শরৎকাল শুরু হয়েছে। তাপমাত্রা এখন ৬ থেকে ১৫ ডিগ্রির মধ্যেই থাকে। রাতে শিশির ঝরে। সকালের মিষ্টি রোদে শিশিরের কণাগুলো ঘাসের ডগায় হাসি দেয়। সে হাসির মধ্যে আমি বাংলার প্রকৃতিকে দেখতে পাই। মাঝেমধ্যে মেঘেরা উড়ে আসে এবং হালকা বৃষ্টি ঝরিয়ে চলে যায়।
এত দিন ধরে মাঠের বুকে লেগে থাকা বিবর্ণ ঘাসগুলো সবুজ হয়ে গেছে। ধলা খঞ্জন, ম্যাগপাই, চড়ুই ঘাসের মাঠ পায়চারি করে সকালে ও বিকেলে। তাদের খাবার উপযোগী কিছু কীটপতঙ্গ মিলছে মাঠে।
জার্মানিতে শরৎকাল খুব অল্প সময়ের। দেখতে দেখতেই চলে যায়। শরৎ মৃদু ঠান্ডা, শীতল বাতাস, মিষ্টি রোদ, নীল আকাশ ও বন বৃক্ষের পাতার হলুদ রং অনুভব করার উপযুক্ত সময়। বলা হয়ে থাকে, শরতের সময় জার্মানির প্রকৃতি সবচেয়ে সুন্দর। দীর্ঘ শীতের সময় এখানকার মানুষ তাদের মনে শরতের সৌন্দর্য ও মিষ্টি রোদের তাপ ধারণ করে সময় পার করে। আর বসন্তের জন্য অপেক্ষা করে বর্ণিল বুনো ফুল ও সূর্যকে দেখার জন্য।
শরতে ছুটির দিনে বাইকিং করতে ভালো লাগে। দূরের বা কাছের বনে যাওয়ার জন্য অনেক সড়কের সঙ্গেই সাইকেল চালানোর জন্য লেন থাকে। ভাবছি, এই শরতে জার্মানির হার্জ পর্বতমালা দেখতে যাব। সেখানে বরফে ঢাকা পর্বতের মধ্য দিয়ে ট্রেন চলে। সেই দৃশ্য দেখতে যাব। আমার বাসা থেকে তেমন একটা দূরে নয়। হয়তো সেখানে কোনো নতুন বন্য প্রাণী ও বুনো ফুলের সঙ্গেও দেখা হবে।
কয়েক দিন আগে হেকলিঙ্গেন শহরের কাছে ঘাসবনে গিয়েছিলাম পাখি দেখতে। রুক, শিকরা, চিত্রা শালিক, গেছো চড়ুই, লাল চিল ও দাঁড়কাক এ এলাকায় সহজদৃষ্ট পাখি। ঘাসবনে বিচরণ করা ইঁদুর ধরার জন্য শিকরা আকাশে হোভারিং (স্থির হয়ে আকাশে ভেসে থাকা, শিকার ধরার সময়) করে।
সেই ঘাসবনে দেখি ছড়ানো ছিটানো কিছু উদ্ভিদে বেগুনি রঙের প্রচুর ফুল ফুটেছে। জ্বলজ্বল করছে ফুলের রূপ। কাছে থাকা ওক ও বার্চের রঙিন পাতার সৌন্দর্য যেন সে ফুলের চেয়ে কম আকর্ষণীয় লাগছে। ফুল দেখতে অনেকটা অ্যাস্টার বা পিটুনিয়া ফুলের মতো। তবে আকার অ্যাস্টার থেকে ছোট। ফুলের গঠন দেখে বোঝা গেল, এরা অ্যাস্টেরেসি পরিবারের উদ্ভিদ।
গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের সারা শাখায় ফুল ফুটে আছে। বেগুনি রঙের প্রতিটি ফুলে মৌমাছিদের বিচরণ। এত মৌমাছির বিচরণ খুব কম ফুলেই দেখেছি। পরে জানতে পেরেছি, ইউরোপের বেশির ভাগ মৌমাছি ও প্রজাপতি এ ফুলে বিচরণ করে মধুর জন্য।
ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Centaurea scabiosa। ইংরেজিতে বলা হয় গ্রেটার ন্যাপউইড। এরা তৃণভূমি এবং চুনসমৃদ্ধ মাটিতে জন্মে। ন্যাপউইড একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। আদি আবাস ইউরোপ। ইউরোপের প্রতিটি দেশেই দেখা যায়। তবে দেখতে চাইলে কোনো সড়কের কাছে তৃণভূমি এবং পাহাড়ের পাদদেশে যেতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি একটি ভেষজ উদ্ভিদ এবং প্রজাতিটি মৌমাছির কাছে খুবই মূল্যবান। এটি প্রজাপতির অনেক প্রজাতির জন্যও একটি চুম্বক।
উদ্ভিদ প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পৌঁছায়। পাতা ও কাণ্ড খাঁজকাটা। ফুলের পুষ্পমঞ্জরি হেড (মাথার মতো গোলাকার পুষ্পধারক, অ্যাস্টেরেসি পরিবারের ফুলের বৈশিষ্ট্য)। গোলাকার এই পুষ্পমঞ্জরিতে ছোট অনেক ফুল থাকে। প্রান্তের দিকের ফুলগুলো পাপড়িসহ বেশি লম্বা থাকে। কেন্দ্রের ফুলগুলো ছোট। ফুলগুলো একটি সবুজ ডিস্কে বা পেয়ালাকার ধারকে সন্নিবেশিত থাকে। সবুজ ধারকের বৃন্তটিও বেশ লম্বা। জার্মানির অনেক ফুল অনুরাগীদের কাছে এ ফুল জাদুকরি এবং খুব রোমান্টিক।
সৌরভ মাহমুদ, প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার