দেশের পথিকৃৎ নাট্যজন ও শিক্ষাবিদ ফেরদৌসী মজুমদার
দেশের পথিকৃৎ নাট্যজন ও শিক্ষাবিদ ফেরদৌসী মজুমদার

সাক্ষাৎকার: ফেরদৌসী মজুমদার

মুনীর চৌধুরী ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম

ফেরদৌসী মজুমদার— দেশের পথিকৃৎ নাট্যজন ও শিক্ষাবিদ। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর’ এবারের আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা আর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন

আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো এই অনুষ্ঠানে। আজ আমরা এসেছি বাংলাদেশের অগ্রগণ্য পথিকৃৎ শিল্পী, নাট্যশিল্পী, নাট্যজন ও শিক্ষাবিদ, যিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন এবং পেয়েছেন সারা দেশের মানুষের ভালোবাসা । আমরা এসেছি মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদারের কাছে। আপা, আপনাকে প্রথম আলোর এই বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’তে স্বাগত জানাই।

ফেরদৌসী মজুমদার: ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

আমরা এই অনুষ্ঠানে শৈশব থেকেই শুরু করি। এমনিতে আপনাদের বাড়ি, মানে দাদার বাড়ি, পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালী হলেও আপনার জন্ম হলো বরিশালে। আপনার বাড়িটাকে বলত ডেপুটি বাড়ি।

ফেরদৌসী মজুমদার: অনেক কিছু জানেন তো আপনি।

প্রশ্ন

মনে পড়ে বইটাতে এত সুন্দর করে লিখেছেন আর এর প্রকাশনা উৎসবে তো আমি যোগ দিয়েছিলাম।

 ফেরদৌসী মজুমদার: ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

আপনার জন্ম হলো বরিশালে। এর কারণটা আপনি নিজ মুখে বলেন আর আপনার আব্বা তো খান বাহাদুর আবদুল আলিম চৌধুরী নাকি হালিম চৌধুরী।

ফেরদৌসী মজুমদার: আবদুল হালিম চৌধুরী। বরিশালে জন্ম। বাবা তো ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। সেভাবেই ওখানে কিছুদিন ছিলেন। সেখানেই আমার জন্ম। সেভাবেই আমার একেক ভাইয়ের একেক জায়গায় জন্ম।

প্রশ্ন

আপনারটা জন্ম বরিশালে। আপনার প্রাথমিক বিদ্যালয় কি বরিশালে?

ফেরদৌসী মজুমদার: না। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয় ঢাকায়। আমি মানুষ হয়েছি কিন্তু ঢাকায়।

প্রশ্ন

আপনি ঢাকায়...?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ। মানে, মানুষ হয়েছি কি না, জানি না।

প্রশ্ন

আপনাদের বাড়িটা—তখন এটার নাম ছিল দারুল আফিয়া।

ফেরদৌসী মজুমদার: দারুল আফিয়া। জি। মানে, আফিয়া আমার মায়ের নাম।

প্রশ্ন

আফিয়ার বাড়ি। এটা এই গ্রিন রোডের ভেতরে সেন্ট্রাল রোডে। এই জায়গাতেই। এখন যেটা মাতৃছায়া।

ফেরদৌসী মজুমদার: জি, মাতৃছায়া।

প্রশ্ন

আপনার প্রাইমারি স্কুলটা ছিল নারীশিক্ষা মন্দির।

ফেরদৌসী মজুমদার: নারীশিক্ষা মন্দির।

প্রশ্ন

এটা কোথায় অবস্থিত ছিল?

ফেরদৌসী মজুমদার: টিকাটুলী। এখান থেকে রিকশায় যেতাম। তখন তো রিকশা ছাড়া আর কিছু ছিল না। বাড়িতে একমাত্র আমার একটা ভাইয়ের গাড়ি ছিল আর কারও গাড়ি ছিল না।

প্রশ্ন

এখন আমার আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার জন্ম ১৯৪৩ সালের জুনে। আপনার ৮৩ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে সামনের জুনে। আপনার যখন জন্ম, আপনি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ছেন, তখন মুনীর চৌধুরী কত বড়?

ফেরদৌসী মজুমদার: ওহ, তখন আমি তো একদম ছোট।

প্রশ্ন

আপনারা ১৪ ভাই–বোন। সবার বড় কবীর চৌধুরী।

ফেরদৌসী মজুমদার: কবীর চৌধুরী, তারপর মুনীর চৌধুরী।

প্রশ্ন

আপনি?

ফেরদৌসী মজুমদার: আমি হলাম ১১ নম্বর।

প্রশ্ন

আপনি হচ্ছেন ১১ নম্বর। আপনারা ৮ ভাই, ৬ বোন। সবাই প্রায় বিখ্যাত এবং যে মানুষ হলেন, এর পেছনে আপনার আব্বার অবদান আছে সবচেয়ে বেশি এবং মায়েরও আছে।

ফেরদৌসী মজুমদার: মা একদিক করেছেন, বাবা আরেক দিক করেছেন। বাবা লেখাপড়া ছাড়া চোখে কিছু দেখতেন না। মা যদি বলতেন এরা কোনো কাজ করে না, একটু রান্নাবাড়ি করুক। আমার বাবা বলতেন, ‘কাজ করতে হইত না। যেগুনে পড়ালেখা করে হেগুনে পড়ালেখাই করব। আর মাইয়ার মাইয়ারা যত ইয়েই হোক, শ্বশুরবাড়ি গেলে ওর লাকড়ি ঠেলতেই হইব (তখন তো লাকড়ির চুলা)। হেগনে রান্না শিখি যাইব, তুমি এটা নিয়ে ইয়ে করো না।’

প্রশ্ন

স্কুলে আপনার রেজাল্ট কেমন ছিল?

ফেরদৌসী মজুমদার: মিডিয়াম। মানে, আমি একেবারেই উচ্চাভিলাষী ছিলাম না। আমার একটা ভাইয়ের সঙ্গে আমি তুলনা করি সব সময়—অন্য ভাইয়েরাও আছে—যে ভাইটার সঙ্গে আমার বেশি ভাব ছিল, বন্ধুর মতন ছিল, ও পরীক্ষা দিয়ে এসে শুয়ে পড়ত।

প্রশ্ন

আপনার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত আপনার দুই ভাই?

