ময়মনসিংহের খানে মোহাম্মদ আলী নার্সারিতে ফার্স্ট লাভ ফুল
ময়মনসিংহের খানে মোহাম্মদ আলী নার্সারিতে ফার্স্ট লাভ ফুল

ভালোবাসার নামে দুই ফুল

ময়মনসিংহ শহরের ছোট কালীবাড়ির পেছন দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে ব্রহ্মপুত্রতীরের কাছারিঘাট ও জয়নুল উদ্যানের দিকে। এ রাস্তা ধরে হাঁটা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ফেরার পথে কাছারিঘাটের নার্সারিগুলোয় একটু ঢুঁ না মারলে দিনটি যেন পূর্ণতা পায় না। গত বছর ১৮ অক্টোবর এবং এ বছরের ৩ মার্চ কাছারিঘাটের ‘খানে মোহাম্মদ আলী নার্সারি’তে গিয়ে দেখা পেলাম চমৎকার দুটি উদ্ভিদের। প্রকৃতি আর ভালোবাসার মেলবন্ধনে এদের নামও বেশ চমৎকার—একটির নাম ‘ফার্স্ট লাভ’ এবং অন্যটি ‘লাভ প্ল্যান্ট’।

সোনালি আভার ‘ফার্স্ট লাভ’

নার্সারির উত্তর পাশে ধু ধু বালুময় চর আর তার কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের পাশের নার্সারিতেই নজর কাড়ল উজ্জ্বল সোনালি হলুদ রঙের ‘ফার্স্ট লাভ’। ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট। এই ফুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর লম্বা পুংকেশর, যা সবার আগে চোখে পড়ে। এই বিশেষ গঠনই একে অন্য সব উদ্ভিদ থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। এর পাতাগুলো চকচকে সবুজ ও বল্লমাকৃতির এবং প্রায় ১৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।

ফার্স্ট লাভ মূলত আমাদের দেশি উদ্ভিদ নয়। এর আদি নিবাস উত্তর অস্ট্রেলিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম Xanthostemon chrysanthus, এটি Myrtaceae পরিবারের গুল্ম। গ্রিক শব্দ ‘জ্যান্থো’ ও ‘স্টেমন’ থেকে এর গণ নাম এসেছে, যার অর্থ হলুদ পুংকেশর। আবার ‘খ্রুসোস’ ও ‘এন্থোস’ থেকে এসেছে ‘ক্রাইসানথাস’, যা দিয়ে সোনা ও ফুলকে বোঝানো হয়। আমাদের অতিপরিচিত জাম, জামরুল ও গোলাপজামও এই একই Myrtaceae পরিবারের সদস্য। এ কারণেই হয়তো এদের ফুলের গঠনে অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

এই উদ্ভিদ উষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। গাছটি ১০-১৫ মিটার উঁচু হতে পারে এবং ঝোপালো প্রকৃতির হয়। এতে প্রচুর মধু থাকায় মৌমাছি ও কীটপতঙ্গ পরাগায়নে সহায়তা করে। সাধারণত গ্রীষ্ম থেকে শরৎকালে ফুল ফুটলেও শীত ছাড়া বছরের যেকোনো সময়ই এর দেখা মিলতে পারে। নাম ‘ফার্স্ট লাভ’ বা ‘প্রথম প্রেম’ হওয়ার পেছনে কোনো বিশেষ কোনো গল্প জানা নেই। তবে ফুলটির সৌন্দর্য দেখে মানুষ এর প্রেমে পড়তে পারে—এটা বলা যায়।

ময়মনসিংহের খানে মোহাম্মদ আলী নার্সারিতে লাভ প্ল্যান্ট

সংবেদনশীল ‘লাভ প্ল্যান্ট’

কাছারিঘাটের একই নার্সারিতে দেখা পেলাম ‘লাভ প্ল্যান্ট’ বা ‘ফলস শ্যামরক’-এর। এর চমৎকার গাঢ় মেরুন রঙের পাতাগুলো তিন পত্রকবিশিষ্ট, যা দেখতে অনেকটা হৃৎপিণ্ডের মতো। এই আকৃতির কারণেই একে ‘লাভ প্ল্যান্ট’ ডাকা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Oxalis triangularis, এটি Oxalidaceae পরিবারের সদস্য। আমাদের চেনা আমরুল শাকও এই গোত্রের।

পাতার নান্দনিক গঠন আর মায়াবী ফুলের জন্য ‘লাভ প্ল্যান্ট’ উদ্ভিদটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর পাতাগুলো গাঢ় মেরুন রঙের এবং দেখতে অনেকটা হৃৎপিণ্ডের মতো, তাই একে ভালোবেসে ‘লাভ প্ল্যান্ট’ ডাকা হয়। এর তিনটি পাতা একটি বৃন্তের সঙ্গে এমনভাবে সাজানো থাকে, যা দেখতে অনেকটা ক্লোভার বা শ্যামরক ঘাসের মতো। যদিও এটি প্রকৃত ক্লোভার নয় বলে একে ‘ফলস শ্যামরক’ বলা হয়।

এই উদ্ভিদের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এর আলোক-সংবেদনশীলতা। দিনের বেলা উচ্চ আলোতে পাতাগুলো ডানা মেলার মতো খুলে থাকে, কিন্তু রাত হলেই বা আলোর তীব্রতা কমলে পাতাগুলো ভাঁজ হয়ে বুজে যায়। এমনকি গাছটি বিরক্ত বোধ করলে বা তীব্র রোদ থাকলেও পাতা বন্ধ করে ফেলে। বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত এতে সাদা বা ফ্যাকাশে গোলাপি রঙের পাঁচ পাপড়ির ছোট ছোট ফুল ফোটে, যেগুলো রাতের বেলা পাতার মতোই ঘুমিয়ে পড়ে।

  • চয়ন বিকাশ ভদ্র, অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