
পৃথিবীর আধুনিক ইতিহাসের অনেক বড় মোড় ঘুরেছে তেলকে ঘিরে। মাটির নিচের কালো এই তরল শুধু জ্বালানি নয়; এটি শক্তি, অর্থনীতি, সাম্রাজ্য আর যুদ্ধের গল্পও। প্রথম বাণিজ্যিক কূপ খনন থেকে জন ডি রকফেলারের উত্থান, বাকুর তেল–জ্বর, দুই বিশ্বযুদ্ধে জ্বালানির লড়াই, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির উত্থান, ১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান, কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসন থেকে আজকের ভূরাজনীতি—সবকিছুর কেন্দ্রে আছে তেল। ‘তেলের গল্প’ সিরিজে আমরা দেখব, কীভাবে একটি সম্পদ বদলে দিয়েছে মানচিত্র, ক্ষমতার ভারসাম্য ও মানুষের জীবন। প্রথম পর্ব ছিল প্রথম তেল আবিষ্কারের গল্প নিয়ে, দ্বিতীয় পর্বের বিষয় তেলের বিশ্বায়ন। আজ পড়ুন তৃতীয় পর্ব।
আগের দুই পর্বে যা ছিল: আধুনিক তেলশিল্পের শুরু ১৮৫৯ সালে পেনসিলভানিয়ায়। পরে জন ডি রকফেলার স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মাধ্যমে শিল্পকে সংগঠিত করলেও এরপর শক্তির কেন্দ্র সরে যায় রুশ বাকু, ইউরোপীয় পুঁজি ও শেলের হাতে। তারপর ইরান, ইরাক ও আরবে। দুই বিশ্বযুদ্ধে তেল জয়–পরাজয়ের নির্ধারক শক্তি হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তেল জ্বালানির বাইরে বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি ও সাম্রাজ্য প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে জায়গা নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি তেলের ওপর রেশনিং তুলে নেয়। দেশজুড়ে তখন স্বস্তি আর সবাই উদ্যাপনে ব্যস্ত। কিন্তু এই উল্লাসের আড়ালে তেলশিল্পের মানুষদের মনে ছিল অন্য এক ভয়। তাঁরা জানতেন, পৃথিবীতে যদি তেলের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়, তাহলে এর দাম একেবারে শূন্যেও নেমে যেতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, বিশেষ করে ১৯৩০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এমন অবস্থাই তৈরি হয়েছিল। টেক্সাসে একের পর এক তেলক্ষেত্র পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সেই তেল বিক্রির মতো বাজার ছিল না। এ অভিজ্ঞতাই বড় তেল কোম্পানিগুলোকে শিখিয়েছিল যে শুধু তেল খুঁজে পেলেই হবে না, সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যও ধরে রাখতে হবে। তাই তারা নানা আন্তর্জাতিক সমঝোতায় যেতে শুরু করল। কিন্তু সেগুলো খুব ভালো কাজ করেনি। কারণ, বড় কোম্পানিগুলো একে অন্যকে বিশ্বাস করত না, আর সবাই বাজার বাড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল।
তবে সেই অতিরিক্ত তেলের সময়েও সবার চোখ ছিল আরেক জায়গায়। সেটি ছিল আরব উপদ্বীপ। বিশেষ করে মরুরাজ্য, সৌদি আরব। দেশটির আয়তন ছিল টেক্সাসের তিন গুণ। দেশটির শাসক ছিলেন আবদুল আজিজ বিন আবদুর রহমান বিন ফয়সাল আল সৌদ, পশ্চিমের কাছে ইবনে সৌদ। তিনি আরব উপদ্বীপের লড়াইরত গোত্রগুলোকে একত্র করে সৌদি আরব গড়ে তুলেছিলেন।
আরব উপদ্বীপে তেল থাকতে পারে, এ ধারণা নিয়ে ১৯২৩ সালে অনুসন্ধান শুরু হয়। তখন ফ্র্যাঙ্ক হোমস নামে নিউজিল্যান্ডের এক নাগরিক লন্ডনের একটি বিনিয়োগকারী দলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল অনুসন্ধানের ইজারা নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। প্রথমে তাঁর নেওয়া একটি অনুমতি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি যান বাহরাইনে। তখন বাহরাইন ছিল ব্রিটিশ প্রভাবাধীন ছোট দ্বীপরাজ্য। ব্যবসায়ী ও মুক্তা শিকারিদের বসতি ছিল সেখানে। হোমস বাহরাইনের শাসকের কাছ থেকে তেল অনুসন্ধানের ইজারা নেন। এখান থেকেই উপসাগরীয় তেলের ইতিহাসের শুরু।