ফেরদৌসী মজুমদার: না না, ও পড়ত কেমিস্ট্রিতে আর আমি পড়তাম তখন ইউনিভার্সিটিতে। তখনকার কথা বলছি। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে। আমি অনার্স পরীক্ষা দেব, তো খুব বড় একটা রুটিন করে দরজায় সেঁটে দিলাম। ওখানে মাঝখানে এক জায়গায় ছোট্ট করে লেখা—ঘুম। তো আমার ভাই বলছে—ও খুব রসিক ছিল—তুই ঘুমটা বরং বড় করে দিয়ে আর আব্বা...

প্রশ্ন

ওনার নাম কী ছিল?

ফেরদৌসী মজুমদার: তার নাম ছিল শেলি, আছে এখনো। ওই একটা ভাই–ই আছে, জার্মানিতে থাকে। লেখাপড়ায় অসম্ভব ভালো ছিল। ও পরীক্ষা দিয়ে এসে ধাম করে শুয়ে পড়ত। আমি বললাম, ‘কী রে, পরীক্ষা ভালো হয় নাই?’ ‘না, ডায়েল।’ তখন ডালকে বলত ডায়েল। আমি বললাম, ‘কেন? কত পাবি?’ বলে, ‘৯৫।’ আউট অফ ১০০তে ৯৫ পাবে। এ জন্য ওর মন খারাপ হয়েছে। আর আমি পরীক্ষা দিয়ে হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে আসতাম। বলত, ‘কী রে, কী রকম হলো পরীক্ষা?’ আমি বলতাম, ‘খুব ভালো।’ ‘কত পাবি?’ ‘৫৫।’ মানে একটা হিসাব করে…ওই লেখাপড়া করেছি বটে, সেটা বাপের জন্য। হয়তোবা না থাকলে আমি পড়ালেখা করতাম না। আমার পড়ালেখায় কোনো ইয়ে ছিল না। যা–ই হোক এই...

প্রশ্ন

আপনার বইটাতে সব কটি চরিত্র খুব সুন্দর এসেছে। এ জন্যই আপনি বইটার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ। কে যেন একজন বলেছিলেন, ‘আপনি এটা না লিখলে জানতাম না।’ ওই ড. ইউনূস বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনি বইটা না লিখলে এ রকম একটা ইউনিক ফ্যামিলি আছে, কেউ জানত না।’

প্রশ্ন

উনি লিখেছেন যে ওই ঈদে বাড়ি গিয়ে ওনারাও সব ভাইবোন আপনার বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে তখন অতি স্মৃতি নিয়ে হাসাহাসি করতেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, ওই যে আমার ছোট বোন ছিল, …একমাত্র আমাদের বাড়ি সেন্ট্রাল রোডে দারুল আফিয়াই হচ্ছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটা বাড়ি। আরেকটা ছিল উকিল সাহেবের বাড়ি। তো মেয়েও আমরা ছয়জন—ছয় বোন। তো আমরা কিছু করলে ওরা তাকিয়ে থাকত, মেস ছিল একটা, ইয়ে ছিল। তো, আব্বা মানে আমার বাবা কোনো বয়স কিছু তাঁর কাছে ছিল না, সন্তান সন্তান। জুতা দিয়ে পিটাত আমাদের যদি কোনো ভুল করতাম। তো দেরি করে নামাজের আগে ফিরতে হতো বাসায়, সন্ধ্যাবেলাটা। তো, ও দেরি করে ফিরেছে দেখে… আমার ছোট বোন বানু। ও নেই এখন। ওকে মারতে গেছে, বানুর আবার জেদ ছিল খুব। তখন ও আব্বার হাতটা ধরে বলছে যে আপনি ভেতরে এসে মারেন, ওখানে মেসের জানালাগুলো খুলে গেছে ওরা, সব দেখতেছে। তো আমার বাবা ওটা ফেলে দিয়ে বললেন, হিগার মাইরের দিকে খেয়াল নাই, কোনগা দেখে কোনগা দেখে না, এইগারে মাইরতাম কী। এই হচ্ছে এই বর্ণনা, আমি পড়েছি।

প্রশ্ন

আর ওই হফ হফ হফটা মনে আছে আপনার?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ।

প্রশ্ন

ওটা একটু বলবেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: ওটা হচ্ছে যে আব্বা তো মানে জাত মাস্টার ছিলেন। মানে শিক্ষক। উনি যাকে পেত, ওই টোকাই, টোকাই ডেকে পড়াতেন, …এ এটা, বি এটা, সি এটা, ক খ—এ রকম পড়াত। দেশের বাড়ি থেকে অনেক লোক আসত, আমার বাবার দেশের, মার দেশের না। তো, তাদেরকে তো বাবা পড়াতেন। তো, নুরু বলে একটা ছেলে ছিল, ওকে সে বলল যে পড়, ওয়ানস আই স এ লিটল বার্ড কাম হপ হপ হপ। ও ওয়ানস আই স এ লিটল বার্ড কাম হফ হফ হফ। তো আব্বা বলছে যে স কস আর যাই কস কিন্তু হপ হপ কইতে পারতি না। কয়, একটা কবি তো পিঠের মধ্যে বাড়ি পড়ব। তো ব্যাস, অনেক চেষ্টা করে হপ হপ পারে না, শেষে অনেক কষ্ট করে হপ হপ হপ। মাশা আল্লাহ, মাশা আল্লাহ। মানে ওনার ইয়েটাই আলাদা ছিল, মানে একটা কিছু বার করতেন, একটা কিছু তৈরি করতেন এ রকম।

প্রশ্ন

আর আপনার মা এত সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখতেন, আপনি অনেকগুলো চিঠি উল্লেখ করেছেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: খুব সুন্দর চিঠি লিখতেন এবং উনি স্বশিক্ষিত ছিলেন। ওনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না; কিন্তু অত্যন্ত ভদ্র ছিলেন। আমাদেরকে ভদ্রতাটা উনি শিখিয়েছেন। এই পা নাচাইও না, ওনার বাড়ি ছিল কুমিল্লা। পা নাচাইও না আর খাওনের সময় চপ চপ চপ করে খাইও না, শব্দ হইব। এইসব উনি শিখিয়েছেন। আর কথায় কথায় শ্লোক বলতেন, কথায় কথায় ইয়ে বলতেন।

ফেরদৌসী মজুমদারের জন্ম ১৯৪৩ সালের জুনে। পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালী হলেও জন্মস্থান বরিশাল। তবে বেড়ে ওঠা ঢাকায়
প্রশ্ন

হ্যাঁ, আমাদের আম্মারা আপনাদের আম্মারা তো বটেই; অনেক শ্লোক বলতে পারতেন, প্রবাদ প্রবচন সব মুখস্থ থাকত। সেইটা, ওই প্রবণতা, ওই রীতিটা এখনকার আমাদের মধ্যে আর নাই।

ফেরদৌসী মজুমদার: না, ওগুলো তো এখন আর চলেও না, সে জন্য আমার মাঝে মাঝে আমি যখন বলি, সবাই, মানে আমার সহজাত ইয়ে থেকে বেরিয়ে আসে। আম্মা বলত—না পাইয়া পাইছে ধন, বাপে–পুতে কীর্তন। মানে একজনের আদিখ্যেতা আরকি, আগে কিছু দেখে নাই, আরেকজনের বাসায় আসছে অনেকে, একেকজন নষ্ট করে খেয়ে দে ঘুমিয়ে–টুমিয়ে যা–তা। তখন আম্মা বলত, এই তো না পাইয়া পাইছে ধন, বাপে–পুতে কীর্তন। এই যে এগুলো শুনতে শুনতে না আমাদের ইয়ে হয়ে গেল, মাঝে মাঝে বলতাম আম্মার কথাগুলো। আর আমার মা, ওনার কাছ থেকেই বোধ হয় আমরা ওই ধৈর্যটা শিখেছি। মানে, আমার বাবা একেবারে এত ডমিনেট করেছেন মাকে বলার নাই যে আমার বড় বোন নাদেরা আপা, উনি বিয়ে হয়ে যখন চলে গেলেন, তখন উনি লিখেছিলেন আমার মাকে সোজা পাইয়া ঠকাইবেন না। আমার বাবাকে বলছেন। মা লেখাপড়া জানতেন না; কিন্তু হাতে হাতে হিসাব করতেন। বা মুখে মুখে হিসাব করতেন একদম।

প্রশ্ন

১৪ ছেলেমেয়েকে মানুষ করা কি যা–তা কথা?

ফেরদৌসী মজুমদার: ১৪টা ছেলেমেয়ে এবং কোনো ভুল হতো না, কিন্তু বাবারই ছিল মানে এটাকে পুরুষশাসিত সমাজের পুরুষ। তাঁকে যদি কেউ কোনো দোষ ধরত, মা যদি বলত ‘আপনি’, খুব বিনয়ের সঙ্গে আমরা দেখেছি যে ‘আপনি’ ‘উনি’ হিসাব করতেন খুব বাবা। যে আপনি যে হিসাব করছেন, এখানে একটু মনে হয় ভুল হইছে …। কী, তুমি আমার ভুল ধরছ, এত বড় সাহস তোমার, থাকতাম ন এই বাড়িতে, চলি যাম। উনিও চলে যাচ্ছেন, ওটা একটা ড্রামাটিকস, মাও পাঞ্জাবি ধরে টানছেন—না না, আর কমু না, আর কমু না। আমার ভাইবোনরা বলতেছে, আরে ছেড়ে দেন না, উনি যাইব কই। এই হলো আমাদের ইয়ে, সব একটা ইয়ে পরিবার।

প্রশ্ন

আচ্ছা, তো মুনীর চৌধুরী স্যার, উনি যে ‘কবর’ নাটকটা লিখলেন জেলখানায় বসে, ওগুলো কি আপনার মনে আছে যে ওনাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো?

ফেরদৌসী মজুমদার: একটু একটু মনে আছে যে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো, ওটা মনে নাই। জেলখানায় বসে (লিখেছেন) শুনেছি, শোনা কথা।

প্রশ্ন

উনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, তখন কি উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই থাকতেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: না, নীলক্ষেতে থাকতেন; কিন্তু আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, উনিও তো ওখানে কাজ করেন। কিন্তু উনি প্রতিদিন একবার আমার মার সঙ্গে দেখা করতেন, আর আমরা যেহেতু কাঁচা আম, জলপাই এগুলো পছন্দ করতাম, প্রথম যখন উঠত, ওনার ক্রেডিট, এটা নিয়ে উনি ক্রেডিট নিতেন। এই নে, প্রথম আম উঠেছে …।

প্রশ্ন

আর একটা খুবই মজার কথা লিখেছেন, যেটা কিছুদিন আগে আমি ফেসবুকে ছবি দিয়েছিলাম যে একটা গোল গোল পাতা, ঘাসের মতন মাটিতে হতো, একটা টক ছিল, ওইটা তুলে তুলে খেতাম। এটা আপনি লিখেছেন অনেক দিন, মানে আরেকজনকে পেলাম যে এই কথাটা স্মরণ করছেন। মনে আছে আপনার এগুলোর কথা?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, টক পাতা। না, টক পাতা আমি খুব টক খেতাম। মানে যখন দুপুরে সবাই ঘুমাত, আমি তখন বসে বসে কোনো তেঁতুল পাই না, জলপাই পাই না, কিচ্ছু পাই না; তখন শুধু ওই যে বাটা, তখন তো বাটা মরিচ। বাটা মরিচ আর একটু শর্ষের তেল মাঝখানে নিয়ে লবণ দিয়ে নিয়ে শুধু ওটা খেতাম। তো আমার মা বলত, তুমি এ রকম খাও দেখবা অসুখ হইব, এই হইব, সেই হইব। কিচ্ছু টক না পেলে নিজেই আবিষ্কার করছিলাম যে দেয়ালের মধ্যে একটা লুচির মতন পাতা, সেটা মুখে দিয়ে দেখি টক। তো ওইটা খাওয়া শুরু করলাম। পরে মা বলল যে তুমি কোন দিন যে মরে যাবা, কোনটার মধ্যে বিষ আছে, কোনটার মধ্যে কী, তুমি ইয়ে, আমি কই, না, মরব না আমি, খেয়ে খেয়ে দেখব।

প্রশ্ন

তারপরে আপনি ১৬ বছর বয়সে মাধ্যমিক—ম্যাট্রিক যেটা সেটা পাস করলেন, ইন্টারমিডিয়েট পাস করলেন, প্রথম মঞ্চনাটক করলেন কবে?

