আধুনিক কর্মজীবনে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে কর্মীরা প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হন। কিন্তু বিজ্ঞান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে দিনের মধ্যে অতিরিক্ত সময় কাজ করা শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নয়টা-পাঁচটার কর্মসূচির সঙ্গে আমরা পরিচিত। প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ করলে এক দিন ছুটির ভিত্তিতে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা দাঁড়ায় ৪৮। বাংলাদেশে এটিই সাধারণভাবে স্বীকৃত কর্মসময়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মঘণ্টায় রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রশ্ন হলো, ঠিক কত ঘণ্টা কাজ করা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের জন্যই ভালো?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ যত ঘণ্টা কাজ করেন, তা সব সময় তাঁদের করা ‘উচিত’ সময়ের সমান নয়। চাকরির ধরন, আয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অনুযায়ী এ হিসাব বদলে যায়। আর আদর্শ কর্মসপ্তাহ সম্পর্কে ব্যবস্থাপকদের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের নেতৃত্ব-ধারণাকেই স্পষ্ট করে।
বিশ্বে গড় কর্মঘণ্টা ৪২
বিশ্বব্যাংকের আমোরি গেথিন এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির ইমানুয়েল সাএজের শ্রমবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের কর্মরত প্রাপ্তবয়স্কদের গড় সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ৪২। লিঙ্গ, বয়স, পেশা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এই সময়সীমার ভিন্নতা রয়েছে। তবু ৪০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ এখনো অনেক দেশে একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
কাজ-জীবনের ভারসাম্যের পক্ষে ইউরোপ
ডিউক ইউনিভার্সিটির গ্রেগর ইয়াশরশ, লরা পিলোসফ ও অ্যান্থনি স্বামীনাথনের এক গবেষণা বলছে, জার্মানি ও ব্রিটেনের কর্মীরা কিছু আয় কমাতে রাজি, যদি তাঁরা বেশি অবসর সময় পান। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, জার্মানদের আদর্শ কর্মসপ্তাহ মাত্র ৩৭ ঘণ্টা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীরা বেশি আয়ের জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করতে আগ্রহী। গবেষকদের মতে, এটি মার্কিনদের আর্থিক অনিশ্চয়তা বা ইউরোপীয়দের শিথিলতার প্রতিফলন হতে পারে।
বেশি কাজ মানেই বেশি ফল নয়
স্ট্যানফোর্ডের জন পেনকাভেলের গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে উৎপাদনশীলতা কমতে শুরু করে। আর ৬৩ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত সময় মোট উৎপাদন বাড়ায় না। কম ঝুঁকিপূর্ণ চাকরিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। গবেষকদের প্রশ্ন: ‘শুক্রবার বিকেলে কি কেউ তার সেরা কাজটি করে?’
কর্মী বাড়ানো বনাম কাজের সময় বাড়ানো
প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয়। ফলে অনেক সময় বিদ্যমান কর্মীদের কর্মঘণ্টা বাড়ানো নতুন কর্মী নিয়োগের চেয়ে সাশ্রয়ী হতে পারে, যতক্ষণ না কর্মী অতিরিক্ত সময়েও যথেষ্ট মূল্য যোগ করছেন।
দীর্ঘ শিফটে ঝুঁকি বাড়ে
মিসিসিপির প্যারামেডিকদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শিফটের শেষ দিকে ক্লান্তির কারণে জরুরি সাড়া দেওয়ার দক্ষতা কমে, যা কখনো কখনো প্রাণঘাতী হতে পারে। নিরাপত্তাসংকটপূর্ণ কাজগুলোতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
আদর্শ কর্মসপ্তাহ ঘণ্টায় নয়, আউটপুটে নির্ধারিত হতে পারে—এমন মতও রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের। আবার অনেকে মনে করেন, এআই ভবিষ্যতে কর্মঘণ্টার ধারণাই বদলে দেবে। তবে স্পষ্ট একটি বিষয়-ব্যবস্থাপকরা কর্মঘণ্টা নিয়ে যা ভাবেন, তা শুধু দেশের বা শিল্পের ট্রেন্ডই নয়, প্রতিফলিত করে তাদের নিজস্ব অগ্রাধিকারকেও।