মহামন্দার সময় হজযাত্রীর সংখ্যা কমে যায়। যেমন ১৯২৭ সালে ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষ হজ পালন করতে মক্কায় গিয়েছিলেন। সেই সংখ্যা ১৯৩০ সালে নেমে আসে ৮৫ হাজারে। এরপর ১৯৩৩ সালে তা আরও কমে ২০ হাজারের নিচে নেমে যায়।
কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) বাহরাইনে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। কারণ, তারা তখন ইরান ও ইরাক থেকেই যথেষ্ট তেল পাচ্ছিল। হোমস পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইজারা বিক্রির চেষ্টা করেন। তিনি এক্সনকে ৫০ হাজার ডলারে প্রস্তাব দেন, কিন্তু এক্সন তা ফিরিয়ে দেয়। পরে এটিকে ‘বিলিয়ন ডলারের ভুল’ বলা হয়।
শেষ পর্যন্ত গালফ অয়েল ৫০ হাজার ডলারে ইজারা কিনে নেয়। তাদের ভূতত্ত্ববিদ র্যালফ রোডস মনে করেন, বাহরাইনে তেল পাওয়া যাবে। কিন্তু গালফ নিজে কাজ এগোতে পারেনি। কারণ, তারা ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সদস্য ছিল এবং রেড লাইন চুক্তির কারণে ওই অঞ্চলে একা অনুসন্ধান করতে পারত না। তাই তারা ইজারাটি সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়ার (সোকাল) কাছে বিক্রি করে। সোকাল রেড লাইন চুক্তির বাইরে ছিল। সোকাল তখন বিদেশে তেল অনুসন্ধান নিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসী ছিল না। আগে লাতিন আমেরিকা, ফিলিপাইন ও আলাস্কায় ব্যর্থ হয়েছিল। ব্রিটিশদের আপত্তি থাকলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হস্তক্ষেপে সোকাল কানাডীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ শুরু করে। ১৯৩১ সালে তারা বাহরাইনে তেল পায়। দুই বছর পর বাহরাইন বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি শুরু করে।
বাহরাইন বড় তেল উৎপাদক না হলেও এর গুরুত্ব ছিল অন্য জায়গায়। এটি ছিল সৌদি আরবের দিকে যাওয়ার সেতু। সৌদি আরব ছিল মাত্র ২০ মাইল দূরে। এদিকে বাহরাইনে তেল পাওয়ার পর বিপি ও ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানিও সৌদি আরবে আগ্রহী হয়। কিন্তু তারা খুব সতর্ক ও কম প্রস্তাব দেয়। তারা সোনায় অর্থ দিতে চায়নি। বাস্তবে তারা সৌদি তেল তুলতে যতটা না আগ্রহী ছিল, তার চেয়ে বেশি চাইছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে।
এভাবেই সোকাল মধ্যপ্রাচ্যে বড় অবস্থান তৈরি করে। রেড লাইন চুক্তির বাইরে থাকায় সবচেয়ে বড় সুযোগটি তারাই পায়। সৌদি আরবে পুরোপুরি আমেরিকান তেল কোম্পানির প্রবেশ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। পরে সোকাল বুঝতে পারে, তাদের পুঁজি ও বাজার কম। তাই তারা অংশীদার খোঁজে। ১৯৩৬ সালে টেক্সাকোর ক্যাপ রিবার বাহরাইন ও সৌদি—দুই ক্ষেত্রেই অর্ধেক অংশ কিনে নেয়। এভাবে সোকাল ও টেক্সাকো সৌদি আরবে একসঙ্গে কাজ শুরু করে।
ইবনে সৌদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল মক্কা ও মদিনায় আসা মুসলিম হজযাত্রীদের ব্যয়। মহামন্দার সময় হজযাত্রীর সংখ্যা কমে যায়। এতে রাজকোষের আয়ও কমে যায়। যেমন ১৯২৭ সালে ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষ হজ পালন করতে মক্কায় গিয়েছিলেন। সেই সংখ্যা ১৯৩০ সালে নেমে আসে ৮৫ হাজারে। এরপর ১৯৩৩ সালে তা আরও কমে ২০ হাজারের নিচে নেমে যায়।
ঠিক তখনই স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়া তেল অনুসন্ধানের ইজারা নিতে চেষ্টা চালায়। এ ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করতে যাচ্ছিলেন এমন একজন, যিনি তখন সৌদি আরবেই বাস করছিলেন। তাঁর নাম হ্যারি সেন্ট জন ফিলবি।
হ্যারি ফিলবি ছিলেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা, আরব বিশেষজ্ঞ, অভিযাত্রী ও লেখক। বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের দরবারেও তাঁর বড় প্রভাব ছিল। একসময় তিনি ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনে কাজ করতেন এবং পরে আরব অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩০ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং আবদুল্লাহ ফিলবি নামও ব্যবহার করতে শুরু করেন। পশ্চিমা বিশ্বে আরব সমাজকে পরিচিত করিয়ে দিতে তাঁর অনেক বড় ভূমিকা ছিল।
হ্যারি ফিলবি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও স্বাধীনচেতা। ১৯৫৩ সালে ইবনে সৌদের মৃত্যুর পর নতুন রাজা সৌদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। প্রশাসনিক অপচয়, বিলাসিতা ও অদক্ষতা নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা করলে ১৯৫৫ সালে তাঁকে সৌদি আরব ছাড়তে হয়। পরে তিনি লেবাননে বসবাস করেন। তাঁর ছেলে কিম ফিলবি ছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্সের কর্মকর্তা। তবে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে কাজ করতেন। শীতল যুদ্ধের ইতিহাসে কিম ফিলবি সবচেয়ে কুখ্যাত গুপ্তচরদের একজন। পরে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নেই আশ্রয় নেন।
জ্যাক ফিলবি একদিন রাজার সঙ্গে গাড়িতে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, এই রাজ্যের বালুর নিচে হয়তো গুপ্তধন লুকিয়ে আছে, আর সেটা তেল। অর্থকষ্টে থাকা বাদশাহ তাঁর কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন। যদিও সে সময়ের অনেক বিশেষজ্ঞই বলছিলেন, আরবে তেল থাকার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের লক্ষ্য ছিল যেভাবেই হোক সৌদিতে একটি তেল ইজারা পাওয়া।
সৌদি বাদশাহর কাছে যুক্তরাষ্ট্র তখনো অনেক দূরের এক দেশ। তবে আমেরিকানদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। কারণ, বেদুইন রাজনীতির একটি অলিখিত নিয়ম ছিল যে যত দূরের শক্তির সঙ্গে মিত্রতা করা যায়, ততই ভালো। তারা সাধারণত কম ঝামেলা দেয়। ব্রিটিশরা ছিল খুব কাছের শক্তি। তাদের জাহাজ লোহিত সাগর দিয়ে যেত, জেদ্দায় থামত, আর তারা সব সময়ই অঞ্চলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করত।
১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর–কষাকষি শুরু হয়। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষে আলোচনায় ছিলেন আইনজীবী লয়েড হ্যামিলটন। বাদশাহ আবদুল আজিজের পক্ষে ছিলেন তাঁর অর্থমন্ত্রী আবদুল্লাহ সুলায়মান। তবে পুরো আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ছিলেন জ্যাক ফিলবি। ফিলবি কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকেও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আবদুল আজিজের অর্থের প্রয়োজন। এতে দরদাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তির অর্থমূল্য ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ডলারের সমপরিমাণ। তবে অর্থটি আসলে ডলারে নয়, স্বর্ণভিত্তিক ব্রিটিশ পাউন্ডে নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে ছিল শুরুতে ৩৫ হাজার পাউন্ড স্বর্ণ, ১৮ মাস পরে আরও ২০ হাজার পাউন্ড স্বর্ণ এবং বার্ষিক ৫ হাজার পাউন্ড স্বর্ণ। সে সময়ের হিসাবে এটি ছিল বড় অঙ্ক। বাদশাহর মনে হয়েছিল, তিনি আমেরিকানদের কাছ থেকে ভালো দামই আদায় করেছেন। পরে ব্রিটিশদেরও এ নিয়ে আক্ষেপ ছিল। কারণ, চাইলে তারাও এই সুযোগ নিতে পারত।
ঘটনাটি এ রকম—১৯৩৩ সালের মে মাসে সৌদি আরবে তেল অনুসন্ধানের ইজারা নিয়ে দর–কষাকষির শেষ পর্যায়ে যখন বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ দেখলেন যে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি অব ক্যালিফোর্নিয়া ব্রিটিশ পক্ষের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিতে রাজি, তখন তিনি জেদ্দায় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার অ্যান্ড্রু রায়ানের মতামত জানতে চান। রায়ান তাঁকে আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিতে বলেন। কারণ, তাঁর ধারণা ছিল সৌদি আরবে তেমন তেল নেই। এরপরেই ১৯৩৩ সালের ২৯ মে জেদ্দায় সৌদি সরকার ও স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মধ্যে ঐতিহাসিক তেল ইজারা চুক্তি সই হয়। অথচ ব্রিটিশ দূত অ্যান্ড্রু রায়ান যদি বাধা দিতেন, হয়তো ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত।