ফেরদৌসী মজুমদার: প্রথম অভিনয় হচ্ছে ইকবাল হলে, ‘ডাক্তার আব্দুল্লাহর কারখানা’, শওকত ওসমান সাহেবের লেখা মুনীর ভাইয়ের প্রোডাকশন আরকি। তো, তখন তো আমাদের বাড়িতে আমার বাবাই প্রধান। তো তিনি বলছিলেন যে কেউ যদি কোনো নাটক করে, ইয়ে করে, এগুলো শরিয়তবিরোধী কাজ, গান–বাজনা, নাটক এগুলো সব শরিয়তবিরোধী, তোমরা যদি কেউ করি থাকো আমি যদি টের পাই তো জবাই দিয়ে দেব। তো আমরা তো খুব ভয়ে থাকি, থাকতাম, করতাম না; কিন্তু ওই যে নিষিদ্ধ, ফলে যে একটা আকর্ষণ ওইটাই হয়েছে, আমি তো সমানে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম, দেখতাম—এই লোকটা এভাবে হাঁটে, এই লোকটা এই করে। আমার বাবাও কিন্তু দেখতেন, আমার মাও বোরকা পরতেন কিন্তু বাইরে;… আমার বাবাই প্রথম কিন্তু এই যে ‘পায়ের আওয়াজে’ লুঙ্গি পিছন দিকে ধরে না, এটা কিন্তু আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, সেটা আমি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে (নাট্যকার) বলেছিলাম। যে আমার বাবা বলছেন, দেখ, ব্যাকে সামনে দি লুঙ্গি ধরে, হিগা পিছে দি লুঙ্গি ধরে। সেই থেকে ওইটা কিন্তু এখন ‘পায়ের আওয়াজে’ মাতব্বর সব সময় পিছন দিয়ে লুঙ্গি ধরে। তো আমি আমার, তখন ওই নাটকটা আমি করতাম না, করার কোনো প্রশ্নই নাই। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে আছি, আমার মা, ভাই এসে বললেন যে মুনীর ভাই বললেন যে তুই একটা নাটক করবি, আমি আকাশ থেকে পড়লাম, নাটক করমু কি আমি, আমি কে, কী করে করব, আব্বা তো মেরে ফেলবে বলে, সেটার ইয়ে আমি নেব, মারবে না, তুই কর আমার একটা আর্টিস্ট ফেইল করেছে, আমার মনে হয় ওটা দিলারা হাশেম বোধ হয় ছিল। তো উনি বললেন যে আমি তো অভিনয় জানি না। তো বলে, জানতে হবে না, ওটা রোবটের ক্যারেক্টার—যন্ত্রমানবী; তুই খালি ঠক ঠক ঠক ঠক করে হাঁটবি আর খালি ডায়ালগটা মুখস্থ করবি। তো ডায়ালগ মুখস্থ করা আমার কাছে কিছু না, আমি তো ডায়ালগ মুখস্থ করেছি। তো মুনীর ভাই যখন বলছে, আমার বুকে ভরসা এসেছে, আমি করেছি এবং মুনীর ভাই উচ্ছ্বসিত, এত আদর করেছে আমাকে, এত ভালোবেসেছে যে তুই না থাকলে তো হতো না, তুই কেন বলিস যে পারবি না। তো আমি বললাম, না আমি তো করি নাই কোনো দিন। কয়, এটা কিছু করার আছে, এটা তো কিছু করার নাই। তারপরে অন্য নাটক করে একতলা দোতলা এই ইয়ে...

প্রশ্ন

‘একতলা দোতলা’ ছিল ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনের উদ্বোধনী নাটক।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, সেটিই ছিল প্রথম নাটক।

প্রশ্ন

ওটাতে আপনিও অভিনয় করেছিলেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি অভিনয় করেছিলাম।

প্রশ্ন

তো রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কোথায় হয়েছিল?

ফেরদৌসী মজুমদার: ইউনিভার্সিটিতেই পরিচয়। উনি সোশিওলজিতে পড়তেন—না, আমরা একই ইয়ারের, একই ব্যাচের ছিলাম। তবে উনি পড়তেন ইংরেজিতে, আর আমি বাংলায়। আমাদের দেখা হতো একটি জায়গায়—সাবসিডিয়ারি বিষয় ছিল সোশিওলজি। সেখানে ক্লাস শেষে একসঙ্গে বের হওয়ার সময় ওনার সঙ্গে আমার দেখা হতো। তখন অবশ্য তেমন কিছুই ছিল না। উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আমি দু-একটা কথা বলতাম। তবে আমাদের পরিবারের সঙ্গে ওদের পরিবারের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমার বাবা যখন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তখন তিনি ওনাদের বাড়িতে গেছেন, খেয়েছেন। সেই সূত্রেই মূলত পরিচয় ছিল।

প্রশ্ন

আপা, ওই ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকটা মুনীর চৌধুরীর লেখা। ওই নাটকের রিহার্সেলেই আপনার সঙ্গে রামেন্দু মজুমদারের পরিচয় হয়েছিল—এ রকম একটি তথ্য দেখতে পাচ্ছি।

ফেরদৌসী মজুমদার: পরিচয় ওইভাবেই। এখনকার মতো আমরা তখন এত স্মার্ট ছিলাম না। ভালো লাগার অনুভূতিগুলো ভেতরেই চেপে রাখতাম, মুখে বলতাম না।

প্রশ্ন

‘রক্তাক্ত প্রান্তর’-এ আপনি জোহরার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, জোহরা। আর ও ছিল ইব্রাহিম কার্দি—মানে নাটকের হিরো। ওই নাটক করতে গিয়েই আমাদের পরিচয়। মুনীর চৌধুরী ভাইয়ের বাসায় সে যেত, আমিও যেতাম—এভাবেই পরিচয়টা গড়ে ওঠে।

নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার
প্রশ্ন

তারপর ১৯৭০ সালের মার্চে আপনাদের বিয়ে হয়। তার আগে যখন আপনার আব্বা জানতে পারলেন যে এ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ফেরদৌসী মজুমদার: ওরে বাবা, সেই ভয়াবহ দিন! … আমার বাবা ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। আমি তখন বুঝে গিয়েছিলাম যে এই বিয়ে হবে না। আমার ভাইবোনেরাও কেউ এর এগেইনস্টে ছিল না, তারা বলত, এটা সম্ভব হবে না, তুই সরে দাঁড়া। আমি তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম—ভালোভাবে খাওয়াদাওয়া করতাম না, নিজের খেয়াল রাখতাম না। বাবা হয়তো সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমার মাকে ডেকে বললেন, “তুমি কেমন মা, মাইয়া দেখো না মাইয়া শুকাই যায়, মাইয়া খায় না কিল্লায় খোঁজ নাও।” তখন মায়েরও টনক নড়ে। পরে বাবা আমার ভাইবোনদের কাছ থেকেও বিষয়টা জানতে পারেন। কিন্তু তখনো কেউই ভাবেনি যে এই সম্পর্ক সফল হবে, কারণ বাবা পুরোপুরি এর বিরুদ্ধে ছিলেন। তবে সেই বাবাই আমাকে একটা বুদ্ধি দিলেন। বললেন, “তোর যখন বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে, আমি কী উত্তর দিমু? তুই পড়াশোনা কর।” তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, আপনি যা বলবেন আমি তা–ই করব। উনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কী পড়বি? আমি বললাম, আপনি যা চাইবেন। তিনি বললেন, “আমি চাই তুই অ্যারাবিক পড় পড়।” আমি বললাম, পড়ব।

প্রশ্ন

তারপর দুইটা মাস্টার্স, তাই না?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, অ্যারাবিকেও এমএ পাস করলাম। তখন দেখলাম, আমার বাবা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছেন।

 আসলে মানুষজন নানা কথাও বলতেন—অনেক ধরনের লোক আসত, … আমি বলতাম, ‘আমি বিয়ে করবই না।’ তখন এই বিষয় নিয়েও একটু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। যা–ই হোক, পরে বাবা বললেন—মেয়েটা শুকিয়ে যাচ্ছে। এরপর তিনি যখন চাকরিসূত্রে চৌমুহনীতে চলে গেলেন, দুই-তিন দিন পর আমার মাকে বলা হলো,  “তুমি মাইয়ারে জিগাও ।” কিন্তু উনি খুবই সরল ছিলেন, আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। আসলে বাবা নানা কায়দা করছিলেন। এমনকি আমার অ্যারাবিক পড়ার বইও তিনি কিনে আনতেন।

প্রশ্ন

বাংলাবাজার থেকে?

ফেরদৌসী মজুমদার: না, বাংলাবাজার নয়—আরও দূরের কোথাও থেকে তিনি বই কিনে আনতেন। যেগুলো দুষ্প্রাপ্য বই ছিল—অ্যারাবিকের ওগুলোও কিনে আনতেন। আমার বাবা বলতেন, “হিগা তো নিজে লেখাপড়া করে না কিন্তু বই চেনে। ওর কথা বলছে। সত্যি সত্যি বইগুলো খুব ভালো আনতেন।” আসলেই তিনি খুব ভালো বই আনতেন। তারপরে একদিন আমার বাবা বললেন ওনার মাকে বুঝতে পারিনি বাবাকে চিন্তিত দেখেছি। এরপর একদিন তিনি আমাকে বললেন, “তুই কি রামেন্দুর ঠিকানা জানসনি?”আমি বললাম, “জি না।” তিনি বললেন, “জানস না আচ্ছা কাম কর দেখ কোনোখানে লেখা আছেনি।” তখন আমি দোতলায় থাকতাম। বাবা কিন্তু বুঝতেন আমি অনেক কিছুই মুখস্থ বলি। আমি একটু সময় নিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, মনে পড়ছে—এই এই।”

 তখন উনি চিঠি লিখলেন ওকে যে তুমি আসো আমার সঙ্গে কথা বলো। তিনি এতই সন্তানবৎসল ছিলেন যে তিনি সন্তানদের মারধর করতেন, কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকাতেও পারতেন না। পরে তিনি প্রথমবার তার সঙ্গে কথা বলে বলেন, “যেটা করার করো তোমার মা-বাপকে কি করবে, আমার আমার মেয়েকে আমি ইয়ে করব ।”

 আমার কোনো ইয়ে নাই। তখন কথাবার্তা একটু বলাবলি চলছিল, তবে আমার শ্বশুরবাড়িতে খুব কড়াকড়ি ছিল—কিছুতেই মানা হচ্ছিল না। তখন তিনি অমতেই বিয়ে করেন। কবীর ভাইয়ের বাসায় বিয়ে হয়েছিল। সেখানে একজন সাক্ষী ছিলেন, যাকে আমরা রাজসাক্ষী বলি। আমরা বলি গোরা। তাঁর নাম রেজা চৌধুরী; তিনি তাঁর বন্ধু ছিলেন এবং একসাথে ইংরেজিতে পড়তেন, এখন তিনি ইয়েতে থাকেন। রেজাও সাক্ষী হিসেবে গিয়েছিলেন, আর আমার এক বন্ধু বেলীফুলের মালা দিয়ে উপস্থিত ছিল। মানিক ভাই (কবীর চৌধুরী) ও ভাবি দুজনেই অত্যন্ত ব্রডমাইন্ডেড ছিলেন, অত্যন্ত…।

