চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দর

মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি অর্ধেকে নামল, গন্তব্যে পৌঁছেনি অনেক চালান

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সমুদ্রপথে পাঠানো চালান আটকে আছে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে।

ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। আবার যেসব পণ্য সমুদ্রপথে কনটেইনারে রপ্তানি হয়েছে, তার বড় অংশ এখনো ক্রেতার হাতে পৌঁছায়নি। এসব চালানের বেশ কিছু সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে আটকে আছে।

তবে যুদ্ধের মধ্যেও উড়োজাহাজে পাঠানো চালান নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছেছে। সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আকাশপথে রপ্তানি বেড়েছে। গত মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে মোট রপ্তানির ৩১ শতাংশ গেছে আকাশপথে। মূলত সবজি ও তৈরি পোশাকের মতো হালকা পণ্য আকাশপথে রপ্তানি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রপ্তানিকারকদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে ২ হাজার ৬২২টি চালানে ২ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৫ হাজার ৪৩৯টি চালানে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। মার্চে যেসব চালানের পূর্ণ রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

* গত মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে মোট রপ্তানির ৩১ শতাংশ গেছে আকাশপথে। * গত মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ২ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। * ২০২৫ সালের মার্চে রপ্তানি হয়েছিল ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিও ঝুঁকিতে পড়ে। এই পথ দিয়ে গত এক মাসে বাংলাদেশের কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি, আমদানিও হয়নি। যুদ্ধের কারণে এখন সীমিত আকারে উড়োজাহাজে শুধু সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়া লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবে অল্প পরিসরে সমুদ্রপথে রপ্তানি চালু আছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৭৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধপ্রবণ অঞ্চলেই গেছে ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। এ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলক কম হলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বেশি।

চট্টগ্রাম ছেড়েছে, পৌঁছায়নি গন্তব্যে

চট্টগ্রামের প্যাসিফিক সি ফুডস যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবে দুই কনটেইনার মাছ রপ্তানি করে। মার্চের শুরুতে চালান দুটি চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়ে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটি এখনো ক্রেতার হাতে পৌঁছেনি।

কার্যাদেশ থাকলেও এখন কনটেইনারে সবজি পাঠানো যাচ্ছে না। আবার উড়োজাহাজে সীমিত আকারে সৌদি আরব, আমিরাত ও ওমানে রপ্তানি করা যাচ্ছে। বাহরাইন ও কাতারে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না
—ফারুক আহমেদ, কর্ণধার, ইন্ডিগো করপোরেশন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দোদুল কুমার দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, একটি চালান ওমানে নামানো হয়েছিল। পরে সড়কপথে সৌদি আরবে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় আবার সেটি সিঙ্গাপুরে ফেরত আনা হয়। আরেকটি চালান সিঙ্গাপুরেই আটকে আছে।

শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া অনেক চালানই এখন ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে আটকে আছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, পোশাক, জুতা ইত্যাদি।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে মোট রপ্তানির ৬৯ শতাংশই গেছে সমুদ্রপথে।

শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধাবস্থার কারণে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই এখন মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার নিচ্ছে না। ফলে চাইলেও সমুদ্রপথে রপ্তানির সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত আকারে লোহিত সাগর হয়ে পণ্য পাঠানো হলেও সেখানেও নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে।

আকাশপথে বেড়েছে রপ্তানির হিস্যা

সমুদ্রপথে রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে এখন আকাশপথে রপ্তানির অংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে আকাশপথে রপ্তানির হিস্যা ছিল ২২ শতাংশ। এবার তা বেড়ে ৩১ শতাংশে উঠেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৭৩২টি চালানে ৮০ লাখ ডলারের পণ্য উড়োজাহাজে রপ্তানি হয়েছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর আকাশপথেও গুটিকয়েক দেশে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। ফ্লাইট চলাচল সীমিত থাকায় এই পথেও রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশি সবজি রপ্তানি করে ইন্ডিগো করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কার্যাদেশ থাকলেও এখন কনটেইনারে সবজি পাঠানো যাচ্ছে না। আবার উড়োজাহাজে সীমিত আকারে সৌদি আরব, আমিরাত ও ওমানে রপ্তানি করা যাচ্ছে। বাহরাইন ও কাতারে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। এ ছাড়া আকাশপথে কেজিপ্রতি ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ সেন্ট বেড়েছে।

বাজার ছোট, অনিশ্চয়তা বেশি

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ছোট হলেও প্রবাসীকেন্দ্রিক চাহিদাকে সামনে রেখে সেখানে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখন নতুন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্লাস্টিকজাত পণ্যের কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অন্য দেশে রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আকাশপথের পাশাপাশি বিকল্প সমুদ্র বা স্থলপথে রপ্তানি ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।