আমেরিকানরা এরপর আর সময় নষ্ট করেনি। ১৯৩৭ সালের ১ ডিসেম্বর টম বার্জার তেল খুঁজতে আরবে রওনা হন। টম বার্জারের পুরো নাম থমাস সি বার্জার। তিনি ছিলেন একজন আমেরিকান ভূতাত্ত্বিক ও জরিপকারী। পরে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ও সিইও হন। দুই সপ্তাহের নববধূকে পেছনে রেখে তিনি তেলের সন্ধানে এসেছিলেন।
সৌদি আরবে তেল আবিষ্কারের গল্পটি কোনো সিনেমার কাহিনির চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। কেননা, বাস্তবতা ছিল নির্মম। ১ নম্বর, ২ নম্বর, ৩ নম্বর—এভাবে ৬ নম্বর কূপ পর্যন্ত খনন করা হলো। কোথাও কিছু চিহ্ন মিলল, কোথাও সামান্য উৎসাহ জাগল, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক তেলের বড় মজুত মিলল না। আমেরিকার বিনিয়োগকারীরা হতাশ হতে শুরু করলেন। প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার কথাও শুরু হলো।
এই জায়গাতেই গল্পে প্রবেশ করেন একজন জেদি ভূতাত্ত্বিক, ম্যাক্স স্টেইনেক। তিনি ছিলেন মার্কিন ভূতত্ত্ববিদ, মাটির গঠন, ভূত্বকের ভাষা, পাথরের স্তরের ইঙ্গিত সবকিছুই ভালো বুঝতেন। যখন চারদিকে হতাশা, যখন অনেকে প্রায় নিশ্চিত যে সৌদির মাটির নিচে তেমন কিছু নেই, তখন স্টেইনেক তা মানতে চাইলেন না। বিশেষ করে তিনি ৭ নম্বর কূপ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আরও গভীরে যেতে হবে। আরও ধৈর্য ধরতে হবে। সবার সন্দেহ, ক্লান্তি ও আর্থিক চাপের মধ্যেও তিনি ৭ নম্বর কূপে আরও গভীর খননের পরামর্শ দিলেন।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো খামিস বিন রিমথান। তিনি ছিলেন একজন বেদুইন মরু–বিশেষজ্ঞ। আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া, কেবল অভিজ্ঞতা, প্রবল পর্যবেক্ষণশক্তি ও মরুভূমির আচরণ বোঝার ক্ষমতা দিয়ে তিনি পথ চিনতেন, স্থান চিনতেন, ভূপ্রকৃতির ধরন বুঝতেন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলীদের কাছে তিনি ছিলেন এক অমূল্য গাইড। ম্যাক্স স্টেইনেকদের মতো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মরুভূমির বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ও সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে তাঁর ভূমিকা ছিল সরাসরি ও গুরুত্বপূর্ণ। পরে তাঁর সম্মানেই একটি তেলক্ষেত্রের নাম রাখা হয়।
তারপর এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৩৮ সালের ৪ মার্চ, দাম্মামের ৭ নম্বর কূপে প্রায় ১ হাজার ৪৪০ মিটার গভীরে পৌঁছানোর পর তেল পাওয়া গেল। এর আগে একের পর এক কূপে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় অনুসন্ধান প্রায় ব্যর্থ হতে বসেছিল। কিন্তু ম্যাক্স স্টেইনেক হাল ছাড়েননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আরও গভীরে গেলে তেল পাওয়া যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাঁর ধারণাই সত্যি হলো। ৭ নম্বর কূপ থেকে বাণিজ্যিকভাবে তেল উঠতে শুরু করল। শুরুতে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ ব্যারেল। কয়েক দিনের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৮১০ থেকে ৪ হাজার ব্যারেলে। এ আবিষ্কারই সৌদি আরবের ইতিহাস বদলে দেয়। পরে কূপটি ‘প্রসপারিটি অয়েল’ বা ‘সমৃদ্ধির কূপ’ নামে পরিচিত হয়। অনেকে একে বলেন, ‘লাকি নম্বর সেভেন’। কারণ, আগের ব্যর্থতার পর সপ্তম কূপটিই সৌদি আরবকে তেলের যুগে নিয়ে যায়। এই আবিষ্কার এমন এক সময়ে হয়, যখন মেক্সিকো বিদেশি তেল স্বার্থ জাতীয়করণ করেছিল। ফলে তেলশিল্পে একটি বড় মোড় আসে। খোলাখুলি শোষণের যুগ শেষ হতে শুরু করে, আর মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে তেল উৎপাদনের প্রধান উৎস হিসেবে উঠে আসে।
এই আবিষ্কারই অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি আরামকোর উত্থানের পথ খুলে দেয়। কাকতালীয়ভাবে তখনই রানি ভিক্টোরিয়ার নাতনি কাউন্টেস অব অ্যাথলোন ইবনে সৌদের অতিথি ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘আমেরিকানরা বুঝি আমাদের আগে বাজিমাত করে ফেলেছে।’
সৌদির প্রথম তেলের চালান ছিল এক রাজকীয় দৃশ্য। বাদশাহ মরুভূমি পেরিয়ে বড় দলবল নিয়ে এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বাদশাহ বিশাল এক তলোয়ার হাতে বালুর ওপর তলোয়ার নৃত্য শুরু করলেন। চারপাশে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখছিল সেই দৃশ্য। তখনো সেখানে কূটনীতিকেরা উপস্থিত হননি। সেদিন কেবল তেল কর্মী, বেদুইন কর্মকর্তা ও আমিররাই দেখেছিলেন, কীভাবে সৌদির প্রথম তেল বিশ্ববাজারের দিকে যাত্রা শুরু করল। কিন্তু এই শুরুর মধ্যেই এসে গেল ১৯৩৯, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছর।
রুজভেল্ট উপহার হিসেবে আরব রাজাকে দিয়েছিলেন একটি ডিসি–৩ উড়োজাহাজ। আর চার্চিল একটি রত্নখচিত তলোয়ার ও সুগন্ধি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারলেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রুজভেল্ট একটি ডিসি–৩ উপহার দিয়েছেন, তখন তিনি কিছুটা বিপাকে পড়েন।
যুদ্ধ যত এগোয়, তেলের গুরুত্ব তত বাড়ে। আবার রেশনিং ফিরে আসে। ওয়াশিংটনে তেলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। আমেরিকান সরকার বুঝতে শুরু করে, সৌদি তেলের নিরাপত্তা ও প্রাপ্যতা এখন কৌশলগত প্রশ্ন। ১৯৪৩ সালের দিকে এসে তারা আরও বুঝতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের মজুত যথেষ্ট নয়। ফলে সৌদিতে আরামকোর ইজারা হবে ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যারল্ড এল ইকিস ছিলেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও যুদ্ধের সময়ে তেল প্রশাসক। তিনি মনে করতেন, সৌদি তেল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ যে সরকারকে আরামকোয় সরাসরি অংশীদারি নেওয়া উচিত। পরে সরকারি খরচে পাইপলাইন নির্মাণের কথাও ওঠে। কিন্তু দেশীয় রাজনীতির কারণে সেই পথ সহজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়, সরকার সরাসরি ব্যবসায় নামবে না, কিন্তু সৌদিতে তেল উৎপাদন বাড়াতে কোম্পানিগুলোকে পেছন থেকে সমর্থন দেবে।
১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষের দিকে। ইয়াল্টা সম্মেলন শেষে ফেরার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট মিসরের গ্রেট বিটার লেকে নোঙর করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইন্সিতে সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের সঙ্গে দেখা করেন। সৌদি বাদশাহর সঙ্গে প্রায় ৫০ জনের একটি দল ছিল। দলে ছিলেন বাদশাহর দুই ছেলে, এক প্রধানমন্ত্রী, এক জ্যোতিষী ও জবাইয়ের জন্য অনেক ভেড়া। ইতিহাসে এই বৈঠককে পরে অনেকেই মার্কিন–সৌদি সম্পর্কের এক প্রতীকী সূচনা হিসেবে দেখেছেন। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত জোট চুক্তি ছিল না; বরং যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, তেল, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক বোঝাপড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি, কিন্তু যুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, সে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছিল, মধ্যপ্রাচ্য ভবিষ্যতের কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হতে যাচ্ছে। রুজভেল্ট বিশ্বাস করতেন, যুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, বিশেষ করে তেলের কারণে।
বৈঠকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফরেন রিলেশনস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের নথিতে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেন, এই বৈঠকেই পেট্রোডলার ব্যবস্থার সূচনা। তবে সেটি সত্যি নয়; বরং নথিতে দেখা যায়, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ফিলিস্তিন, ইহুদি শরণার্থী ও আরবদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ইউরোপে নাৎসি নির্যাতনের শিকার ইহুদিদের দুর্দশার কথা রুজভেল্ট ইবনে সৌদকে বলেন। জবাবে সৌদি বাদশাহ স্পষ্ট ভাষায় জানান, জার্মানরা যদি অপরাধ করে থাকে, তার দায় আরবদের ওপর চাপানো উচিত নয়; ফিলিস্তিনের আরবদের জায়গা ছেড়ে দিতে বলা ন্যায্য হবে না।
রুজভেল্ট বৈঠকে এমনও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে আরবদের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ কিছু তিনি করবেন না। পরে ১৯৪৫ সালের ৫ এপ্রিল ইবনে সৌদকে লেখা এক চিঠিতে তিনি সেই আশ্বাসের পুনরুল্লেখ করেন। চিঠিতে রুজভেল্ট লিখেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনের মৌলিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরব ও ইহুদি—উভয় পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করার নীতি থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সরে যায়নি।’
কিন্তু দুই মাস পর রুজভেল্ট মারা যান। এরপর প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান এসেই নতুন রাষ্ট্র ইসরায়েল গঠনে পূর্ণ সমর্থন দেন। এতে সৌদি আরব অসন্তোষ প্রকাশ করে। ১৯৪৬ সালে বাদশাহর ছেলে আমির ফয়সাল ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রুম্যানকে ইহুদি রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর বাবার উদ্বেগ জানান। এতে আমেরিকার দুই বিপরীত নীতি স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে তারা ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়, যা ভোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সৌদি আরবেরও সমর্থন দরকার, যা তেলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বন্দ্ব সামলাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোয় কূটনীতির অনেক অংশ তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়। যেন তারা আলাদা একধরনের সরকার। এভাবেই প্রায় ২৫ বছর দুই নীতি আলাদা রাখা হয়।
এদিকে এই নতুন সৌদি–আমেরিকা ঘনিষ্ঠতায় চার্চিলও বিচলিত হয়েছিলেন। চার্চিল তড়িঘড়ি করে নিজেও ইবনে সৌদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। চার্চিল–ইবনে সৌদ বৈঠক হয়েছিল মিসরের ফাইয়ুম ওয়েসিসের হোটেল দু লাকে। ১৯৪৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রুজভেল্টের বৈঠকের ঠিক তিন দিন পর।
রুজভেল্ট উপহার হিসেবে আরব রাজাকে দিয়েছিলেন একটি ডিসি–৩ উড়োজাহাজ। আর চার্চিল একটি রত্নখচিত তলোয়ার ও সুগন্ধি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারলেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রুজভেল্ট একটি ডিসি–৩ উপহার দিয়েছেন, তখন তিনি কিছুটা বিপাকে পড়েন। শেষে তাৎক্ষণিকভাবে জানান যে ডার্বির রোলস–রয়েস কারখানা আবার চালু হলেই উৎপাদিত প্রথম লিমুজিনটি তিনি ইবনে সৌদকে উপহার দেবেন।
