সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিন আজ রোববার ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিন আজ রোববার ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

‘সংস্কার’ শব্দটি যেন দেশে একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, প্রকৃত সংস্কারের জন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। কিন্তু ‘সংস্কার’ শব্দটি যেন দেশে একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অর্থ না থাকলে দক্ষতা দিয়ে চাহিদা পূরণ করতে হবে। আর সে জন্যই দরকার সংস্কারের।

তিন দিনব্যাপী নবম সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিন আজ রোববার ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন। এতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ছিলেন বিশেষ অতিথি। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তিত বিশ্বে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং নীতিগত পদক্ষেপ’।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ছিলেন নির্ধারিত আলোচক।

দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করা তা বাস্তবায়নের চেয়ে সহজ। আসল চ্যালেঞ্জ তা বাস্তবায়ন করা। তবে দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সমন্বয়ের অভাব, গোষ্ঠী স্বার্থ ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে অনেক ভালো সংস্কার উদ্যোগও ব্যর্থ হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে সংস্কারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—এমন মন্তব্য করে দেবপ্রিয় কয়েকটি উদাহরণ দেন। এগুলো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন, বেসরকারীকরণ, ভ্যাট চালু, বিনিময় হারের পরিবর্তন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি, ডিজিটালাইজেশন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চালু করা ইত্যাদি। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে সংস্কারের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়েছে। কারণ হচ্ছে লুণ্ঠনমূলক উত্তরাধিকার, যার মধ্যে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও অভিজাত ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বৈষম্য বা দুর্নীতির ফলে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া নেতৃত্ব ও জনমতের ওপর ভিত্তি করে রূপ পায়। তবে অনেক সংস্কারের উদ্যোগ জোরালোভাবে শুরু হলেও পরে তা দিক হারিয়ে ফেলে।

ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকারকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী করতে হবে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে, ভর্তুকি যৌক্তিক করতে এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

সাম্প্রতিক সংস্কারবিষয়ক আলোচনায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনে রাজনীতিকরণ ইত্যাদি বিষয় সামনে রাখেন। অন্তর্বর্তী সরকারকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা নির্বাচিত সরকার ছিল না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের সক্ষমতার ঘাটতি ছিল, আর ছিল সমন্বয়ের অভাব। তাদের স্পষ্ট কোনো অর্থনৈতিক ভিশনও ছিল না।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাস হওয়া ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ হয়। তার অধীনে হয় পাঁচ ইসলামি ব্যাংককে নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিএনপি সরকার যে আইন করেছে, তাতে এ পাঁচ ব্যাংকের আগের মালিকপক্ষের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ সুযোগ ‘অলিগার্কির’ প্রভাবের প্রতিফলন। কেন এমন সুযোগ তৈরি করা হলো, তা নিয়ে একটা রাজনৈতিক বিবৃতি বা ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার ছিল সরকারের।