
লন্ডনের আর্থিক মহলে হঠাৎই আলোড়ন তৈরি হয়েছে। মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস (এমএফএস) নামের এক কোম্পানিকে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে আনা হয়েছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে শতকোটি পাউন্ডের আর্থিক ঘাটতি ও জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এমএফএস বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পত্তি কেনায় বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো একই সম্পদের বিপরীতে একাধিকবার ঋণ নেওয়া হয়েছে। এমন অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এই সংকট কেবল প্রতিষ্ঠানের পতনের গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাত, ঋণের বেসরকারি বাজার ও বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনিয়োগ। ফলে ঘটনাটি এখন আর্থিক অনিয়ম, নিয়ন্ত্রণকাঠামো ও বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় বিতর্কে রূপ নিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে গেছে এমএফএস। এটি একধরনের ছায়া ব্যাংক। ব্লুমবার্গের হাতে আসা আদালতের নথিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিপত্রে ৯৩০ মিলিয়ন বা ৯৩ কোটি পাউন্ডের ঘাটতি আছে।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। বিষয়টি হলো, এমএফএস বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পত্তি কেনায় বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। সাইফুজ্জামানের সাম্রাজ্য এখন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির তদন্তাধীন। তবে কর্তৃপক্ষ এখনো এমএফএসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনেনি। এমএফএসের প্রতিষ্ঠাতা পরেশ রাজা। ৫৮ বছর বয়সী এই রাজা ২০০৬ সালে স্ত্রী টিবার সঙ্গে এমএফএস প্রতিষ্ঠা করেন। কোম্পানিটি ‘জটিল, সম্পত্তিভিত্তিক ঋণ’ দিত। তাদের প্রধান পণ্যের মধ্যে ছিল বাই-টু-লেট মর্টগেজ ও ব্রিজিং লোন, অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যে ঋণ বিভিন্ন ধরনের বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগে করা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছিল, যাঁরা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত নন বা সমস্যায় পড়েছেন, রাজা এমন বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
গণমাধ্যম এশিয়ান ভয়েসকে রাজা বলেন, ‘মূল ধারার ব্যাংকগুলো যাদের ফিরিয়ে দেয়, আমরা তেমন ঋণগ্রহীতাদের সহায়তা করি। যাঁদের পেমেন্ট রেকর্ডে ঘাটতি আছে, যারা বিদেশে অবস্থান করছেন বা অপ্রচলিত সম্পদে বিনিয়োগ করতে চান, তাঁদের কথাও আমরা শুনতে আগ্রহী।’
এমএফএসের উত্থানকালে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ বছরে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্যে সম্পত্তির বড় পোর্টফোলিও গড়ে তোলে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিমন্ত্রী হওয়ার পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলো এমএফএস-সম্পৃক্ত ঋণদাতাদের কাছ থেকে শত শত সুরক্ষিত ঋণ নেয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এমএফএস-সম্পৃক্ত প্রায় সব বন্ধকি ঋণ পরিশোধ করা হয় বলে ধারণা করা হয়।
তবে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সাম্রাজ্য এখন যুক্তরাজ্যে এনসিএর তদন্তাধীন। ২০২৫ সালের জুন মাসে সংস্থাটি সাবেক মন্ত্রীর ১৭ কোটি পাউন্ড মূল্যের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পত্তি জব্দ করে। কর্তৃপক্ষ রাজা বা এমএফএসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি।
রাজার আইনজীবীরা বলেন, এমএফএসের বড় একটি আন্ডাররাইটিং বা অবলিখন দল রয়েছে। এই দল প্রতিটি ঋণ খতিয়ে দেখে এবং মানি লন্ডারিংবিরোধী ও অন্যান্য যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। আইনজীবীরা বলেন, রাজার সঙ্গে বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা সরকারের সম্পর্ক নেই।
মূলধারার ব্যাংকের তুলনায় এমএফএসের কাঠামো ভিন্ন। এটি শ্যাডো ব্যাংক, অর্থাৎ ঋণ দিত, কিন্তু আমানত গ্রহণ করত না। প্রচলিত ব্যাংকের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে না এসব ব্যাংক।
ধসের আগপর্যন্ত এই ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছিল। গত মার্চ পর্যন্ত তারা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি পাউন্ড মূলধন সংগ্রহের কথা জানায়। সেই সঙ্গে দাবি করে, তাদের ঋণের পোর্টফোলিও প্রায় ২৫০ কোটি পাউন্ড। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে যাওয়ার মাত্র ১১ মাস আগে রাজা বলেন, ২০২৬ সালে তাঁদের ঋণের পোর্টফোলিও ৩৫০ কোটি পাউন্ডে উন্নীত হবে।
এমএফএসের বিরুদ্ধে অর্থ ব্যবস্থাপনায় ‘গুরুতর অনিয়মের’ অভিযোগ তোলা হয়। এরপর চলতি সপ্তাহে আলিক্স পার্টনার্সের দেউলিয়া ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, এমএফএস একই সম্পদের বিপরীতে একাধিকবার ঋণ দিয়েছে বলে অভিযোগ করে অ্যাম্বার ও জিরকন ব্রিজিং। ফলে তাদের ১২০ কোটি পাউন্ড ঋণের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি হিসাববহির্ভূত ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
কোম্পানিটিকে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে নেওয়ার আবেদন অনুমোদন করে বিচারক ব্রিগস বলেন, ‘জালিয়াতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।’ আদালতের আদেশ মানতে রাজা ব্যর্থ হয়েছেন। ঋণদাতাদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত সম্পদ সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আদালতে রাজা বলেন, এমএফএসের মূল ব্যবসার ব্যর্থতা বা তাদের সম্পদের মান খারাপ—বিষয়টি সে রকম নয়। বরং কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সাময়িকভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিশ্লেষকেরা বড় ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। স্যানট্যান্ডার, ওয়েলস ফার্গো, জেফারিজ, বার্কলেজসহ কয়েকটি বড় ব্যাংক এমএফএসের ঋণের জোগান দিয়েছে বলে জানা যায়। বার্কলেজের প্রায় ৬০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে আছে। তারা সম্প্রতি এমএফএসের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে।
জেফারিজের প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড ও অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের স্ট্রাকচার্ড-ক্রেডিট শাখা অ্যাটলাসের ৪০ কোটি পাউন্ড ঝুঁকিতে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমএফএস প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে যাওয়ার পর জেফারিজের শেয়ারের দাম প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, বার্কলেজের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও অ্যাপোলোর শেয়ারের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
সিটি ব্যাংক এনএ মনে করছে, বার্কলেজের যতটা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল, ততটা ক্ষতি হয়নি। বিএমও মার্কেটস জানিয়েছে, জেফারিজের বেশির ভাগ ঋণ এমএফএস সরাসরি বিতরণ করেনি। ফলে ক্ষতি তুলনামূলক কম হতে পারে।
তবে এমন সময় এই সংকট দেখা দিল, যখন এমনিতেই বড় অঙ্কের ঋণের জগতে সংকট চলছে। এদিকে বাংলাদেশের সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ নিয়েও তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ সরকারও বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে।
যুক্তরাজ্যে লেবার এমপি ও শেখ হাসিনার ভাতিজি টিউলিপ সিদ্দিক দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, খালার সরকারের কাছ থেকে অবৈধভাবে জমির প্লট গ্রহণ। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পরেশ রাজা মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি।