
২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর রাত ৯টা; ঢাকার জাপান গার্ডেন সিটির বাসিন্দারা তাঁদের আঙিনায় হঠাৎ কয়েকটি কুকুর ও একটি বিড়ালকে যন্ত্রণায় দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে দেখেন। রক্তবমি করতে করতে মানুষের চোখের সামনেই মারা যায় প্রাণীগুলো। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তিনটি কুকুর ও একটি বিড়ালের মৃতদেহ উদ্ধার করে আনে। ধারণা করা হচ্ছিল, বিষ প্রয়োগে প্রাণীগুলোকে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে বিষ প্রয়োগের আলামতও মেলে।
এ ঘটনায় একটি মামলা হয়। তাতে আসামি করা হয় জাপান গার্ডেন সিটির সেন্ট্রাল কমিটির (যাঁরা আবাসিক এলাকাটি পরিচালনা করেন) সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় নেতাকে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে কুকুর ও বিড়াল হত্যার সত্যতা পেলেও আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে সংস্থাটি। তাতে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে ২০১৯ সালে প্রাণিকল্যাণ আইন হয় বাংলাদেশে। আইনের ১১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, যদি বিষ প্রয়োগ কিংবা বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে কোনো প্রাণীকে হত্যা কিংবা অঙ্গহানি কিংবা কর্মক্ষমতা নষ্ট করা হয়, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
পুলিশের এই প্রতিবেদন দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী মো. রাকিবুল হক। তিনি প্রাণী অধিকার প্রতিষ্ঠান পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কেউ না কেউ তো এই প্রাণীগুলোকে হত্যা করেছে। তাকে বা তাঁদের বের করার দায়িত্ব তদন্ত সংস্থার।
এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন দেবেন বলে জানিয়েছেন রাকিবুল হক।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে ২০১৯ সালে প্রাণিকল্যাণ আইন হয় বাংলাদেশে। আইনের ১১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, যদি বিষ প্রয়োগে কিংবা বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে কোনো প্রাণীকে হত্যা কিংবা অঙ্গহানি কিংবা কর্মক্ষমতা নষ্ট করা হয়, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনা সমাজে থাকলেও এ বিষয়ে জনসচেতনতাও বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে পাবনার ঈশ্বরদীর একটি ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দী করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার পর ঘটনাটি আদালত পর্যন্তও গড়ায়। একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। তার ঠিক এক বছর আগে রাজধানীর জাপান গার্ডেন সিটির ঘটনা ঘটে।
স্থপতি রাকিবুল হক মামলাটি করেন প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা চারটি সংগঠনের পক্ষে। প্রাণীগুলোকে হত্যার ১৪ দিন পর ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি দণ্ডবিধির ৪২৮ বা ৫০৬ ধারায় আদাবর থানায় মামলাটি করা হয়। এর একটি ধারায় অভিযোগ ছিল প্রাণী হত্যা নিয়ে, আরেকটি প্রাণিপ্রেমীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে। ৪২৮ ধারায় পশুপাখিকে মেরে ফেলার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। ৫০৬ ধারায় কাউকে হুমকি দেওয়ার অপরাধের শাস্তিও সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড।
মামলাটিতে আসামি করা হয় ছয়জনকে। তাঁরা হলেন জাপান সিটি গার্ডেন সিটি সেন্ট্রাল কমিটির তৎকালীন সভাপতি আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ নূর ভূঁঞা, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোবারক আক্তার মো. ইয়াহিয়া খন্দকার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহ আলম ভূঁঞা ও যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক মো. কাজল আনোয়ার।
বাদীর অভিযোগ, ২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর নতুন কমিটি গঠনের পর আসামিরা আবাসিক এলাকা কুকুর-বিড়ালমুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁরা পথপ্রাণী ও পোষা প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করতেন। কখনো দারোয়ানের মাধ্যমে লাঠি দিয়ে আঘাত, আবার কখনো গরম পানি শরীরে ঢেলে তাদের অঙ্গহানিসহ কখনো কখনো মেরে ফেলারও চেষ্টা করেন।
প্রাণীগুলোকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। কেউ তো একজন করেছে? তাকে বের করার দায়িত্ব তদন্ত সংস্থার।রাকিবুল হক, মামলার বাদী
প্রাণী নির্যাতন বন্ধের প্রতিবাদ করায় ২০২৪ সালের ৩ মে জাপান গার্ডেন সিটির বাসিন্দা খন্দকার তাজরুবা হককে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও এই মামলায় অভিযোগ করা হয়। এজাহারে বলা হয়, হুমকির পর তাজরুবা হক আদাবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তাতে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা থেকে আসামিরা কয়েক দিন বিরত ছিলেন।
তবে কয়েক মাস পর আসামিরা আবার একই আচরণ শুরু করেন দাবি করে মামলায় বলা হয়, তাঁরা পরিকল্পনা করে ২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর কুকুরগুলোকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেন। ওই দিন রাত ৯টায় বিষক্রিয়ার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ১০টি কুকুর ও ১টি বিড়াল মারা যায়।
এলাকাবাসী ও প্রাণী অধিকারকর্মীরা পুলিশে খবর দিলে আদাবর থানার একজন উপপরিদর্শক ঘটনাস্থলে এসে তিনটি কুকুর ও একটি বিড়ালের মৃতদেহ উদ্ধার করেন। বাকি সাতটি কুকুরের মরদেহ আসামিরা লুকিয়ে ফেলেন বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানতে পারার কথা জানান বাদী। তিনি বলেন, প্রাণী হত্যার বিষয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসা করলে তাঁকেও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
মামলাটি তদন্তে কুকুর ও বিড়াল হত্যার সত্যতা পেলেও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি জানিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ৩০ নভেম্বর দেওয়া এই প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. এরশাদ হোসাইন ছয় আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকালে মৃত কুকুর–বিড়ালের সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ভিসেরার ফরেনসিক পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনায় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত মৃত কুকুর ও বিড়াল অর্গানো ফসফরাস যৌগ তথা কীটনাশক বিষাক্রান্ত হয়ে মারা যায় মর্মে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে তিনটি কুকুর ও একটি বিড়ালকে এই মামলার আসামিরা খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানোর বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী বা অন্য কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আসামিরা বাদী ও সাক্ষীদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ার কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণও পাওয়া যায়নি। সে জন্য আসামিদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে বাদীর করা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এ বিষয়ে কথা বলতে তদন্ত কর্মকর্তা এরশাদ হোসাইনের মুঠোফোন নম্বরে কল দিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি, খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
জাপান গার্ডেন সিটি সেন্ট্রাল কমিটির তৎকালীন সভাপতি আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ নূর ভূঁঞার মুঠোফোনে কল করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোবারক আক্তার মো. ইয়াহিয়া খন্দকার ও সংগঠনটি সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহ আলম ভূইয়া তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইয়াহিয়া খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুকুর-বিড়াল হত্যার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আসামি হিসেবে আমার নাম কেন যুক্ত করা হয়েছে, সেটাও জানি না। ঘটনার সময় আমি দেশেও ছিলাম না।’ শাহ আলম ভূইয়া বলেন, ‘আমার ওপেন হার্ট সার্জারির সময় এ ঘটনা হয়েছে। শত্রুতামূলকভাবে এ নামগুলো আসছে।’
বাদী রাকিবুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাণীগুলো বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। কেউ তো একজন করেছে? তাকে বের করার দায়িত্ব তদন্ত সংস্থার। জাপান গার্ডেন সিটি অনেকটাই রেস্ট্রিকটেড এরিয়া৷ বাইরের কোনো মানুষ এসে এটা করতে পারে বিশ্বাসযোগ্য নয়। কুকুর-বিড়াল হত্যার দায় কোনোভাবেই হাউজিং কমিটি এড়িয়ে যেতে পারেন না।’
প্রাণীগুলোকে হত্যার বিচার দাবি করে রাকিবুল হক বলেন, ‘আমরা এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দাখিল করব।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল; কিন্তু সেদিন বাদী নারাজি দাখিল করবেন বলে আদালতের কাছে সময়ের আবেদন করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হকের আদালত বাদী পক্ষের সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে ২৯ জানুয়ারি শুনানির পরবর্তী তারিখ ঠিক করে দেন।