
যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রতিবছর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি নিয়ে র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে থাকে। এর সঙ্গে শিক্ষা–সম্পর্কিত নানা বিষয়ে প্রতিবেদন ও জরিপও প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬–এ উচ্চশিক্ষায় নারীদের অর্জন, অবদান ও যাত্রাপথের গল্প তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইমস হায়ার এডুকেশন।
বিশ্বের শীর্ষ ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি নারী নেতৃত্বে চলছে বা পরিচালিত হচ্ছে। বছরের পর বছর এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শীর্ষ ২০০টি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৮টি বর্তমানে নারীদের নেতৃত্বে (উপাচার্য বা প্রেসিডেন্ট) রয়েছেন, যা শতাংশের হিসেবে মোটের ওপর ২৯ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ৫৪। এ বছর ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শীর্ষ নেতৃত্বে এসেছেন নারীরা। নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংখ্যার বিচারের দেখলে ২০১৫ সালের তুলনায় ৩১ জন বেশি নারী উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। শীর্ষ ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ নারী উপাচার্য।
বর্তমানে টাইমসের র্যাঙ্কিংয়ে ১ নম্বরে থাকা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় চলছে আইরিন ট্রেসির নেতৃত্বে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে লুইস রিচার্ডসনের কাছ থেকে তিনি উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চারটি মর্যাদাপূর্ণ আইভি লীগ প্রতিষ্ঠান-কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডার্টমাউথ কলেজ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) স্যালি কর্নব্লুথ এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেবোরাহ প্রেন্টিসও আছেন নেতৃত্বে।
শীর্ষ ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশে নারী উপাচার্য বা প্রেসিডেন্ট রয়েছেন, বাকিদের এক-তৃতীয়াংশের তুলনায়। শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় তিনটি নারী নেতৃত্বে চলছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমতার দিকে ধীর অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে এই পরিসংখ্যানকে স্বাগত। কিংস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক এলিজাবেথ কেলান বলেছেন যে ‘তথ্যগুলো একটি মাইলফলক এবং উচ্চশিক্ষায় লিঙ্গ সমতার দিকে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। এটি প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবু কেবল সংখ্যার অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনুশীলন এবং সংস্কৃতি একই গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পরিবর্তন এখনো অসম রয়ে গেছে।’
শীর্ষ ২০০-এর মধ্যে ২৮টি দেশের মধ্যে ১১টিতে কোনো নারী উপাচার্য বা প্রেসিডেন্ট নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫টি (২৭ শতাংশ) শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫টিতে একজন নারী প্রধান রয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। ট্রাম্পের দেশটিতে যুক্তরাজ্য (৩১ শতাংশ), জার্মানি (৩৩ শতাংশ), অস্ট্রেলিয়া (৪০ শতাংশ) এবং নেদারল্যান্ডসের (৫৫ শতাংশ) চেয়ে নারী নেতৃত্ব কম।
দেশের বিচারে দেখলে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যে নারী উপাচার্যের নেতৃত্বে চলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী উপাচার্যদের বিস্তারিত জেনে নেব আমরা।
নিউরো সায়েন্টিস্ট আইরিন ট্রেসি ২০২৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। ট্রেসি অক্সফোর্ডের মের্টন কলেজ থেকে বায়ো কেমেস্ট্রিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর, তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে পোস্টডক্টরাল করেন। ট্রেসি ১৯৯৭ সালে অক্সফোর্ডে ফেরেন। অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং অফ দ্য ব্রেন (বর্তমানে ওয়েলকাম সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটিভ নিউরোইমেজিং) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এরপর তিনি ক্রাইস্ট চার্চ কলেজের ফিজিওলজি, অ্যানাটমি এবং জেনেটিকস বিভাগে স্থায়ী পদে যোগ দেন। পরে অ্যানেস্থেটিকস বিভাগে কাজ শুরু করেন। ট্রেসি এখনও অ্যানেস্থেটিক নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক।
স্যালি কর্নব্লুথ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ১৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এমআইটির ১৬২ বছরের ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয় নারী নেতৃত্ব।
কর্নব্লুথ সেল বায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। এরপর রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মলিকলার অনকোলজিতে পিএইচডি করেন। স্যালি কর্নব্লুথ ডিউক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের ফার্মাকোলজি এবং ক্যানসার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।
