
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে যথেষ্ট স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া এই মুহূর্তে টাকার অবমূল্যায়নের কোনো তাৎক্ষণিক চাপ নেই। এক পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তারল্য বৃদ্ধি ও শক্তিশালী রিজার্ভ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যা ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, তা এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ৬ এপ্রিল তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে ব্যাংকগুলোতে নগদ বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি ৪৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৯ মিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক মাসে বাজার থেকে কোনো ডলার কেনা হয়নি বলে জানিয়েছে। বাজার থেকে ডলার কেনা হলে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাত বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। গত মার্চে দেশে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা রেকর্ড। এর আগে কখনো একক মাসে এত প্রবাসী আয় আসেনি। এ ছাড়া চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ৬ দিনেই ৬৬০ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী প্রবাহ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, স্বাভাবিক আমদানি ও ঋণ পরিশোধ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক দায় পরিশোধের পরেও রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। গত মাসে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের আকু বিল এবং প্রায় ১৮ কোটি ডলারের সরকারি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রক্রিয়া বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও স্বাভাবিক ধারায় চলছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বর্তমানে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। পাশাপাশি বাজারে আস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় আছে। ডলারের মূল্যমান বর্তমানে স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার মাধ্যমেই নির্ধারিত হচ্ছে। সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে যেকোনো সময়ের তুলনায় সংহত অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি না বাড়লেও আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। কারণ, তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। দাম বাড়বে এই আশায় বিদেশি রেমিট্যান্স হাউসগুলো ডলার ধরে রাখছে। দেশের অনেক ব্যাংক বেশি দামে কিনেছে বলে শুনেছি। অনেক ব্যাংক ডলার মজুত করেছে। এতে আমদানিতেও ডলারের দাম বেড়ে গেছে।’
বাজার পরিস্থিতি ভিন্ন
ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে প্রতি ডলারের দাম এক টাকা বেড়েছে। এক মাস আগে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের কাছে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দামে ডলার বিক্রি করত। গত মঙ্গলবার তা ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় ওঠে। তবে আজ আবার দাম কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো।
এদিকে রেমিট্যান্স হাউসগুলোর সূত্রে জানা গেছে, এক মাস প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা ছিল। গতকাল মঙ্গলবার তা ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় উঠে যায়। তবে আজ দাম কিছুটা কমিয়েছে।
ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা যায়, সামনে ডলারের দাম আরও বাড়তে পারে, এর আশঙ্কায় অনেক ব্যাংক ডলার মজুত করছে। মূলত উচ্চ মুনাফার জন্য তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতেই বেড়ে গেছে ডলারের দাম।
ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহসান জামান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেলের দামের সঙ্গে ডলারের দাম ওঠানামা করে। আমরা ডলার আয় করি। এই ডলার বিদেশ থেকে আসে। তাই বেশি দামে আনতে হলে দামও বেড়ে যায়। তবে এবার যে অবস্থা, তাতে বাড়লেও খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। এখন ভালো প্রবাসী আয় আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ডলারের দাম সমন্বয় হয়ে যাবে।’