
অনিশ্চয়তা ভর করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। একদিকে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও এআইয়ে বিনিয়োগ থেকে অসম প্রাপ্তি—এসব কারণে সিইও বা প্রধান নির্বাহীদের আত্মবিশ্বাস কমে গেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছর রাজস্ব আয়ের বিষয়ে সিইওদের আত্মবিশ্বাস গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। মাত্র ৩০ শতাংশ সিইও বলেছেন, আগামী এক বছরে রাজস্ব আয় বাড়বে—এ বিষয়ে তাঁদের আত্মবিশ্বাস আছে। অথচ ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ ও ২০২২ সালে তা ছিল ৫৬ শতাংশ।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন। এই সম্মেলন উপলক্ষে সিইও জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স (পিডব্লিউসি)। এবার নিয়ে তারা ২৯ বার এই জরিপ পরিচালনা করল।
জরিপে দেখা গেছে, বৈশ্বিক ব্যবসা–বাণিজ্য নানামুখী জটিলতার মুখে পড়েছে। একদিকে দ্রুতগতিতে প্রযুক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। অন্যদিকে আছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক চাপ—এই পরিস্থিতিতে অনেক কোম্পানির পক্ষে বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করা সম্ভব হয়নি।
সিইও বা প্রধান নির্বাহীদের মনে এখন মূল ভাবনা হলো, বিশ্বে যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হচ্ছে, তার সঙ্গে কোম্পানিগুলো খাপখাইয়ে নিতে পারছে কি না বিশেষ করে এআইয়ের সঙ্গে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪২ শতাংশ সিইওর মনে এটাই এখন মূল ভাবনা। উদ্ভাবন বা ব্যবসার ক্ষেত্রে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা কী আছে বা নেই, তার চেয়ে বেশি ভাবনা এখন এআই নিয়ে। উদ্ভাবন ও সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ২৯ শতাংশ সিইও।
এআই নিয়ে আরেক বিপদ হলো, এই প্রযুক্তির এত ব্যবহার সত্ত্বেও মাত্র ১২ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, এআই ব্যবহার করে তাঁদের রাজস্ব আয় বেড়েছে ও ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ৩৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের হয় রাজস্ব আয় বেড়েছে, না হয় ব্যয় কমেছে। ৫৬ শতাংশ সিইও বলেছেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভ হয়নি।
আরেকটি বিষয় হলো, যেসব কোম্পানি পূর্ণাঙ্গভাবে এআই ব্যবহার করছে এবং যেসব কোম্পানি পাইলট ভিত্তিতে এআই ব্যবহার করছে, তাদের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। যাদের ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে এবং রাজস্ব আয় বেড়েছে, তাদের কোম্পানি সর্বক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার শুরু করেছে—এমন সম্ভাবনা দুই থেকে তিন গুণ বেশি। পণ্য উৎপাদন, সেবা, চাহিদা তৈরি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই তারা এআই ব্যবহার করছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এআই কাঠামো ও সমন্বিত প্রযুক্তিগত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা (সিইও) এআই বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
পিডব্লিউসির পৃথক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব কোম্পানি পণ্য, সেবা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতায় ব্যাপকভাবে এআই প্রয়োগ করেছে, তাদের মুনাফার হার প্রায় চার /////////শতাংশ পয়েন্ট////////// বেশি। অর্থাৎ যারা এসব করেনি, তাদের তুলনায়।
পিডব্লিউসি গ্লোবাল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কান্দে বলেন, ২০২৬ সাল এআইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে যাচ্ছে। অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এআইকে পরিমাপযোগ্য আর্থিক সুফলে রূপ দিতে পেরেছে, কিন্তু অনেকেই এখনো পরীক্ষামূলক প্রকল্পের গণ্ডি পেরোতে পারছে না। এই ব্যবধান এখন আত্মবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার মাপকাঠিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যারা এখনই পদক্ষেপ নেবে না, তাদের ক্ষেত্রে এই ফারাক খুব দ্রুত আরও বেড়ে যাবে।
বাহ্যিক ঝুঁকির চাপ বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে সিইওদের আস্থা আরও দুর্বল হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতি পাঁচজন সিইওর মধ্যে একজন (২০ শতাংশ) জানিয়েছেন, আগামী ১২ মাসে শুল্কের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে তাঁদের প্রতিষ্ঠান। তবে অঞ্চলভেদে এই ঝুঁকির মাত্রায় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়—যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ, সেখানে চীনের মূল ভূখণ্ডে তা ২৮ শতাংশ ও মেক্সিকোতে ৩৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সিইওদের মধ্যে ২২ শতাংশের ভাষ্য, তাঁদের প্রতিষ্ঠান উচ্চঝুঁকির মধ্যে আছে।
সাইবার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ৩১ শতাংশ সিইও এটিকে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছেন। গত বছর যা ছিল ২৪ শতাংশ এবং দুই বছর আগে ২১ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে ভূরাজনৈতিক ৮৪ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে তাঁরা প্রতিষ্ঠানজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা (৩১ শতাংশ), প্রযুক্তিগত ব্যাঘাত (২৪ শতাংশ) ও ভূরাজনীতি (২৩ শতাংশ) নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ সামান্য কমেছে—গত বছর যা ছিল ২৭ শতাংশ, এবার তা কমে ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি সত্ত্বেও সিইওরা ক্রমবর্ধমান হারে মনে করছেন, পুনর্গঠন প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। গত পাঁচ বছরে ১০ জনের মধ্যে চারজনের বেশি সিইও (৪২ শতাংশ) জানিয়েছেন, তাঁদের কোম্পানি নতুন খাতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বড় ধরনের অধিগ্রহণের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ বর্তমান শিল্পের বাইরে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন, যেখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পার্শ্ববর্তী খাত হিসেবে উঠে এসেছে প্রযুক্তি।
আগামী এক বছরে ৫১ শতাংশ সিইও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছেন। বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩৫ শতাংশ সিইও মনে করছেন, এটি তাঁদের শীর্ষ তিন বাজারের একটি। যুক্তরাজ্য ও জার্মানি (উভয়ই ১৩ শতাংশ) এবং চীনের মূল ভূখণ্ড (১০ শতাংশ)ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। ভারতের প্রতি আগ্রহ আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—১৩ শতাংশ সিইও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটিকে শীর্ষ তিন গন্তব্যের মধ্যে রেখেছেন।
তবে বাস্তবায়নের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। চারজনের মধ্যে মাত্র একজন সিইও বলেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনী প্রকল্পে উচ্চ ঝুঁকি নেওয়ার বেলায় সহনশীল। সেই সঙ্গে কম ফলপ্রসূ উদ্যোগ বন্ধে তাঁরা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন, কিংবা তাঁদের নির্দিষ্ট উদ্ভাবনকেন্দ্র আছে।
সময়ও বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিইওরা জানিয়েছেন, যেসব বিষয়ের মেয়াদ এক বছর, সেসব বিষয়ে তাঁরা ৪৭ শতাংশ সময় ব্যয় করছেন। অন্যদিকে পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এমন ক্ষেত্রে তাঁরা সময় দেন মাত্র ১৬ শতাংশ।
এ বিষয়ে পিডব্লিউসি গ্লোবাল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কান্দে বলেন, দ্রুত পরিবর্তনের সময় গতি কমানোর প্রবণতা স্বাভাবিক, কিন্তু তা আবার ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঝুঁকির পাশাপাশি সম্ভাব্য সুযোগও বাড়ছে, অথচ তা কাজে লাগানোর পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যাঁরা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিনিয়োগ করার প্রত্যয় রাখেন, তাঁরাই সফলকাম হবেন।