
শীতকালে খেজুরের রস ও রস থেকে তৈরি গুড় আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের আদি ঐতিহ্য। কিন্তু একসময়ের সহজলভ্য সেই খেজুরের রস ও গুড় এখন যেন সোনার হরিণ। গ্রামের পর গ্রাম খুঁজলেও আপনি এক কলস খেজুরের রস পাবেন না। বাজারে পাবেন ভেজালে ভরা সব পাটালি গুড়।
এর পেছনে প্রধান কারণ আশঙ্কাজনক হারে খেজুরগাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া। ধারণা করা হয়, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা ও পেশাগত বিবর্তনের কারণে সম্ভাবনাময় খেজুর-শিল্পে ধস নেমেছে। কীভাবে খেজুরগাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করে স্থানীয় লোকজনকে আবার এই খাদ্যশিল্পে ফিরিয়ে আনা যায়, সেসব নিয়ে ভাবছিলাম অনেক দিন ধরে।
খেজুরগাছের স্বর্গভূমি বৃহত্তর যশোরের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। কথা বলেছি স্থানীয় লোকজনের সঙ্গেও। সম্প্রতি গাছটিকে আবার প্রাণ-প্রাচুর্যে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে উদ্ভিদবিদ ড. মাকসুদা খাতুনসহ একটি ধারণাপত্রও তৈরি করেছি। এমন একটি সময়েই বৃক্ষপ্রেমী যায়েদ আমীনের মাধ্যমে আলাপ হলো বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীরের সঙ্গে।
আলাপচারিতায় যথারীতি খেজুরগাছের প্রসঙ্গ এল। এ বিষয়ে আমাদের চলমান কর্মকালের কথাও জানলেন তিনি। বোঝা গেল, উদ্ভিদ-বিষয়ে তিনি বেশ সংবেদনশীল। আমাদের মতো তিনিও ভাবছেন, কীভাবে আবার খেজুরগাছগুলো ফিরিয়ে আনা যায়। সেই ইচ্ছা থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে নিজের গ্রাম নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার পাঁচগ্রাম ইউনিয়নে ১ হাজার ২০০ তাল-খেজুরের চারা রোপণের আগ্রহের কথা জানালেন। এ গাছগুলো লাগানোর জন্য দুবার যাওয়া হলো পাঁচগ্রামে।
চিত্রা নদীর পাড়ে অবস্থিত শান্ত নিরিবিলি এই গ্রাম ছায়াঢাকা, মায়ামাখা। সড়কগুলোয় খুব বেশি ভিড় নেই। মানুষের আনাগোনা কম। গাছ লাগানোর সম্ভাব্য সড়কগুলো আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি। এভাবেই পথের ধারে খুঁজে পাই দুটি অপ্রচলিত উদ্ভিদ। তখন বৃক্ষরোপণের আনন্দের সঙ্গে যোগ হয় আরেক মহা আনন্দ!
একসময়ের সহজলভ্য এ দুই উদ্ভিদ এখন আর ততটা সহজলভ্য নয়। এদের একটির স্থানীয় নাম উধুঝাটি। কোথাও কোথাও নীলকণ্ঠ, নীলকাঁটা, নীলসহচরা, ঝিন্টিকাঁটা ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
উধুঝাটি (Ecbolium ligustrinum) গুল্মশ্রেণির উদ্ভিদ। ফুল ও পাতার সৌন্দর্যে গাছটি অনন্য। পাতা ৭ থেকে ১০ সেমি, উপবৃত্তাকার-ডিম্বাকৃতি থেকে বি–ডিম্বাকৃতি, আগা দীর্ঘ, অখণ্ড এবং মসৃণ। পত্রবৃন্ত ১ থেকে ২ সেমি লম্বা। ফুলগুলো কিনারায় থাকা স্পাইকে সজ্জিত, ৫ থেকে ১২ সেমি লম্বা ও ঘন। বৃতি ৫-খণ্ডিত, অর্ধসমান, মুক্ত, সরু, বেলনাকার, আড়াই থেকে ৩ সেমি লম্বা ও হালকা নীল বা নীলচে সবুজ।
দলম্লল নলাকার, খণ্ড ৫টি, নল সরু, আড়াই থেকে ৩ সেমি লম্বা ও নীলচে সবুজ। ফুল ও ফলের মৌসুম প্রায় সারা বছর। সাধারণত ছায়াযুক্ত স্থানেই বেশি জন্মে।
এই উদ্ভিদ গেঁটেবাত এবং মূত্রথলির ব্যথায় ব্যবহৃত হয়। পাতার ক্বাথ জন্ডিস, মেনোরেজিয়া ও বাত রোগে ব্যবহৃত হয়। বীজের মাধ্যমেই বংশবিস্তার ঘটে।
আরেকটি উদ্ভিদের নাম বাঘলতা। কোনো কোনো অঞ্চলে এটি টিলিয়াকুরু বা ভেন্নালতা নামেও পরিচিত। লতানো এই উদ্ভিদ (Tiliacora acuminata) কখনো কখনো গুল্মের মতো ঝোপালো হয়ে থাকে। ডিম্বাকার পাতা কাগজের মতো মসৃণ, সবুজ এবং চকচকে উজ্জ্বল।
কিনারা কিছুটা ঢেউখেলানো, গোড়ার দিকে শিরা ৩ থেকে ৫টি, প্রধান শিরা এবং পার্শ্ব শিরাগুলো কিনারার কাছাকাছি শাখান্বিত, পত্রবৃন্ত লম্বালম্বি খাঁজকাটা, দেড় থেকে ৩ সেমি লম্বা। পুরুষ ফুল হলুদ, পুষ্পমঞ্জরি কাক্ষিক, যৌগিক মঞ্জরি ৩ থেকে ১০ সেমি লম্বা, রোমশ ও পার্শ্ব শাখা ১ সেমি পর্যন্ত লম্বা।
মঞ্জরিদণ্ড সাধারণত ৭ মিমি-এর বেশি লম্বা হয় না। ৩টি বৃহত্তর, উপবৃত্তকার পাপড়ি বি-ডিম্বাকার ও মসৃণ। স্ত্রী মঞ্জরি পুং মঞ্জরির মতোই, তবে ফুলের সংখ্যা কম। গর্ভদণ্ড ১ মিমি লম্বা। ফুল ও ফলের মৌসুম মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে।
বিষধর সাপের দংশনে এ গাছের শিকড় পাথরে ঘষে পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। অধিক নমনীয় বা নরম শাখা-প্রশাখাগুলো কুঁড়েঘর এবং ঝুড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
খেজুরগাছের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ করা যাক সে প্রসঙ্গ দিয়েই। কালিয়া উপজেলার ছোট্ট একটি ইউনিয়নে লুপ্তপ্রায় খেজুর-শিল্পকে পুনর্জীবন দান করতে যে উদ্যোগ নেওয়া হলো, গাণিতিক হিসাবে তা হয়তো বড় কিছু নয়, কিন্তু এর আবেদন কোনোভাবেই ক্ষুদ্র নয়।
আমরা চাই, এমন একটি মহৎ কাজে এগিয়ে আসুন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। আমাদের গ্রামগুলো আবার সুদৃশ্য খেজুরগাছে ভরে উঠুক। পিঠা-পায়েসের মিষ্টি-মধুর সুবাসে শীতের দিনগুলো হয়ে উঠুক আরও উপভোগ্য।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক