মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে
মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে

ব্যানবেইসের তথ্য

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ১ বছরে ৪ লাখ, বেড়েছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে

এক বছরের ব্যবধানে দেশে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। শিক্ষার্থী কমেছে স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। বিপরীতে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এই প্রবণতায় শিক্ষার পরিকল্পনা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনের সঙ্গে আগের বছরের তথ্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে মূলত মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূরক তথ্য হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও প্রকাশ করেছে ব্যানবেইস।

গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। ১ হাজার ৩৫০ জন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, এসব পরীক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের (৫৪৯) বিয়ে হয়ে গেছে। এদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী।

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় শিখন ঘাটতি, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের একাংশের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। ১ হাজার ৩৫০ জন অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, এসব পরীক্ষার্থীর প্রায় ৪১ শতাংশের (৫৪৯) বিয়ে হয়ে গেছে। এদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী।

ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে আলাদাভাবে কোনো কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি।

স্কুল অ্যান্ড কলেজেও আছে মাধ্যমিক স্তর। সেখানেও একই প্রবণতা। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি, আগের বছর যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়ে ১ হাজার ৫১৪টি থেকে ১ হাজার ৫৫৬টি হয়েছে। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।

প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, কমেছে শিক্ষার্থী

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন ১৯ হাজার ২১১টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। অর্থাৎ এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, আর শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি।

স্কুল অ্যান্ড কলেজেও আছে মাধ্যমিক স্তর। সেখানেও একই প্রবণতা। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি, আগের বছর যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠান বেড়ে ১ হাজার ৫১৪টি থেকে ১ হাজার ৫৫৬টি হয়েছে। স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।

এ ছাড়া ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭০ হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি, আগের বছর যা ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে এ স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি উদ্বেগজনক। নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীর চাহিদা, জনসংখ্যার পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং শিক্ষার মান কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এর আগে করোনাভাইরাসের সময় মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, করোনার সংক্রমণ শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কমেছিল।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও সার্বিকভাবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

কারিগরি শিক্ষায়ও কমেছে শিক্ষার্থী

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও সার্বিকভাবে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এই হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য নেই।

শিক্ষার্থী বেড়েছে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে

ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পড়ানো হয়—দেশে এমন মাদ্রাসা আছে ৯ হাজার ২৯৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এই হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য নেই।

অন্যদিকে ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের সংখ্যা ১৪৩। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২৯ হাজার ৬৭২ জন। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন।

মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান

নিবিড় গবেষণা দরকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা যায়। তবে মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।