প্রায় সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে হাম শনাক্তের পরীক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বা চাহিদা বেড়েছে
প্রায় সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে হাম শনাক্তের পরীক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বা চাহিদা বেড়েছে

আবারও দেশে হাম পরীক্ষার কিটসংকট

হাম শনাক্তের পরীক্ষা আবার সংকটে পড়েছে। কিট–স্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। সারা দেশ থেকে আসা কয়েক হাজার নমুনা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগারে জমা হয়েছে।

দেশে হাম শনাক্তের পরীক্ষা হয় শুধু জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর এই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা যায়, কিটসংকটের কারণে তারা পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দৈনিক এক শর মতো নমুনা পরীক্ষা করতে পারছি।’ এর বেশি তিনি আর কিছু বলতে চাননি।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতাল থেকে আসা প্রায় পাঁচ হাজার রোগীর নমুনা জমা হয়েছে। কিটসংকটের কারণে পরীক্ষা কম হচ্ছে। কিট আসতে আসতে সংগৃহীত নমুনার পরিমাণ আরও বাড়বে।

কিটসংকটের ব্যাপারে বক্তব্য জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। তাঁকে খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তিনি কোনো উত্তর দেননি।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতাল থেকে আসা প্রায় পাঁচ হাজার রোগীর নমুনা জমা হয়েছে। কিটসংকটের কারণে পরীক্ষা কম হচ্ছে। কিট আসতে আসতে সংগৃহীত নমুনার পরিমাণ আরও বাড়বে।

প্রায় সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে হাম শনাক্তের পরীক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বা চাহিদা বেড়েছে। হামের মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে যেসব শিশুর তাদের মা–বাবা নিশ্চিত হওয়ার জন্য হাম পরীক্ষা করাতে চান। যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তারা হামে নাকি অন্য কোনো কারণে মারা যাচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্যও এই পরীক্ষা দরকার। কোনো কোনো হাসপাতাল ছুটি দেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে চায় রোগীর হাম কি না। পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হাসপাতালে স্থায়িত্বকাল দীর্ঘ হয়।

হামের এই প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। দায়ভার তারা এড়াতে পারে না।
আবু জামিল ফয়সাল, জনস্বাস্থ্যবিদ

গত মাসে একই সমস্যায় পড়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ তথা জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। ১৯ এপ্রিল জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, হাম শনাক্তের কিট সরবরাহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সরবরাহ করা কিট ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে পাওয়া কিট এই ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার করা হয় না। একটি কিট দিয়ে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। এক দিনে ৩০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আছে।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৬০টি কিট সরবরাহ করেছিল। ৩০ এপ্রিল বা ১ মে আরও ১০০ কিট সরবরাহ করার কথা বলেছিল। কিন্তু করতে পারেনি।

গতকাল মঙ্গলবার এ ব্যাপারে যোগাযোগ করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ১০০ কিট দেড় থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে পাওয়া যাবে।

হামের মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে যেসব শিশুর তাদের মা–বাবা নিশ্চিত হওয়ার জন্য হাম পরীক্ষা করাতে চান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় দিল্লি থেকে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ৩০টি হাম শনাক্তের কিট দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এই কিট দেশে আসবে।

হাম পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন, এমন একাধিক জনস্বাস্থ্যবিদ প্রথম আলোকে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে কিট সংগ্রহে বা উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে কিট সরবরাহে আন্তরিকতার ঘাটতি আছে। এ জরুরি সময়ে দ্রুততম সময়ে কিট সংগ্রহ বা সরবরাহ করা উচিত ছিল।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ ও হামে দেশে ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৫৪ শিশু।
পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হাসপাতালে স্থায়িত্বকাল দীর্ঘ হয়

কিটের সংকট দেখা দিতে পারে, এই উপলব্ধি থেকে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠিতে তারা ৬০টি কিট চেয়েছিল। সেই কিট তারা পেয়েছিল ১৯ এপ্রিল।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামের এই প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। দায়ভার তারা এড়াতে পারে না। এমন পরিস্থিতি এড়াতে কিটের বিকল্প উৎস কী হতে পারে, তা খুঁজে বের করতে হবে।’

আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর

হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দেশে আরও ছয় শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে দুই শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। তারা ঢাকায় মারা গেছে। হামের উপসর্গ ছিল চার শিশুর। তাদের মধ্যে খুলনা ও রাজশাহীতে একজন করে এবং সিলেটে দুজন মারা গেছে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ ও হামে দেশে ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হলো। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৫৪ শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৯ হাজার ৮৩১ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু।