
পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিল না। তারপরও পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি মোজাম্মেল হকের (৪২)। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই পড়ালেখার পাট চুকিয়ে ফেলেন। এরপর পরিবারের কাজে টুকটাক সহায়তার মধ্য দিয়ে দিন পার হতে থাকে। একসময় তাগিদ অনুভব করেন, কিছু করতে হবে। নিজের গ্রাম মেহেরপুরের বারাদি থেকে চলে আসেন চুয়াডাঙ্গার আলোকদিয়ায়। উদ্যোক্তা হিসেবে শুরু করেন ছোট একটি ব্যবসা। ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে মোজাম্মেলের। পরে বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা বাড়ান। তবে ভাগ্য পুরোটা সময় সঙ্গ দেয়নি। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকা ব্যবসায় ভাটার টান শুরু হয়। করোনা সেই টানের আরও গতি বাড়ায়। বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা, পুঁজি হারিয়ে অনেকটা দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি।
মোজাম্মেল থমকে গেলেও একেবারে থেমে যাননি। আগের জায়গা ছেড়ে নতুন শহরে নতুন উদ্যমে পুরোনো ব্যবসা আবার চালু করেছেন। বদলে ফেলেছেন ব্যবসার ধরন।
মেহেরপুর থেকে চুয়াডাঙ্গায় এসে মোজাম্মেল ছোট একটি তেলের মিল তৈরি করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ২৫-২৬ বছর। মিল থেকে উৎপাদিত তেল বোতলজাত করে চুয়াডাঙ্গা ও আশপাশের জেলার বিভিন্ন দোকানে মোটরসাইকেলে করে বিক্রি করতেন। এখনো মোজাম্মেল (৪২) তেল বিক্রি করছেন। তবে এবার ঠিকানা খুলনা শহর। আর স্থায়ী মিলের বদলে ভ্রাম্যমাণ যন্ত্রের ঘানিতে উৎপাদিত শর্ষের তেল বিক্রি করছেন তিনি।
গতকাল সোমবার সকালে ভ্রাম্যমাণ এই ঘানির দেখা মিলল আপার যশোর রোডের ডাকবাংলা মোড় এলাকায় সোনালী ব্যাংক করপোরেট শাখা ভবনের সামনের ফুটপাতে। চোখের সামনেই ভাঙানো হচ্ছে শর্ষে। সাতসকালে বেশ কয়েকজন ক্রেতাও রয়েছেন মিলের সামনে। একটি মাঝারি আকারের পিকআপে বসানো হয়েছে এই মিল। একজন শর্ষে ঢালছেন, একজন তেল সংগ্রহ করে আবার তা পরিশোধনযন্ত্রে ঢেলে দিচ্ছেন। সেখান থেকে আরেকজন বিভিন্ন সাইজের প্লাস্টিকের বোতলে করে তেল নিয়ে পাশের টেবিলে সাজিয়ে রাখছেন। মোজাম্মেল হক দাঁড়িয়ে থেকে পুরো বিষয়টি তদারক করছেন।
আলাপে আলাপে মোজাম্মেল বলেন, ‘ব্যবসাটা ঢাকায় শুরু করার নিয়ত ছিল। তবে আমাদের এলাকা থেকে খুলনায় সবজির কাঁচামালের গাড়ি আসে। আমার অনেক আত্মীয় সেসব গাড়ি চালায়। বিভিন্ন সুবিধার কথা চিন্তা করে খুলনাতেই শুরু করার মনস্থির করি। এটাতে বকেয়ার ভয় নেই। নগদ টাকায় বিক্রি হয়।’
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে খুলনায় ব্যবসা করছেন মোজাম্মেল। প্রথম দিকে একেক দিন একেক মহল্লায় গিয়ে শর্ষে ভাঙাতেন। এক বছর ধরে ডাকবাংলা মোড়ে তেল তৈরি করছেন। শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তেল বানানো ও বিক্রি চলে। প্রতি লিটার তেলের দাম ২৬০ টাকা। তেলের পাশাপাশি খৈলও বিক্রি হয়।
কাঁরা এই তেল কেনেন—জানতে চাইলে মোজাম্মেল বলেন, ‘কাস্টমার সবাই। তবে শহরের বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা, প্রশাসন ও সরকারি কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং সকালে হাঁটতে আসা মানুষ এই তেল কেনেন। আর আমার পরিচয় অনেকে জেনে গেছেন। মোংলা, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জের নানা জায়গা থেকে মানুষ তেল নিতে আসেন।’
কথা চলতে থাকার সময়ই বেশ কয়েকজন তেল কিনতে আসেন। তাঁদের একজন খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিসের কর্মী খান পান্না মিয়া বলেন, ‘এখানে সবকিছু চোখের সামনে। তেলের মান খুব ভালো। যখন লাগে অফিসে যাওয়া বা আসার পথে নিয়ে যাই। আমার পরিচিত অনেকেই এই তেল ব্যবহার করছেন।’
শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের ফুলতলা বাজার এলাকায় থাকেন মোজাম্মেল ও তাঁর কর্মীরা। মাসে একবার গ্রামের বাড়িতে যান। প্রতিদিন ভোরে পিকআপের ওপর থাকা ভ্রাম্যমাণ মিল নিয়ে ডাকবাংলা মোড়ে চলে আসেন। মোজাম্মেল বলছিলেন, ‘কর্মীদের থাকা, শর্ষে ও বোতল রাখা সব মিলিয়ে চারটা রুম লাগে। শহরে থাকতে গেলে মোটে না–হলেও ২০ হাজার টাকা খরচ লাগত। এদিকে শহরে প্রথমে বাসা পাচ্ছিলাম না। গাড়ি রাখারও সমস্যা ছিল। এখন পাঁচ হাজার টাকায় ফুলতলা এলাকায় থাকতে পারছি। আবার আমাদের শর্ষে কেনার হাট যশোরের নওয়াপাড়াও ওখান থেকে কাছে।’
আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ভ্রাম্যমাণ মিলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ মণ শর্ষে ভাঙানো হয়। সবকিছু বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। শীতকালে বিক্রি বেশি হওয়ায় লাভের অঙ্কও বাড়ে। তবে কাঁচামাল ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব মোজাম্মেলের ব্যবসায়ও পড়েছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও প্রতি কেজি ভালো মানের দেশি মাঘী শর্ষে ৯২ টাকায় কিনতে পারতেন। এখন দাম ১০৩ টাকা। আবার ডিজেলের দাম বাড়ায় প্রতিদিন ডিজেল খরচ আগের চেয়ে ৭০০ টাকার মতো বেড়েছে। তবে তেলের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। লাভ কমে গেছে বলে দাবি তাঁর।