
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় স্থানীয় এক সাংবাদিককে মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে। গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ইউএনওর ব্যবহৃত মুঠোফোন থেকে এই হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জেলায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
যে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তিনি দৈনিক সংবাদ ও ডেইলি অবজারভারের কেন্দুয়া উপজেলা প্রতিনিধি হুমায়ূন কবীর। তিনি কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সদস্য।
হুমায়ূন কবীর জানান, গত শনিবার ভোরে উপজেলার বলাইশিমুল খেলার মাঠের জায়গায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য নির্মাণাধীন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ওই দিন বিকেলে ইউএনও উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে ইউএনওর ১১ মিনিট ২৮ সেকেন্ডের বক্তব্য হুমায়ূন কবীর ভিডিও ধারণ করেন। পরে তিনি সেই ভিডিও নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন। সন্ধ্যায় হুমায়ূন কবীর প্রেসক্লাবে বসা ছিলেন। এ সময় ইউএনও তাঁর কাছে ফোন করে জানতে চান, সংবাদ সম্মেলনে তাঁর (ইউএনও) দেওয়া বক্তব্য কেন ফেসবুকে দিয়েছেন। উপহারের ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় যে মামলা হবে, সেই মামলায় হুমায়ূনকে আসামি করার হুমকি দেন তিনি। ইউএনও ও হুমায়ূনের কথোপকথনের ১ মিনিট ২ সেকেন্ডের বক্তব্যটি গতকাল রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘ইউএনও মহোদয় রাগতস্বরে আমাকে বলেন, “আপনাকে কি ফেসবুকে ছাড়ার জন্য আমি বক্তব্য দিছি? আমি প্রেস ব্রিফিং যা দিছি, সেটা দিয়া নিউজ করবেন।” তখন আমি বলি, আমি সাংবাদিক হিসেবে কি ফেসবুকে দিতে পারি না? উত্তরে তিনি বলেন, “আপনি যদি বিরোধিতা করেন, তবে আমি আপনাকে আজকের মামলায় ঢোকাতে বাধ্য হব।’”
জানতে চাইলে ইউএনও মাহমুদা বেগম বলেন, ‘সাংবাদিক হুমায়ূন প্রথম থেকেই অ্যাজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। নানা সময়ে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এসব স্ট্যাটাসের কমেন্টে অশালীন কথাবার্তা লেখা হয়েছে। কোনো ব্যবস্থা নিইনি। আগেই তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা উচিত ছিল। সাংবাদিকদের সাথে নানা সময়ে নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয়। তিনি সেগুলোও ফেসবুকে প্রচার করে দেন।’
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি শুনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগতসহ ইউএনওকে সতর্ক করা হয়েছে। তাঁর এ ধরনের কথাবার্তা বলা উচিত হয়নি।’
স্থানীয় বাসিন্দা, ইউএনওর কার্যালয় ও থানা–পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বলাইশিমুল গ্রামের ১ একর ৮৭ শতক সরকারি জায়গায় শত বছরের পুরোনো খেলার মাঠ রয়েছে। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২–এর আওতায় ওই মাঠের পাশে প্রশাসন ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য ২৩টি ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এর জন্য মাঠের ৪৬ শতক জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করে ‘কান্দা’ করা হয়। কিন্তু স্থানীয় ব্যক্তিরা শুরু থেকেই মাঠ রক্ষায় মানববন্ধন, মিছিল করে আসছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় হাবিবুর রহমান মণ্ডলসহ আটজন বাদী হয়ে গত ৩০ মে আদালতে একটি মামলা করেন। এরপর গত ২ জুন রাতের আঁধারে দুটি নির্মাণাধীন ঘরের গাঁথুনি ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরের দিন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এরপর ওই স্থানে পুলিশ পাহারায় ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার মো. শফিকুর রেজা বিশ্বাস, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশসহ ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখান থেকে ১১টি ঘরের নির্মাণকাজ বাতিল করেন। ১২টি নির্মাণাধীন ঘরের মধ্যে আবারও দৃর্বৃত্তরা দুটি ঘরে আগুন দেয়। পরদিন ঘটনায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেশকাতুল বাদী হয়ে ৬৩ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। আগুন দেওয়ার ঘটনা নিয়ে ইউএনও প্রেস ব্রিফিং করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ইউএনও অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বামদল সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করছে। আমরা প্রশাসন সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরেছি। আর নয়। যত আইন, যা যা প্রয়োগ করা দরকার, তা–ই করব। দরকার হলে পুরো বলাইশিমুল ইউনিয়নের মানুষকে গ্রেপ্তার করব। ইউনিয়নের সবার বিরুদ্ধে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হবে।’
বলাইশিমুল মাঠ রক্ষা গণকমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শত বছরের মাঠ রক্ষায় আমরা শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছি। আমরা কেউ আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে নই। এলাকায় অনেক সরকারি জায়গা আছে, সেখানেও ঘর করা যেত। আমরা আন্দোলন করায় একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’
এর আগে গত জুলাইয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নে নিচু জমিতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় কক্সবাজারের এক সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কায়সার খসরু। পরে তাঁকে প্রত্যাহার করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা জানান, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বলাইশিমুল মৌজায় খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণকাজের ওপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আজ রোববার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। আদেশ বাস্তবায়ন বিষয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসককে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ওই খেলার মাঠে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ওই রিটটি করে। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দ কুমার রায়।
রুলে ওই খেলার মাঠের শ্রেণি পরিবর্তন কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং ঐতিহাসিক বলাইশিমুল মাঠটি মাঠ হিসেবে সংরক্ষণ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। ভূমিসচিব, পরিবেশসচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রকল্প পরিচালক (আশ্রয়ণ-২), নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।