ডেবোরাহ প্রেন্টিস ২০২৩ সালের জুলাই মাস থেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার শুরু সাইকোলজিতে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান সাইকোলজি অ্যান্ড মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এরপর তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজিতে স্নাতক করেন এবং ১৯৮৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ডেবোরাহ প্রেন্টিসের গবেষণা মানব আচরণে সামাজিক নিয়মাবলি অধ্যয়নের ওপর।
ডেবোরাহ প্রেন্টিস প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। শেষে অনুষদের ডিন হন। এরপরই ক্যামব্রিজের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন।
মাউরি ম্যাকেইনিস ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হন। ম্যাকেইনিস ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে হিস্ট্রি অব আর্টের স্নাতক ছাত্রী হিসেবে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তার একাডেমিক আগ্রহ দক্ষিণের পূর্ববর্তী অঞ্চল থেকে ঔপনিবেশিক আমেরিকান শিল্প ও সংস্কৃতিতে। তিনি এই বিষয়ে পাঁচটি বই লিখেছেন। ম্যাকেইনিস এর আগে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ছিলেন।
ক্লেয়ার শিপম্যান ২০২৫ সালের মার্চ থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন শিপম্যান। তিনি সিএনএন, এনবিসি এবং এবিসিতে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনসহ সাম্প্রতিক ইতিহাসের বৃহত্তম কয়েকটি ঘটনা নিয়ে তিনি নিউজ করেছেন। বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি নিয়ে প্রতিবেদন করার জন্য ডুপন্ট পুরস্কার এবং এমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
শিপম্যান চারটি বইও লিখেছেন। নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে নানা কাজ করেছেন তিনি। নারীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে এবং নারীদের আত্মবিশ্বাস উন্নয়নে ভাষ্যকারও ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ক্লেয়ার শিপম্যান ২০১৩ সাল থেকে কলম্বিয়া ইউনির্ভাসিটির ট্রাস্টি বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেলেন এবং ২০২৩ সালে কো–চেয়ার নির্বাচিত হন। শিপম্যান কলম্বিয়া থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কলম্বিয়া কলেজ থেকে রাশিয়ান স্টাডিজে বিএ এবং স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স থেকে স্নাতকোত্তর করেন তিনি।
মেলানিয়ে উডিন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। উডিন পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৯৫ সালে বায়োলজিতে স্নাতক এবং ১৯৯৭ সালে জুলুজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর তিনি ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে পোস্টডক্টরাল অধ্যয়নের পর উডিন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে ২০১৭ সালে পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭তম প্রেসিডেন্ট হন লিন্ডা মিলস। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইন থেকে ইতিহাস এবং সামাজিক চিন্তাধারায় বিএ, সান ফ্রান্সিসকোর ক্যালিফোর্নিয়া কলেজ অফ দ্য ল থেকে জেডি, সান ফ্রান্সিসকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর এবং ব্র্যান্ডেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাস্থ্য নীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। লিন্ডা জি মিলস ১৯৯৯ সালে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সোশ্যাল ওয়ার্কে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত আছেন তিনি।
আন্না ফন্টকুবার্তা আই মোরাল ফিজিকস অ্যান্ড মেটারিয়াল ফিজিকসে পড়াশোনা করেন। স্পেনের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিকসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে প্যারিসের ইউনির্ভাসিটি প্যারিস–সুদ থেকে ইকোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন। মোরাল সুইজারল্যান্ডের ইকোল পলিটেকনিক ফেদেরাল দে লুজানে সেমিকন্ডাক্টর মেটেরিয়ালসের অধ্যাপক। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সেভেরিন ভার্মেইর ২০২৫ সালের আগস্টে জার্মানির কে ইউ লিউভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর হন। সেভেরিন ভার্মেইর ১৯৯৫ সালে কেইউ লিউভেন থেকে মেডিকেলে স্নাতক ডিগ্রি এবং ২০০১ সালে বায়োমেডিসিনে ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ২০০৫ সাল থেকে কেইউ লিউভেনের মেডিসিন অনুষদে অধ্যাপনা করছেন এবং ২০২০ সালে পূর্ণ অধ্যাপক হন। বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘গাট’, ‘জার্নাল অব ক্রোহনস’ এবং ‘কোলিটিস’-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।
ফ্রাউক মেলচিওর ২০২৩ সালের অক্টোবরে জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেক্টরের পদ গ্রহণ করেন। ছয় বছর এই পদে থাকবেন। ফ্রাউক মেলচিওর একজন বিজ্ঞানী। তিনি মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি গোটিনজেনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লা জোলায় অবস্থিত স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর তিনি ২০০৮ সালে জেডএমবিএইচ–এ (ZMBH) মলিকুলার বায়োলজির অধ্যাপক হিসেবে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োলজি অনুষদে যোগ দেন। ২০২১ সালের এপ্রিলে তিনি হেলমহোল্টজ অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম গবেষণা কেন্দ্র ফরশুংজেন্ট্রাম জুলিচে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন।