
দেশীয় সুতাকলের সুরক্ষায় ভারত থেকে সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপের বিষয়ে বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকেরা মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। ফলে পার্শ্ববর্তী দেশটি থেকে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়ায় শুরুতেই একধরনের ধাক্কা লেগেছে।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর নেতারা বলছেন, সরকার থেকে প্রণোদনা পাওয়ায় ভারতের স্পিনিং মিলগুলো (সুতার কল) বাংলাদেশে সস্তায় সুতা রপ্তানি করছে। এতে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর বিক্রি কমছে। বন্ধ হচ্ছে মিল। অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা বলছেন, ভারতীয় সুতায় বিধিনিষেধ দিলে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে।
ভারত থেকে আমদানি হওয়া সুতা ব্যবহার করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প। ৩০ কার্ডের এক কেজি সুতা বাংলাদেশি মিলগুলো বিক্রি করে প্রায় ৩ মার্কিন ডলারে, যা ভারতীয় উৎপাদকেরা বিক্রি করে ২ ডলার ৬০ সেন্টে। মূলত কম দামের কারণেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ভারতের সুতা আমদানি করেন।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ গত মাসে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ভারত থেকে কম দামে প্রচুর পরিমাণে সুতা আমদানি হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো সংকটে পড়েছে। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। সেদিন স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচাতে সেফগার্ড শুল্ক আরোপ, ১০ শতাংশ নগদ সহায়তাসহ আরও কিছু সহায়তা চান।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেশীয় শিল্পকে বাঁচানোর বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। স্পিনিং মিল বন্ধ হলে পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য সরকারকে নীতি সহায়তা দিতে হবে।’
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। গত এপ্রিলে ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। এখন শুধু সমুদ্রপথে সুতা আনা যায়। বাংলাদেশের নেওয়া পদক্ষেপের পর স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ দেয় ভারত।
জানা যায়, ভারত থেকে শতভাগ কটন সুতা ও ১০-৩০ কাউন্টের ব্লেন্ডেড সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ অথবা বন্ডের মাধ্যমে সুতা আনা বন্ধের দাবি করে গত ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে একটি চিঠি দেয় বিটিএমএ। তার পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন ৫ জানুয়ারি বিটিএমএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরদিন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আপত্তি জানিয়ে কমিশনকে চিঠি দেয়। তাদের বাদ দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে অভিযোগ করেন সংগঠন দুটির সভাপতি। তারপর সব পক্ষকে নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার কমিশনের কার্যালয়ে সভা হয়।
বন্ডের আওতায় আনা পণ্য বা কাঁচামালের ওপর এই শুল্ক প্রযোজ্য হয় না। কিছু করলে আইন মেনে করতে হবে, না হলে মুশকিলে পড়তে হবে। তা ছাড়া পাঁচ মাস ধরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়—এমন কিছু করা উচিত হবে না। ফলে চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নেওয়া উচিতমোস্তফা আবিদ খান, সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন
গতকালের সভায় বিটিএমএর সহসভাপতি শামীম ইসলামসহ অন্য নেতারা নিজেদের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তবে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানসহ সংগঠন দুটির নেতারা বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। তবে ট্যারিফ কমিশন বিষয়টি নিয়ে একটি সমীক্ষা করবে বলে জানায়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) আবদুল গফুর।
জানতে চাইলে বিটিএমএর সহসভাপতি শামীম ইসলাম ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় ট্যারিফ কমিশন গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে অনুরোধ করেছে। তাই তাঁরা কোনো মন্তব্য করবেন না।
বিটিএমএ ও বিকেএমইএর দুজন নেতা জানান, গত মাসে বিটিএমএর একজন সাবেক সভাপতির বাসায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা ভারতীয় সুতা আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপে সরকারের কাছে দাবি উত্থাপনে সমঝোতায় পৌঁছান। তখন সমঝোতা হয় ১০-২৮ কাউন্টের সুতায় সেফগার্ড শুল্ক চাওয়া হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বিটিএমএ ১০-৩০ কাউন্টের সুতায় সেফগার্ড শুল্ক দাবি করে। পোশাকশিল্পে ২৯-৩০ কাউন্টের সুতাই বেশি লাগে। তারপরই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা বিপরীতমুখী অবস্থান নেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেন, কোনো পণ্যে কোনো একক দেশের ওপর সেফগার্ড শুল্ক আরোপ করা যায় না। করলে সব দেশের ওপরই করতে হবে। তা ছাড়া বন্ডের আওতায় আনা পণ্য বা কাঁচামালের ওপর এই শুল্ক প্রযোজ্য হয় না। কিছু করলে আইন মেনে করতে হবে, না হলে মুশকিলে পড়তে হবে। তা ছাড়া পাঁচ মাস ধরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমছে। এমন পরিস্থিতি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় এমন কিছু করা উচিত হবে না। ফলে চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।