
এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরুদ্ধে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করছে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঠিক সেই স্বৈরাচার যেভাবে বলত তাদেরই ভাষা ব্যবহার করছে।’ কোনো দলের নাম না নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তাদের বক্তব্য যে—বিএনপি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। আমার প্রশ্ন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও তো দুজন সদস্য বিএনপির সরকারে ছিল। বিএনপি যদি এতই খারাপ হয় তাহলে ওই দুই ব্যক্তি পদত্যাগ করে চলে আসেনি কেন।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহ নগরের সার্কিট হাউস ময়দানে বিএনপি আয়োজিত বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন। বেলা ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে সভাস্থলে ঢাকা থেকে সড়কপথে এসে উপস্থিত হন বিএনপির চেয়ারম্যান। মঞ্চে ওঠার আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যুদ্ধে আহত ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর বিকেল ৪টায় তিনি সভামঞ্চে উঠলে স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানান উপস্থিত নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। তারেক রহমানের সঙ্গে স্ত্রী জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৪টা ২৬ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন তিনি।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে জামায়াতে ইসলামীর দুজন মন্ত্রী ছিলেন। সেই বিষয়ে ইঙ্গিত করে জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘তাদের দুজন এই জন্য পদত্যাগ করে আসেনি কারণে তারা সরকারে ছিল এবং তারা ভালো করে জানত খালেদা জিয়া কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমন করছে। সব ধরনের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলে খালেদা জিয়ার সময় দেশ দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের হতে শুরু করে। যেই দল বিএনপিকে এভাবে দোষারোপ করে তাদের দুই সদস্য প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সরকারে থাকায় প্রমাণ করে নিজেরাই নিজেদের লোক সম্পর্কে কত বড় মিথ্যা কথা তারা বলছে।’
এক দলের নির্বাচনী জনসভায় অন্য দল সম্পর্কে ‘গিবতের’ সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমারা রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের জন্য। নির্বাচনী জনসভায় দেখি অনেক দল এসে অন্য দল সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের কথাবার্তা বলে। আজকে যদি আমি এখানে দাঁড়িয়ে অন্য দল সম্পর্কে অন্য রকম কথা বলি, তাদের সম্পর্কে গিবত গাই, তাদের সমালোচনা করি, তাতে কি জনগণের কোনো লাভ হবে? হবে না। কারণ, জনগণ তাকেই ভোট দেবে, যারা জনগণের জন্য কাজ করবে। জনগণের জন্য যদি কাজ করতে হয় তাহলে একটি রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা থাকতে হবে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে। কীভাবে কী কী কাজ করবে জনগণে জন্য, সেই পরিকল্পনাগুলো থাকতে হবে।’
আগামী দিনে দেশকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে তার পরিকল্পনা বিএনপির রয়েছে বলে জনসভায় জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এই দলটির অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে কীভাবে দেশে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হয়, জেলায়–জেলায়, উপজেলায়, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হয়। বিএনপির অভিজ্ঞতা রয়েছে কীভাবে শিক্ষার আলো এ দেশের সন্তানদের কাছে পৌঁছে দিতে হয়, কীভাবে বাংলাদেশের মানুষকে নিরাপদে রাখতে হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হয়।’
জনসভায় ময়মনসিংহসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়েও জনসভায় কথা বলেন তারেক রহমান। নেত্রকোনা, শেরপুরসহ বিভিন্ন জায়গার মাদক সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই মাদক সমস্যার সমাধান করতে চাই। মাদক সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাদেরকে সেই তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের যখন কাজ থাকবে, চাকরি থাকবে, ব্যবসা–বাণিজ্য থাকবে, তখন মানুষ এগুলোর মধ্যে যাবে না। আমরা সেই পরিবেশ তৈরি করতে চাই। আমরা চাই দেশে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট বেশি করে তৈরি করব। যাতে করে আমরা আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের সদস্যদের বিভিন্ন রকম ট্রেনিং (প্রশিক্ষণ) দেব। যেই ট্রেনিংয়ের বিনিময়ে তারা বিদেশে যেমন যেতে পারবে একইভাবে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে। যারা আইটিতে কাজ করে তাদের জন্য বিভিন্ন রকমের আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছি, যাতে করে তারা ঘরে বসে আয় বাড়াতে পারে।’
চিকিৎসা খাতের বিষয়ে বলতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই চার জেলার আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে মানুষের চিকিৎসা সমস্যা। আমরা ময়মনসিংহসহ চার জেলার জেলা হাসপাতালগুলোকে আরও বড় করতে চাই, একইভাবে হেলথকেয়ার অ্যাপয়েন্ট (নিয়োগ) করতে চাই। শহীদ জিয়ার সময় পল্লি চিকিৎসকেরা গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে গিয়ে চিকিৎসা দিতেন। আমার ঠিক একইভাবে ঘরে ঘরে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে চাই। মা-বোন ও শিশুদের চিকিৎসায় অনেক সমস্যা হয়, তারা হাসপাতালে যেতে পারে না। তারা যেন ঘরে বসে চিকিৎসা পায়, সে জন্য আমরা চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্নত করতে চাই।’
১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যে অধিকার আদায়ের জন্য গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে হাজারো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে আহত করা হয়েছে। সেই অধিকার আপনারা প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই ভোটের অধিকার দরকার, কারণ আমরা চাই এই দেশের মালিক যে জনগণ সেই জনগণের ইচ্ছামতন যাতে আগামী দিন এই দেশ সামনে চলতে পারে। সেই ইচ্ছার প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন হতে পারে সে জন্য দরকার ভোটের অধিকার। মানুষের কথা বলার অধিকার, মানুষের ন্যায্য অধিকার, যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সে জন্যই দরকার ভোটের অধিকার।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ একজন অভিভাবক হিসেবে চায় তার সন্তান যেন সুশিক্ষা বা সঠিকভাবে শিক্ষা পায়। একজন অভিভাবক চায় সন্তান সেই শিক্ষা পাক, যেই শিক্ষা শেষ হলে পরে সন্তান কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে, বেকার থাকবে না। তরুণেরা-যুবকেরা চায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। দেশে মিল ফ্যাক্টরি হবে, ব্যবসা–বাণিজ্য হবে, যাতে করে তারা সুন্দরভাবে ও নিরাপদে ব্যবসা–বাণিজ্য বা চাকরি করতে পারে। মানুষ চায় অসুস্থ হলে যাতে করে সময়মতো চিকিৎসা সুবিধা পায়। এই কাজগুলো বিএনপি করবে।’
এ সময় বিভাগে ২৪টি আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের হাতে দেওয়া ধানের শীষ দেখিয়ে প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই ২৪ জনকে দায়িত্ব দিয়ে গেলাম চার জেলার উন্নয়ন করার জন্য। তাদের হাতে ধানের শীষ দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছি এখন আপানাদের দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে তাদের কাছ থেকে। ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। এদেরকে জিতিয়ে আনতে পারলে আমরা ওই কাজগুলো করতে পারবো। এদেরকে জেতাতে হলে আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে।’
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম, বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কালাম, বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ওয়ারেছ আলী মামুন, আবু ওয়াহাব আকন্দ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আফজাল এইচ খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদক নিলুফা চৌধুরী মনি প্রমুখ।