ব্রিটিশরা অনেক আয়োজন করে রোলস–রয়েস পাঠিয়েছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে আরবে রাজা ও শাসকেরা লিমুজিনের পেছনের সিটে বসেন না। ফলে রোলস–রয়েসটি যখন শেষ পর্যন্ত রিয়াদে পৌঁছাল, রাজা বেরিয়ে এসে সেটি দেখলেন, সামনে গিয়ে বসলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আবার নেমে গেলেন। কারণ, ব্রিটিশরা স্টিয়ারিং হুইলের জায়গা বদলাতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে চালক বসছেন ডান পাশে। তার মানে ইবনে সৌদকে বসতে হবে বাঁ পাশে, যা অসম্মানের আসন হিসেবে বিবেচিত। তিনি গাড়িটি এক ছোট ভাইকে দিয়ে দিলেন। এরপর আর কখনো সেটিতে চড়েননি। তখন আসলে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে নিরাপত্তা ও তেল আয়ের জন্য সৌদি বাদশাহ আটলান্টিকের ওপারের যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
১৯৪৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বুঝতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের তেলের মজুত যথেষ্ট নয়। ফলে সৌদি তেলের নিরাপত্তা খুব জরুরি বিষয় হয়ে ওঠে। অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি, অর্থাৎ আরামকো, কার্যত মার্কিন জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
ইউরোপ ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়োজন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর তাগিদ মিলে জন্ম দেয় বিশাল এক মার্কিন সহায়তা কর্মসূচির, মার্শাল প্ল্যান। এখানে মধ্যপ্রাচ্যের তেল, বিশেষ করে সৌদি তেল খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, ইউরোপের কারখানা চালাতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে, পরিবহন সচল রাখতে বিপুল জ্বালানি দরকার ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু নিজের জন্য তেল জোগাড় করা ছিল না; বরং পশ্চিম ইউরোপ ও পরে জাপানের অর্থনীতি সচল রাখতে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। তখন মনে করা হচ্ছিল, এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার না হলে স্থিতিশীলতা আসবে না, গণতন্ত্র টিকবে না, আর সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোও কঠিন হবে।
এ কারণেই সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের জন্য তেল ছিল উন্নয়নের চাবিকাঠি, আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সৌদি তেল ছিল কৌশলগত সম্পদ। সৌদি বাদশাহর মনে হতো, তাঁর দেশ চারদিক থেকে শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে ঘেরা। যেমন ব্রিটিশরা গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্র ঘিরে রেখেছে, ইরাকের হাশেমিরা ঘিরে রেখেছে, মিসরীয়রা ঘিরে রেখেছে, জর্ডানও ঘিরে রেখেছে। অর্থাৎ চারদিকেই যেন অবরোধ। তাই তাঁর সহায়তা দরকার ছিল, তাই তিনি আমেরিকার দিকে ঝুঁকছিলেন। এদিকে বিশ্বজুড়ে কয়লার বদলে তেলের ব্যবহার বাড়ছিল। ফলে শুধু স্ট্যান্ডার্ড অয়েল আর টেক্সাকোর পক্ষে সৌদি তেলের উন্নয়ন সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ১৯৪৭ সালে আরামকোয় আরও বড় মার্কিন কোম্পানিকে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজে সরাসরি তেল ব্যবসায় নামেনি, কিন্তু আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। সহজ করে বললে, সামনে ছিল কোম্পানি, আর পেছনে ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র। কারণ, তখন সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, সৌদি তেল শুধু ব্যবসা নয়, এটি পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও রাজনীতির বড় ভরসা।