প্রশ্ন

মানে কবীর চৌধুরী।

ফেরদৌসী মজুমদার: কবীর চৌধুরী এবং ওনার ডাকনাম মানিক। হ্যাঁ কবীর চৌধুরী এবং মেহের কবীর দুজনেরই মন খুব বড় ছিল। তো ওনার বাসায় বিয়েটা হয়েছে। যখন আমরা দুজন এসেছি সাড়ে ১০টার দিকে বাসায়, আমার বাবা তখন কথা বলতে পারেন না বন্ধ হয়ে গেছে কথা। একেবারে ক্ষীণ। তো তিনি দুই পায়ে দুজনকে বসিয়েছেন আর কাঁদছেন আর দুজনের মুখ মুছছেন মানে আশীর্বাদ করছেন আর কাঁদছেন দুজনের মুখ মুছছেন মাথাটা একসঙ্গে করে দিয়েছেন। ওই পর্যন্তই।

প্রশ্ন

তারপরে ১৯৭১ সালে আপনারা ভারতে গিয়েছিলেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, দিল্লিতে গেছি আরকি।

প্রশ্ন

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও কি একটু কাজ করেছিলেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, একটু করেছিলাম। আমার ঠিক মনে নেই। তবে কবিতা আবৃত্তিটাবৃত্তি কিছু একটা করেছিলাম আরকি।

প্রশ্ন

মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশে চলে এলেন, মুনীর চৌধুরী শহীদ হয়েছেন—সেসব কথা মনে আছে?

ফেরদৌসী মজুমদার: আমি তো দেখিনি কিছু; আমার শোনা কথা। একবার শুনি যে কবীর চৌধুরীকে ধরেছে, পরে শুনলাম যে না। এসব যখনই শুনতাম, আমার শরীর খারাপ হয়ে যেত। যখন শুনলাম যে মুনীর চৌধুরীকে ধরেছে, তখন আরও খারাপ লাগল। মুনীর চৌধুরী ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। কীভাবে ধরেছে কি, সেসব আমি জানি না। তখন যোগাযোগ করা খুব কঠিন ছিল। আমি একদম অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে গেলাম। তখন মাদাম ঘোষ আমাকে অ্যাটেন্ড করলেন। রোজ আসতেন। ঘুমের ওষুধ দিতেন। উঠলে পরে খাওয়াতেন। বলতেন, ‘তুমি এটা খাও। কারণ, তোমার ভাইকে তো নেবেই, ওটাই স্বাভাবিক। অন্য কাউকে না নিয়ে তোমার ভাইকেই নেবে। মুনীর চৌধুরীকে নেবে। মুনীর চৌধুরী–কবীর চৌধুরী এদের তো নেবেই। তুমি ধৈর্য ধরো। নিয়েছে নিয়েছে যাতে ঠিক থাকে ।…দেশে গিয়ে তারপর বুঝবে এই ওই পর্যন্তই।’

প্রশ্ন

আপনারা জানুয়ারি মাসে ফিরে এলেন; ২২ জানুয়ারি ১৯৭২। তারপরে দেখা যাচ্ছে, থিয়েটার নাট্যদল ফেব্রুয়ারিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। আপনি প্রথম থেকেই থিয়েটারে ছিলেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ। আমি, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার এবং আরও দুই–তিনজন; বাবু নাম ছিল আরকি! থিয়েটার গঠন করা হলো।

প্রশ্ন

’৭৩ সালে ত্রপার জন্ম হলো। মেয়ের মুখ দেখে কেমন লাগল?

ফেরদৌসী মজুমদার: আমি মেয়েই চেয়েছিলাম। আমরা দুজনই মেয়ে চেয়েছিলাম এবং আমাদের মেয়ে হয়েছে। যখন আমাকে ওটিতে নিয়ে যায়, কারণ আমার নরমাল হয়নি; সিজারিয়ান; আমি দেখলাম, ও অপরাধীর মতো একটা কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। অপরাধী তো বটেই। হ্যাঁ; … তারপর দেখলাম মেয়ে। ছবিটা আছে আমার কাছে। আমি তিন দিনের বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে আছি। সমস্ত দুঃখ, সবকিছু ভুলে গেলাম।

প্রশ্ন

আর শিক্ষকতার চাকরিটা কবে শুরু করেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: এমএ পাস করার পরই কিন্তু শিক্ষকতার চাকরিটা করি অগ্রণী স্কুলে। তা–ও করতাম না; আমার বাবা কাউকে অলস হয়ে বসে থাকতে দিতেন না। উনি বলতেন, ‘তোগো মাজায় তো জং ধরব। তোরা বই রইছত কা? তুই এমএ পাস করছত, রেজাল্ট আউট হয় নাই তো কী হইছে, তাতে তুই দেখ, যা, চাকরি কর। নিজের স্নো–পাউডার নিজে কিনি ল।’ মানে উনি আর দেবেন না আরকি! এটা ঠিক আছে।

প্রশ্ন

আপনি তাহলে অগ্রণীতে পড়িয়েছেন, উইলস লিটল ফ্লাওয়ারে পড়িয়েছেন, সানবিমসে পড়িয়েছেন। আর কোনো স্কুলে পড়িয়েছেন?

ফেরদৌসী মজুমদার: সানবিমসে পড়িয়েছি, মাস্টারমাইন্ডে পড়িয়েছি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ারে পড়িয়েছি এবং সবশেষে সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটিতে। আমার বাসার রান্নার লোকটা বলছিল যে এত দিনে খালাম্মা বড় হইছে।

প্রশ্ন

স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটিতে পদোন্নতি ঘটেছে। হ্যাঁ, বড় হয়েছে। তো, আপনার মঞ্চনাটক করতে বেশি ভালো লাগে নাকি টেলিভিশন নাকি সিনেমা?

ফেরদৌসী মজুমদার: মঞ্চ তো আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না। মঞ্চ হচ্ছে আমার তীর্থস্থান। আর কী বলব!

প্রশ্ন

এখনো করছেন লাভ লেটারস?

