পাবনার বেড়ায় বাড়ির গাছতলায় বেঞ্চ পেতে আয়োজন করা হয়েছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আজ শুক্রবার বেড়া পৌরসভার আলহেরানগরে
পাবনার বেড়ায় বাড়ির গাছতলায় বেঞ্চ পেতে আয়োজন করা হয়েছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আজ শুক্রবার বেড়া পৌরসভার আলহেরানগরে

বাড়ির গাছতলায় বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জ্ঞানচর্চা ও যুক্তির ব্যতিক্রমী মঞ্চ

কোনো জমকালো হলরুমে নয়, ছিল না বড় মঞ্চ। শিক্ষক ওমর সরকারের বাড়ির গাছতলায় বেঞ্চ পেতেই টানা ১৫ দিন ধরে চলেছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বেশির ভাগ সময় এই আয়োজন হয়েছে গাছতলার ছায়াতেই, আর দুই-এক দিন রোদের কারণে বসতে হয়েছে তাঁর টিনের ঘরে। সেই উঠানে বসেই যুক্তির লড়াইয়ে মেতে ওঠে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

ওমর সরকার পাবনার বেড়া উপজেলার আলহেরা একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক। তাঁর বাড়ি বেড়া পৌরসভার আলহেরানগরে। তাঁর হাতে গড়া বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের ১৪তম বার্ষিক বিতর্ক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত (ফাইনাল) পর্ব আজ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর বিজয়ীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার বিতরণ করা হবে।

২০০৮ সালে ওমর সরকারের উদ্যোগে এই বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে বাৎসরিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা। সেই ধারাবাহিকতায় এবার অনুষ্ঠিত হলো ১৪তম আসর।

এই আয়োজনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, পুরো প্রতিযোগিতাই হয়েছে ওমর সরকারের বাড়ির গাছতলার ছায়ায় বেঞ্চ পেতে। তবে দুই-এক দিন রোদের কারণে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয় তাঁর টিনের ঘরে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো না থাকলেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আর শিক্ষকের নিষ্ঠায় জমে ওঠে প্রতিযোগিতা।

এবারের প্রতিযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে প্রতি দলে চারজন করে শিক্ষার্থী নিয়ে মোট চারটি গ্রুপ করা হয়। শেষ পর্যন্ত এই চার গ্রুপের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় মূল বিতর্ক প্রতিযোগিতা। প্রথম রাউন্ডে লিগ পদ্ধতিতে মোট ৯টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নকআউট পদ্ধতিতে সেমিফাইনাল এবং সবশেষে আজ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।

বিতর্ক মানে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি চিন্তা করার একটি চর্চা। আমি চাই, আমাদের গ্রামের শিক্ষার্থীরাও যেন যুক্তি দিয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে।
ওমর সরকার, শিক্ষক ও বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, বছরজুড়ে এই শিক্ষার্থীদের নিজের বাড়িতে ডেকে এনে বিনা পারিশ্রমিকে বিতর্ক শেখান ও অনুশীলন করান ওমর সরকার। তিনি বলেন, ‘বিতর্ক মানে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি চিন্তা করার একটি চর্চা। আমি চাই, আমাদের গ্রামের শিক্ষার্থীরাও যেন যুক্তি দিয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে। সেই লক্ষ্য নিয়েই এই কাজ করছি।’

ওমর সরকার আরও বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা চেষ্টা করি যেন শিক্ষার্থীরা শেখার সুযোগ পায়। ওদের আগ্রহই আমাকে এগিয়ে যেতে শক্তি দেয়।’

এবারের প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষকের পাশাপাশি বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের প্রাক্তন কৃতী বিতার্কিকেরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওয়াসিউল হাসান সরকার, খসরু আহসান, রাহাত জামান, রাফিয়া জামান প্রমুখ।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি ও বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের প্রাক্তন বিতার্কিক ওয়াসিউল হাসান সরকার প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা আজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিতর্ক করছি, তাদের ভিত্তিটা তৈরি হয়েছে এই গাছতলার আসর থেকেই। বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্র না থাকলে হয়তো আমাদের অনেকেরই এই জায়গায় আসা হতো না।’

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো না থাকলেও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আর শিক্ষকের নিষ্ঠায় জমে ওঠে বিতর্ক প্রতিযোগিতা

বেড়া বিতর্ক চর্চাকেন্দ্রের প্রাক্তন বিতার্কিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফিয়া জামান বলেন, ‘ওমর স্যার নিঃস্বার্থভাবে আমাদের এলাকায় বিতর্কচর্চার একটি শক্ত পরিবেশ তৈরি করেছেন। তাঁর হাত ধরেই আমরা অনেকেই জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি এবং পুরস্কারও অর্জন করেছি। এখানকার এই চর্চাই আমাদের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।’

এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফিফা সরকার সাওদা বলে, ‘প্রথমে খুব ভয় লাগত। এখন নিজের কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি। স্যারের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।’

বেড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, কোনো আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে নয়, সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ ও মননশীলতা গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন শিক্ষক ওমর সরকার। আর তাঁর বাড়ির সেই সাধারণ উঠানই আজ হয়ে উঠেছে জ্ঞানচর্চা ও যুক্তির এক ব্যতিক্রমী মঞ্চ।