ওয়েবসাইট থেকে বাজেট বক্তৃতা ডাউনলোড করে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন নীলফামারীর জ্যাকপট ক্যাশু নাট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইবনুল আরিফুজ্জামান। পিডিএফে ২৪০ পৃষ্ঠার নথিতে ‘কাজুবাদাম’ লিখে সার্চ দিতেই চলে এলেন ২০৯ নম্বর পাতায়।
চোখে পড়ল একটি সুখবর—বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদামের ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ৭ ডলার নির্ধারণ করেছে সরকার। এত দিন ৪ থেকে ৬ ডলার দেখিয়ে আমদানির সুযোগ ছিল। ফলে বাজেটের নতুন পদক্ষেপে মূল্য কারসাজি কঠিন হবে। কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উদ্যোক্তা হিসেবে বিষয়টি তাঁকে আশাবাদী করে তোলে।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই আশাবাদ উবে যায়। বাজেটের আরেক পৃষ্ঠায় গিয়ে তিনি দেখেন, কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তুলে নেওয়া হয়েছে ভ্যাট অব্যাহতি। তাতেই বদলে যায় তাঁর অনুভূতি।
নীলফামারী থেকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে ইবনুল আরিফুজ্জামান বলেন, বাজেটে একদিকে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মূল্য কারসাজি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি ভালো; অন্যদিকে যেসব কারখানা কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করে, তাদের জন্য শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। দেশে চাহিদা অনুযায়ী কাজুবাদাম উৎপাদিত হয় না। তাই শুল্ক–কর বৃদ্ধির ফলে বিদেশ থেকে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি কঠিন হয়ে গেল।
মন খারাপ যেখানে
আগে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক–কর ছিল ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, এবারের বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম আমদানিতে আগে শুল্ক–কর ছিল ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, এখন বেড়ে হয়েছে ৭০ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে ভারত থেকে খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক–কর দিতে হয় কম, ৪৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, নতুন শুল্ককাঠামোর ফলে এক কেজি খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির খরচই দাঁড়াবে প্রস্তুত কাজুবাদাম আমদানির চেয়ে বেশি।
ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ৭ ডলার করায় খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য কারসাজি কমবে, এটা ইতিবাচক। কিন্তু কাঁচামালের শুল্ক ১৫ শতাংশ করায় প্রক্রিয়াজাত শিল্প নতুন করে চাপে পড়বে।মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান, কাজুবাদাম শিল্পের উদ্যোক্তা
বর্তমানে প্রায় পাঁচ কেজি কাঁচা কাজুবাদাম থেকে এক কেজি খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম পাওয়া যায়। নতুন শুল্কহারে ওই কাঁচামাল আমদানিতে শুধু শুল্ক–করই দিতে হবে প্রায় ৪৭৩ টাকা। আমদানি মূল্য যোগ করলে বন্দর থেকে খালাসের পর খরচ দাঁড়াবে প্রায় দেড় হাজার টাকা। তার বিপরীতে ভারত থেকে প্রস্তুত কাজুবাদাম আমদানি করলে খরচ পড়বে প্রায় ১ হাজার ২৬২ টাকা এবং ভিয়েতনাম থেকে আনলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ভারত থেকে আমদানিতে শুল্ক কম হওয়ার কারণ দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) সুবিধা। এই সুবিধার কারণে কাস্টমস শুল্ক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও ভারতের ক্ষেত্রে তা কার্যত ৩ শতাংশে নেমে আসে।
তবে সরকারের যুক্তি হলো, দেশীয় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে শুল্ক বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশীয় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের উৎসাহিত করতেই অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ ও ৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি। তবে দেশে উৎপাদিত কাজুবাদাম স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি সক্ষম নয় বিধায় অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম কাঁচামাল হিসেবে আমদানিতে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ প্রস্তাব করছি।’
ভারত থেকেই আসে অর্ধেকের বেশি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৩১ হাজার কেজি এসেছে ভারত থেকে। অর্থাৎ মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি এসেছে ভারত থেকে। ফলে সাফটা সুবিধার কারণে ভারতীয় কাজুবাদাম বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বাড়ছে কারখানা
দেশে কাজুবাদামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে প্রায় ২০টি ছোট-বড় প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান হয়েছে পাঁচ হাজার মানুষের। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন দিয়ে বছরে দুই থেকে তিন মাসের বেশি কারখানা চালানো সম্ভব হয় না। বাকি সময় কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করেই উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হয়, যা বাজেটের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক কাঠামোতে কঠিন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাশু প্রসেসরসের (প্রস্তাবিত) সভাপতি মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান প্রথম আলোকে বলেন, ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ৭ ডলার করায় খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য কারসাজি কমবে, এটা ইতিবাচক। কিন্তু কাঁচামালের শুল্ক ১৫ শতাংশ করায় প্রক্রিয়াজাত শিল্প নতুন করে চাপে পড়বে। দেশীয় উৎপাদন এখনো এতটা নয় যে শুধু স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে কারখানা চালানো যাবে।
যে কারণে কাঁচামাল গুরুত্বপূর্ণ
কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত করা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমঘন একটি কাজ। খোসাসহ কাঁচা বাদাম সংগ্রহের পর তা বাষ্পে সেদ্ধ, শুকানো, খোসা ছাড়ানো, রাসায়নিক উপাদান অপসারণসহ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রায় পাঁচ কেজি কাঁচা কাজুবাদাম থেকে এক কেজি খাওয়ার উপযোগী কাজুবাদাম পাওয়া যায়।
উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। তবে উৎপাদন ঘাটতি থাকা অবস্থায় কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে নতুন গড়ে ওঠা প্রক্রিয়াজাত শিল্পগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। এতে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।