
বছর কয়েক আগে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুরে একটি চা-বাগানে গিয়েছিলাম দুটি টিলায় উদ্ভিদ জরিপের কাজে। টিলাগুলো প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের আবাদ করা হয়নি। প্রায় তিন একর আয়তনের এই টিলা বিচিত্র গাছপালা, লতাগুল্ম আর তৃণরাজিতে পরিপূর্ণ। ছয় সদস্যের একটি দল নিয়ে টিলার এক প্রান্ত থেকে আমাদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হলো। পথ তৈরি করার জন্য বাগানের একজন সুদক্ষ কর্মীও সঙ্গী হলেন। তিনি গাছপালা ভালোই চেনেন। আমরা যখন একটি গাছ চেনার চেষ্টা করছি, তখন তিনি বলেন, ‘এইটা বনাক’। আঞ্চলিক নাম। বুঝতে অসুবিধা হলো না, এটা আসলে মাকড়িশাল। টিলাজুড়ে এই গাছের রাজত্ব। ঢাকায় মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে আছে একটি। আরেকটি গাছ রমনা পার্কে লাগিয়েছেন নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা। রমনার গাছটিতে এখনো ফুল দেখিনি। গত ২৫ বছরে কত বনজঙ্গল ঘুরেছি, কিন্তু অল্প পরিসরে এত উদ্ভিদবৈচিত্র্য খুব কম দেখেছি। এখানকার প্রতিটি গাছই বুনো। এ কারণে সমতলের সঙ্গে গড়নের দিক থেকে কিছুটা ভিন্নতাও রয়েছে।
টিলার প্রায় মাঝামাঝি স্থানে পেলাম দুর্লভ মাধবীলতা। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো প্রথম কোনো মাধবীলতা দেখার সুযোগ হলো। ভেবেছিলাম প্রকৃতিতে আর কখনো মাধবীলতা দেখতে পাব না। খুবই আনন্দ হলো। বুনো জলপাই, চালতা, লটকন, আমলকী, ডেফল, বহেড়া, জারুল, ডুমুর সমতল থেকে একেবারেই আলাদা। গাছে দু-একটা ফল দেখে জংলি কুল শনাক্ত করা গেল। উদাল, ঝুমকাভাদি, মাটাং, শিমুল দেখে বেশ চমৎকৃত হলাম। মোটা কাণ্ডের কয়েকটি কুমারীলতাও চোখে পড়ল। টিলাভর্তি লতাচালতা আর বন-জুঁইয়ের ঝাড়। লতাচালতা বলধা গার্ডেনের সাইকিতেও আছে। শেষ প্রান্তে ঢালে এসে পেলাম জংলি পান আর ড্রাসিনা। দুই টিলার মাঝখানে পেলাম বেশ বড় আকারের একটি দুলিচাঁপা। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের সংগ্রহ দাঁড়াল দেড় শ প্রজাতির মতো। তবে এতে তৃণ, বীরুৎ, বর্ষজীবীগুলো রাখা হয়নি। এমন ছোট্ট দুটি টিলায় এত উদ্ভিদবৈচিত্র্য সত্যিই ধারণাতীত!
এই জরিপে প্রথম দেখা একটি উদ্ভিদ বড় শালপান (Flemingia macrophylla)। গাছটির ফুলের রং চটকদারি। আমাদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করল।
এটি মূলত কাষ্ঠললতার বহুবর্ষজীবী, গভীর শিকড়যুক্ত, পাতাভর্তি গুল্ম শ্রেণির উদ্ভিদ। প্রায় আড়াই মিটার উঁচু হতে পারে। প্রধান কাণ্ড খাড়া, একক ভিত্তি থেকে অসংখ্য কাণ্ড উৎপন্ন হয়। কচি শাখাগুলো সবুজাভ, পুরোনো ডালপালা বাদামি। পাতা ত্রিপত্রিক। ফুলগুলো বেশির ভাগ ঘন রেসিমে আবৃত, ফুল দেড় সেন্টিমিটার লম্বা, সাদা থেকে গোলাপি বা হলুদাভ, স্বতন্ত্র লাল দাগ বা ডোরা এবং বেগুনি ডগাসহ পরিমিত সবুজাভ, ডানা গোলাপি। বীজ গোলাকার, ২ থেকে ৩ মিলিমিটার ব্যাস এবং চকচকে কালো। জানুয়ারি থেকে মার্চ ফুল ও ফলের মৌসুম। দেশের প্রায় সব জেলাতেই এ গাছ সহজলভ্য বলা হলেও ইদানীং সমতল অঞ্চলে খুব একটা দেখা যায় না। গাছের মূল আলসার ও আঘাতজনিত ফোলার চিকিৎসায় ব্যবহার্য।
বলধা গার্ডেনের সাইকিতে লতাচালতা (Tetracera sarmentosa) দেখে ভেবেছিলাম হয়তো ভিনদেশি উদ্ভিদ। এখানে গাছটি দেখে রীতিমতো চমকে উঠি। সাইকিতে অতি যত্নে থাকা গাছটিই এখানে বুনো।
এরা চিরসবুজ কাষ্ঠললতার গাছ। বাহন পেলে প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আবার ঝোপাল করেও রাখা যায়। পাতা পুরু, উভয় পিঠ অমসৃণ, প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা, কিনারা খণ্ডিত বা অসমান, শিরা সুস্পষ্ট, পত্রবৃন্ত ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল ও ফলের মৌসুম মে থেকে ফেব্রুয়ারি। বৃহত্তর সিলেট ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে জন্মে।
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় লতাচালতার পাতার গুঁড়া পানির সঙ্গে মিশিয়ে উদরাময় নিরসনে খাওয়ানো হয়। কম্বোডিয়ায় সম্পূর্ণ গাছটিকেই ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। শ্রীলঙ্কায় পালিত হাতিদের এ গাছ খাওয়ানো হয়। আসামের কার্বি ও মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ ঘন বনে পানি সংগ্রহের কাজে গাছের ডালপালা ব্যবহার করেন। মূলের নির্যাস দেশের তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় বাত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করেন। নান্দনিক উদ্যানসজ্জায় এই গাছ আদর্শ। প্রাকৃতিক আবাসেও গাছটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।