পারিবারিক আবহে রামেন্দু মজুমদার, ত্রপা মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার

ফেরদৌসী মজুমদার: লাভ লেটারস করছি। মেয়ে ত্রপা মজুমদার ডিরেক্টর। সহ–অভিনেতার নাম হচ্ছে রামেন্দু মজুমদার। খুব সুন্দর হয়েছে নাটকটা। আসলে প্রথমে মনে হতো যে আমি বোধ হয় খুব দুর্ভাগা। এ রকম একটা জট পাকিয়ে গেছে জীবন। কিন্তু পরে মনে হলো যে আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর তো কেউ নেই।

প্রশ্ন

আপনার রেডিও নাটকগুলো মনে আছে? আমি রংপুরে ৭২–৭৩–৭৪–৭৫ এই সব সময়ে ৭৭–৭৮ রেডিওতে আপনার নাটক শুনতাম। এত ভালো লাগত! আপনার কণ্ঠস্বর শুনলেই আমরা বুঝতাম যে নাটকটা ভালো হবে।

ফেরদৌসী মজুমদার: আমি তো ডিরেক্টর পেয়েছি ভালো, নাট্যকারও ভালো। মমতাজউদ্দীন আহমেদ স্যারের নাটক করেছিলাম কি চাহো শঙ্খচিল। মনে আছে খুব বেশি সিরিয়াস ছিলাম আমি। করতে গিয়ে হাত–পা ঠান্ডা হয়ে যেত আমার। দেখে পড়ছি, কিন্তু…. ওই মুক্তিযুদ্ধের ওপরে! মেয়েটাকে বার করে নিয়ে যায়, ইয়ে করে এবং নিষ্ঠুরভাবে। স্যার ‘হচ্ছে না, আবার করেন, আবার করেন,’ স্যার এভাবে আমাকে দিয়ে করিয়েছেন। এবং এখনো কি চাহো শঙ্খচিল শুনলে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আর আব্দুল্লাহ আল মামুন তো আছেনই। রাইট। হ্যাঁ, তাঁর নাটকও করেছি রেডিওতে। নাটকগুলো খুব ইয়ে হতো তখন। এখন এত জানি না আমি।

প্রশ্ন

মঞ্চে কোকিলায় একক অভিনয়। থিয়েটারের সব নাটকেই তো আপনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করতেন।

ফেরদৌসী মজুমদার: হ্যাঁ, মূল চরিত্রটা করতাম, মানে মহিলাটা। কিন্তু এটা নিয়ে অনেক কথাও হয়েছিল। একবার দলের মধ্যে একটা, হয় না দলে কোন্দল হয়, ভুল–বোঝাবুঝি হয়। আব্দুল্লাহ আল মামুন তো অত্যন্ত স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছিলেন। ওনাকে যখন একবার বলা হলো পত্রিকা থেকে, ‘আপনি সব নাটকে মূল চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদারকে নেন কেন?’ উনি এককথায় বলছেন,  ‘আমি তো আমার নাটক খারাপ করতে পারি না। আমার নাটকে যে চরিত্রটা তিনি ভালো পারবেন, আমি অন্যকে দেব কেন? আমি তো তাঁকেই দেব।’ এটা শুনে আমি আরও সিরিয়াস হয়ে গেলাম যে উনি আমার ওপর এতটা ভরসা করেন! এবং ওনার জোরে অনেক কিছু করেছি আমি। কোকিলা তো আমি বারণই করেছিলাম যে আমি কোকিলা পারব না। সোয়া দুই ঘণ্টা মঞ্চে এক আমি একা। আমি তো একেবারে অনাথ। অন্যান্য নাটকে তো কেউ একটা সাহায্য করে। এমনকি তীজন বাঈ দেখলাম, সেখানেও পেছনে দোহা বসে থাকে। তারা সাহায্য করে; ধরিয়ে দেয়। আমার তো ধরার কেউ নেই। সবটাই আমার নিজেকে করতে হবে। তখন উনি বললেন, ‘আপনার ওই চিন্তা নেই। আপনি যদি না পারেন, তাহলে পারবেটা কে? আপনি শুধু মুখস্থটা আমাকে বলেন। তিন পর্বের তো।’ তো আমি তো মুখস্থ কী করে করব এত! তো বলে, ‘আপনি মুখস্থ করেন। এক মাস, দু মাস, তিন মাস, এক বছর সময় দিলাম।’ তো আমি তিন মাসে মুখস্থ করেছিলাম।

সংশপ্তক নাটকে হুরমতি চরিত্রে ফেরদৌসী মজুমদার ও সহশিল্পী হুমায়ুন ফরীদি
প্রশ্ন

‘সংশপ্তক’–এর হুরমতি চরিত্রটা মনে আছে?

ফেরদৌসী মজুমদার: মনে আছে। এখানেও তো আবদুল্লাহ আল মামুন ও লিয়াকত আলী লাকী ছিলেন। উনি কিছুতেই আমার চুল ধরতে চাইতেন না। ওখানে মামুন ভাই বলছেন যে আমি রান্না করছি, আমার খোঁপা ধরে আমাকে ওঠাতে। এখন লিয়াকত আলী লাকী বললেন, না না, অনেক ব্যথা পাবে, আমি এটা করতে পারব না। আমি বলছি, আমি ব্যথা পাই আর যা পাই, আপনি করেন। আপনি আমাকে অ্যাক্টিংটা করতে দেন। তখন উনি সত্যি সত্যি টেনেছিলেন। আমার মনে পড়ে, চোখ দিয়ে জল পড়েছিল। মানে এত ব্যথা লেগেছিল তো চুলটা… এবং ওইখানে যে কপালে টিপকা দেওয়াটা, ওটা একটা ইউনিক সরঞ্জাম। সবাইকে বলা হয়েছে, দেখো, লাকী যেন আসল গরম শিকটা না দিয়ে দেয়। দুটো শিক করা হয়েছে—একটা গরম পয়সার, আরেকটা এমনি, ফেক আরকি। উনি বলছেন যে না, আমি দেব না। তো মামুন ভাই জিজ্ঞেস করছেন, আপনার ভয় করছে? আমি বলছি, না, আমার ভয় করছে না। বলেন, গুড। কারণ, আমরা কিন্তু নাটকে এটা শেখাই যে কো–আর্টিস্টের ওপরে যদি বিশ্বাস না থাকে, তাহলে ভালো করে অভিনয় করা যায় না।… তো আমাকে যখন লাকী বললেন যে আপনি ভয় পাইয়েন না; আমি বলি, না, আমি ভয় পাই না। আপনি গরমটাই দেন। জীবন দিয়ে দেব, আপনি গরমটাই দেন। … এটা করতে বেশ কিছুক্ষণ টাইম নিয়েছিলেন উনি। মামুন ভাই কেবল বলছেন যে খবরদার, দেখো যেন ভুলটা না দাও। এটা কিন্তু একদম জীবন–মরণ নিয়ে। তুমি কিন্তু ভুল দেবে না। উনি বলেন, না না মামুন ভাই, আপনি যান। ১০০ বার বুথ থেকে টা টা টা টা করে নেমে আসতেন আর টা টা টা টা করে উঠে যেতেন। তো আমারও বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ ঢিপ ঢিপ ঢিপ ঢিপ। যা–ই হোক, ঠান্ডাটা লাগিয়েছে আর আমি চিৎকারটা এমনভাবে করেছি, মনে হয়েছে যে সত্যিকারের শিকটাই লাগিয়েছে। ওইটাই মানুষকে খুব স্পর্শ করেছে।

প্রশ্ন

আপনার ভাই–বোনদের মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কে? কাকে বেশি মনে পড়ে?

ফেরদৌসী মজুমদার: রুশো। আমার ইমিডিয়েট বড়। তারপর হচ্ছে শেলী। শেলীর ব্যাপারটা আলাদা। সে আমাকে চাইকোভস্কি, তারপর বিটোফেন—এগুলো শিখিয়েছে, দেখিয়েছে। ওগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে ইন্টারেস্ট গ্রো করিয়েছে আমার।

প্রশ্ন

আর আপনার এত কাজ টেলিভিশনে, মঞ্চে, রেডিওতে, চলচ্চিত্রে...

ফেরদৌসী মজুমদার: চলচ্চিত্র করিনি খুব একটা। এক–দুটো করেছি। একটা করেছি ওই ‘মায়ের অধিকার’, আরেকটা ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’।

প্রশ্ন

আমি আপনার জীবনীতে পড়লাম, ‘সারেং বউ’ আর ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’—এই দুটি সিনেমার অফার আপনি পেয়েছিলেন...

ফেরদৌসী মজুমদার: ত্রপা ছোট ছিল বলে আমি করিনি। কারণ, আমার কাছে বাচ্চা–সংসার বেশি বড় আরকি।

প্রশ্ন

আপনি এত নাটকে এত চরিত্রে কাজ করেছেন। এর মধ্যে কোন কাজটা আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মানে এক নম্বরে থাকবে?

ফেরদৌসী মজুমদার: কোকিলা। কোকিলা।

প্রশ্ন

করেননি বা মিস করছেন—এমন চরিত্র কি আছে?

ফেরদৌসী মজুমদার: ওই যে ফিল্ম দুটো, হ্যাঁ, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’তে, যেটা পরে আমি ইয়ে কে দিয়েছিলাম… সাজেস্ট করেছিলাম ডলি আনোয়ার, হ্যাঁ, ডলি আনোয়ার। আমি তখন খুব একটা বুঝতামই না, লেখাপড়া আর স্টেজের নাটকই করেছি। যখন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম, উনি আমাকে বলেছিলেন যে আপনি কি ইন্টারেস্টেড আর আপনার দেশে শুনেছি আপনি খুব ইয়ে। তো আমি বলছি, এখনো ভাবছি না। …এটা আমার কাছে মনে হয়েছে যে একটা নির্বুদ্ধিতা ছিল।

প্রশ্ন

তো, এখন ৮৩ বছর ধরে এই জীবন, নাটকের জীবন—পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়া, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্থান–পতন, এত কিছুর পর আপনি আছেন, রামেন্দু মজুমদার, আমাদের দাদা আছেন, ত্রপা আছে,…সবটা মিলিয়ে জীবনটা কেমন লাগে? বাংলাদেশটাই–বা কেমন লাগে?

ফেরদৌসী মজুমদার: জীবনটা আমার চমৎকার। বাংলাদেশও চমৎকার ছিল। একটু ইয়ে হয়েছে, হয়, একরকম তো যায় না। কিন্তু আমি মনে করি, আমি অনেক পেয়েছি, আমার অনেক পাওয়া হয়েছে, না পাওয়ার সেই খেদ আমার নেই।

প্রশ্ন

আমরা শেষ করে আনব। আপনি আমাদের দর্শকদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান...

ফেরদৌসী মজুমদার: আমি এটুকু বলতে চাই যে জীবনে ধৈর্যহারা হওয়া উচিত নয়। সৎ থাকা উচিত, সুন্দরে বিশ্বাস করা উচিত, বয়োজ্যেষ্ঠদের যথার্থ সম্মান করা উচিত। এই যে এখন যে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো, ওটা কখনোই আমার কাম্য নয়। আমি চাই না। ওটা দেখলে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। কারণ, আমার বাবা বলতেন, বিদ্বান লোক যদি লম্পটও হয়, তাকে শ্রদ্ধা করবি। কাজেই এটা আমার মাথার মধ্যে খেলে সব সময়… যে যতই ইয়ে হোক, যে যত আর অতীত নিয়ে, অতীতটাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা উচিত নয়। সামনের দিকে এগোব, কষ্ট করে এগোব হয়তো, তবে আশাহত হওয়া উচিত নয়, এটাই আরকি।

প্রশ্ন

অনেক ধন্যবাদ। দর্শকমণ্ডলী, আমার মনে হয়, ফেরদৌসী মজুমদার আপার শেষ কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা তাঁর বই মনে পড়ে জেনেছি। সেখানে তিনি লিখেছেন যে তাঁর বাবা বলতেন, বিদ্বান ব্যক্তি লম্পট হলেও তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং মান্য করতে হবে। যদিও আমাদের প্রবাদে আছে যে দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য, কিন্তু এই কথা কিন্তু আসলে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যিনি বিদ্বান, তাঁর একটা মূল্য, তাঁর একটা সম্মান সমাজে দরকার এবং আপা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, শিক্ষকদের সম্মান করা। আশার কথা বলেছেন, ধৈর্যহারা না হওয়ার কথা বলেছেন—এসব নিশ্চয় আমাদের সামনের দিনের পথচলায় অনেক কাজে লাগবে। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।

ফেরদৌসী মজুমদার: ধন্যবাদ।