চাকরির বাজার অনিশ্চিত : তরুণদের প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের যে যে পর্যালোচনা

দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং কর্মক্ষেত্রে নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এসব কারণে ভবিষ্যতের চাকরির বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে সাম্প্রতিক এক আলোচনায়ও গুরুত্ব পেয়েছে বিষয়টি।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও এমন বাস্তবতায় শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রস্তুত হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং অভিযোজনক্ষমতা, শেখার মানসিকতা এবং এআই ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

৫ বছরে বদলে যেতে পারে ৪০ শতাংশ দক্ষতা—

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমানে ব্যবহৃত প্রায় ৪০ শতাংশ দক্ষতার চাহিদা সম্পূর্ণ বা আংশিক কমে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে তরুণদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নতুন কিছু শেখার মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআইয়ের কারণে কোন পেশা সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকবে, শুধু সেই বিবেচনায় ক্যারিয়ার নির্বাচন করা উচিত নয়। বরং নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতাকে ভিত্তি করে একটি ‘টুলকিট’ তৈরি করতে হবে। যাতে যোগাযোগ, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা থাকে।

এআই সহকারী, সমাধানকারী নয়—

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহযোগী পরিচালক ফ্রান্সেসকা ফানেলি বলেন, ‘এখন এআই–সাক্ষরতা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতায় পরিণত হয়েছে। নিয়োগদাতারা দেখতে চান, নতুন কর্মীরা এআই টুল ব্যবহার করতে জানেন কি না।’

পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আপনাকে চাকরির বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে
সব খাতে সহজে এআই সমান প্রভাব ফেলবে না বা সব চাকরি রিপ্লেস করবে না। ফলে কারিগরি শিক্ষার হার এবং মান বৃদ্ধি করতে পারলে, একদিকে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন তরুণেরা, অন্যদিকে এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষতিও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে
অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশন অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন

চাকরির আবেদনেও কাজে লাগবে এআই—

চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এআই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন চাকরির বিবরণ বিশ্লেষণ, নিয়োগদাতার চাহিদা বোঝা, জীবনবৃত্তান্ত ও কভার লেটার তৈরিতে সহযোগিতা নেওয়া। এ ছাড়া চাকরির সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতেও এআই সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করেন ফানেলি। তবে তিনি বলেন, এআই দিয়ে তৈরি আবেদনপত্র যেন প্রার্থীর নিজের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বকে প্রতিফলিত করে। এমন কোনো ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়, যা প্রার্থী বাস্তবে কখনো ব্যবহার করতেন না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে তরুণদের জন্য এই আলোচনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট হচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় অভিজ্ঞতার অভাব, দক্ষতার অমিলসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

বাংলাদেশে আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ কারিগরি খাতগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির বাইরে বেসরকারি খাতে যোগাযোগ, ইংরেজি দক্ষতা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং এআই ব্যবহারের সক্ষমতার চাহিদাও বাড়ছে।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য শুধু ডিগ্রি অর্জন যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সফট স্কিল, ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বাংলাদেশে আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ কারিগরি খাতগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির বাইরে বেসরকারি খাতে যোগাযোগ, ইংরেজি দক্ষতা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং এআই ব্যবহারের সক্ষমতার চাহিদাও বাড়ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশন অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মতো জনবহুল দেশে কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। কারণ, সব সেক্টরে সহজে এআই সমান প্রভাব ফেলবে না বা সব চাকরি রিপ্লেস করবে না। ফলে কারিগরি শিক্ষার হার এবং মান বৃদ্ধি করতে পারলে, একদিকে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন তরুণেরা, অন্যদিকে এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষতিও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।’

বিডিজবসের নির্বাহী পরিচালক ফাহিম মাশরুরের মতে, ‘চাকরির বাজারের প্রস্তুতিটা শুরু হয় শিক্ষাজীবন থেকে। এখানে আমাদের জোর দিতে হবে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারে পারদর্শী করে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি বর্তমান পেশাজীবীদের শেখার মানসিকতা রাখতে হবে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দক্ষতা শিখতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। পরিবর্তনশীল বাজারে টিকে থাকতে এর বিকল্প নেই।’

‘স্বপ্নের চাকরি’ নিয়ে অতিরিক্ত চাপ নয়—

ফানেলি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পারফেক্ট’ বা ‘স্বপ্নের চাকরি’ খুঁজে পাওয়ার জন্য নিজেদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, একটি চাকরি জীবনের সব ধরনের প্রত্যাশা পূরণ না–ও করতে পারে। কখনো কখনো চাকরি কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে, আর জীবনের অর্থ পরিবার, বন্ধুত্ব, সমাজ ও ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেও আসতে পারে।