এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পরই আজ সোমবার সকালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে যে আশঙ্কা এত দিন ধরে করা হচ্ছিল, আজ সকালে তার বাস্তব রূপ দেখা গেল। সেই সঙ্গে এশিয়ার শেয়ারবাজারে সূচকের বড় পতন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, চলতি সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাস্তবে দেখা গেল, সপ্তাহের প্রথম দিনই (এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোয় সপ্তাহ শুরু হয় সোমবার থেকে) তেলের দাম সেই শিখর স্পর্শ করল। খবর বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়।
স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিশ্ববাজারে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অয়েল প্রাইস ডট কমের তথ্যানুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন শেয়ারবাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন হচ্ছে।
আরও আশঙ্কা হলো, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে।
গতকাল রোববার ইরান ঘোষণা দিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে আলী খামেনির উত্তরসূরি হবেন তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় এ ঘোষণা থেকে বোঝা যায়, তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখনো খামেনির অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে।
এর মধ্যে গত শনিবার ও গতকাল ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেলের ডিপোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় এসব হামলা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সারা বিশ্বের ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব পড়বে।
আজ এশিয়ার বাজার খোলার পর দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠেছে( সূত্র: অয়েল প্রাইস ডট কম)। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৪০ ডলারে উঠেছে। মারাবান ক্রুডের দাম ১২০ ডলারে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) বলছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। ফলাফল— বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। খবর আল জাজিরা।
তেলের দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোয় সূচকের বড় ধরনের পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক নেমেছে ৩ শতাংশের বেশি। অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক কমেছে ৪ শতাংশেরও বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকের পতন ছিল আরও তীব্র—৮ শতাংশের বেশি। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এই আতঙ্কজনিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাজারে অতিরিক্ত বিক্রি ঠেকাতে ব্যবহৃত এই ব্যবস্থা হলো ‘সার্কিট ব্রেকার’। এর আগেও বুধবার কোসপি সূচক ১২ শতাংশ পড়ে গেলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারে এতটা আতঙ্ক দেখা যায়নি। যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতে পারবে না বা সেগুলো ঘুরপথে নিয়ে যেতে হবে, সেই ঝুঁকি ছিল। শনি ও রোববার সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত— ওপেকের এই তিনটি বড় উৎপাদক দেশ তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। খবর আল জাজিরা।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মার্চের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ আদনান মাজরেই বলেন, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার লক্ষণ—এ দুই কারণে তেলের দামের এই উল্লম্ফন প্রত্যাশিতই ছিল। তাঁর কথায়, অনেকেই এখন বুঝতে শুরু করেছেন, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, সময় যত যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে, সেগুলো অতটা বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে তেলের দাম বাড়ার ফলে জেট জ্বালানি ও সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের মতো বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির বড় অংশই মূলত এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যবহৃত হয়। এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে, এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের জন্য বেশি দাম দিতে শুরু করেছেন। ফলে ইউরোপের দিকে যাওয়া কিছু গ্যাসবাহী জাহাজ মাঝ আটলান্টিক থেকেই দিক পরিবর্তন করছে।
তেলের দাম বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে তেলের দামের এই বৃদ্ধি বড় বিষয় নয়। ইরানের পারমাণবিক হুমকি থেকে মুক্তি পেতে এই সামান্য মূল্য দিতেই হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের জ্বালানিমন্ত্রী গতকাল মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র নয়। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির খুচরা দাম বেড়ে যাওয়ার যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে তিনি এ মন্তব্য করেন।