাজার এলাকায়

রফিক পাশের বিনয়ঘর গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী আর তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। এরই মধ্যে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন; ছোট মেয়ে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। পরিবারের প্রতিনিয়ত খরচ বেড়েছে, বেড়েছে দ্রব্যমূল্য; কিন্তু ৪৫ বছর বয়সী রফিকের জীবন আটকে আছে মুলিবাঁশেই।

রফিক মিয়া বলেন, ‘বাজারের জিনিসপত্রের যেই দাম—সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কষ্টে টেনেটুনে দিন পার করছি। এটা আমার ভাতিজার দোকান; তাই এখানেই পড়ে আছি। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ইনকাম করতে পারি। এই টাকা দিয়ে নিজের জন্যও কিছু করতে পারি না—পরিবার তো দূরের কথা।’

আক্ষেপ নিয়ে রফিক বলেন, ‘ভালো একটি মাছ খেতে ইচ্ছে করলে কিনতে পারি না, মাংস তো দূরের কথা। ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে চাল আর তেল কেনার টাকাও হয় না। তাহলে অন্য কিছু কীভাবে কিনব? আল্লাহ পাক ভালো জানে সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করব। কারণ, যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, সেভাবে আয় বাড়ে না।’