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এক অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে। কারণ, একদিকে তারা চাইছিল সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে, যাতে তেলের সরবরাহ ঠিক থাকে। অন্যদিকে তারা ইসরায়েলকেও সমর্থন দিচ্ছিল। তাই ভয় ছিল, আরব দেশগুলো, বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর শাসকেরা ইসরায়েলকে মেনে নিলে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, আর তাতে তেলের রাজনীতিতে সমস্যা হতে পারে। এ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সরকার প্রকাশ্যে রাজনীতি সামলাত, আর আরামকো প্রায় সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার আলাদা এক অঘোষিত চ্যানেল হিসেবে কাজ করত। কোম্পানি ও সরকারের এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অনেক কিছুই তখন গোপন নথিতে রাখা হতো।
আবার সৌদি সরকার মনে করছিল, তাদের দেশের তেল থেকে যে লাভ হচ্ছে, তার আরও বড় অংশ তাদের পাওয়া উচিত। এই দাবির ফলেই ১৯৫০ সালে সৌদি আরব ৫০–৫০ মুনাফা নীতি চাপিয়ে দেয়। অর্থাৎ তেল ব্যবসার নিট মুনাফা কোম্পানি ও সৌদি সরকার প্রায় সমান ভাগে পাবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও পরে এটিকে ‘বাস্তবসম্মত’ ও ‘স্থিতিশীলতা আনার’ পথ হিসেবে দেখে। তৎকালীন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ম্যাগি কোম্পানিগুলোকে বোঝান যে সৌদিদের দাবি পুরোপুরি এড়ানো যাবে না, বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
এই ৫০–৫০ ব্যবস্থাটি চালু করা হয় এমনভাবে, যাতে আরামকোর অতিরিক্ত টাকা না লাগে, কিন্তু সৌদি আরব বেশি টাকা পায়। এর জন্য ব্যবহার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন ট্যাক্স ক্রেডিট আইন। সৌদি আরব বলেছিল, ‘আমাদের দেশের তেল থেকে আমাদের বেশি আয় চাই।’ কিন্তু আরামকোও চাইছিল না যে তাদের খরচ হঠাৎ অনেক বেড়ে যাক। তখন একটি বুদ্ধি বের করা হয়। সৌদি আরব আরামকোর ওপর নতুন কর বসায়। আরামকো সেই টাকা সৌদি সরকারকে দেয়। এরপর আরামকো যুক্তরাষ্ট্রকে বলে, ‘আমরা তো বিদেশে কর দিয়ে ফেলেছি, তাই আমেরিকায় আমাদের যে কর দেওয়ার কথা, সেখান থেকে এই টাকা বাদ দিন।’
এতে আরামকোর মোট খরচ খুব বেশি বাড়ল না। কিন্তু আগে যে টাকার বড় অংশ আমেরিকার কোষাগারে যেত, তার একটা বড় অংশ এবার সৌদি আরব পেতে শুরু করল। সহজ কথায়, আমেরিকা নিজের করের কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে সৌদি আরবকে বেশি টাকা পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কারণ, তখন যুক্তরাষ্ট্র মনে করছিল, সৌদি আরবকে সন্তুষ্ট রাখা জরুরি। বিশেষ করে তেলের জোগান ঠিক রাখতে হবে, আর ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে হবে। ইসরায়েলকে মেনে নেওয়ার বিষয়টি তো ছিলই।
১৯৪৩ সালে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক এভারেট ডি–গোলিয়ারকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করতে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যই ভবিষ্যতে তেলের নতুন ভরকেন্দ্র হয়ে উঠবে। তিনি এটিকে বিশ্বের তেলের এক বিশাল ‘জ্যাকপট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তাদের রিপোর্টে বলা হয়, সৌদি আরবের তেল আবিষ্কার ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক পুরস্কার’।
সূত্র:
১. ড্যানিয়েল ইয়ার্গিনের ‘দ্য প্রাইজ: দ্য এপিক কোয়েস্ট ফর অয়েল, মানি অ্যান্ড পাওয়ার’ আধুনিক তেলের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর একটি। বইটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৯২ সালে জেনারেল নন–ফিকশন বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পায়। এই লেখার মূল সূত্র এই বই। সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হালনাগাদ তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।
২. অ্যান্থনি স্যাম্পসনের আরেক বিখ্যাত বই—দ্য সেভেন সিস্টার্স: দ্য গ্রেট অয়েল কোম্পানিজ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে শেইপড।