বিদ্যুৎ–সংকটে কারখানা পুরোপুরি সক্ষমতা অনুযায়ী চালানো যাচ্ছে না। এ জন্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি।

রড ও সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালের দাম বিশ্ববাজারে কিছুটা কমে স্থিতিশীল হয়েছে। জাহাজভাড়াও কমেছে। তবে দাম কমার এমন সুখবরেও খুব বেশি স্বস্তি মিলছে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, দাম কিছুটা কমলেও দেশে নানা সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে দাম কমার পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
চলতি মাস থেকে নির্মাণ মৌসুম শুরু হয়েছে। এ সময়ে (অক্টোবর–এপ্রিল) সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে নির্মাণ উপকরণ—রড ও সিমেন্টের। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে দুই খাতের উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানি বাড়িয়েছেন। তবে তাঁরা বলছেন, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় চাহিদা কিছুটা বাড়লেও গত বছরের তুলনায় কম।
দুই খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বিদ্যুৎ–সংকটে কারখানা পুরোপুরি সক্ষমতা অনুযায়ী চালানো যাচ্ছে না। আবার গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফার্নেস তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা না গেলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বাড়তি উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। আবার আমদানি বাড়লেও উদ্যোক্তাদের সামনে নতুন শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এটি হলো, ডলার–সংকটে ঋণপত্র খুলতে বিলম্ব। এখন যেসব পণ্য আসছে, তা দুই–আড়াই মাস আগে আমদানি করা কাঁচামাল। এখন ঋণপত্র খুলতে সমস্যা অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব পড়বে দুই–আড়াই মাস পর নির্মাণের ভরা মৌসুমে।
রড ও সিমেন্ট উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মো. সরওয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম কমায় দেশেও রড ও সিমেন্টের দাম কিছুটা কমেছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি ৭ হাজার টাকা কমে ৮২ থেকে ৮৭ হাজার টাকায় রড বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেশি পড়ছে। আবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটে কারখানা পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী চালাতে না পারায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ না বাড়লে ও ডলারের বিনিময়মূল্য সহনীয় থাকলে বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যেত।
করোনা কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার শুরুর সময় ২০২০ সালের শেষ দিকে বাড়তে থাকে কাঁচামালের দাম। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর তা রেকর্ড ছাড়ায়। এখন আবার গত বছরের কাছাকাছি দামে ফিরেছে রড ও সিমেন্টের কাঁচামালের দাম।
রড তৈরির কাঁচামালের কথাই ধরা যাক। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রড তৈরিতে ব্যবহৃত গলনশীল ভারী লোহার টুকরা (এইচএমএস) টনপ্রতি ৬০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য জুনের শেষ দিকে দাম কমতে থাকে। গতকাল সোমবার বিশ্ববাজারে ৪৫০–৪৭০ ডলারে বেচাকেনা হয়েছে পুরোনো লোহার টুকরা। এই দামে পণ্য আসবে সামনের মাসগুলোতে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, গত চার বছরের মধ্যে এবার পুরোনো লোহার টুকরা আমদানি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সাড়ে তিন মাসে পুরোনো লোহার টুকরা আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৪২ হাজার টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১৩ লাখ ৪১ হাজার টন। আমদানি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আবার টনপ্রতি গড় আমদানি মূল্য গত অর্থবছরে ছিল ৫১০ ডলার। এখন তা কমে হয়েছে ৫০৩ ডলার।
রডের মতো সিমেন্টশিল্পের প্রধান কাঁচামালের দামও কমেছে। কাঁচামালের দাম কমার পাশাপাশি আমদানিও বেড়েছে। একটানা আট বছর প্রবৃদ্ধির পর গত অর্থবছরে আমদানি অস্বাভাবিক কমে যায় সিমেন্টশিল্পে। নতুন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে খাতটি।
সিমেন্ট তৈরিতে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ। এই পাঁচটির মধ্যে প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে ক্লিংকার আমদানি হয় ৬২ লাখ ৬৫ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৩ লাখ ৩৭ হাজার টন।
কাঁচামালের পাশাপাশি আমদানি মূল্যও কিছুটা কমেছে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর ক্লিংকারের আমদানি মূল্য উঠেছিল টনপ্রতি ৬৯ ডলারে। সেখান থেকে কমে চলতি অর্থবছরের সাড়ে তিন মাসে গড় আমদানি মূল্য পড়ছে ৬১ ডলার। বিশ্ববাজার থেকে এখন টনপ্রতি ক্লিংকার আমদানিতে খরচ পড়বে ৫৬–৫৮ ডলার। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৩ ডলার।
দাম কিছুটা কমলেও রডের মতো সিমেন্টেও সুখবর নেই বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। জানতে চাইলে সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সহসভাপতি জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর টনপ্রতি ক্লিংকারের গড় দর ছিল ৬৮ ডলার। ডলারের বিনিময়মূল্য ৮৭ টাকা ধরে খরচ হতো ৫ হাজার ৯১৬ টাকা। এখন বিশ্ববাজারে ১০ ডলার কমে ক্লিংকার বিক্রি হচ্ছে ৫৮ ডলারে। ডলারের বিনিময়মূল্য ১০৫ টাকা ধরে খরচ হচ্ছে ৬ হাজার ৯০ টাকা। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।