চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি নামমাত্র সক্রিয় রয়েছে
চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি নামমাত্র সক্রিয় রয়েছে

চলচ্চিত্রের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কী করেছে, কী করেনি

চলচ্চিত্র নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কী করেছে, কী করেনি; নতুন সরকারের সামনে কী কাজ? বিশ্লেষণ করলেন মকফুল হোসেন

চলচ্চিত্র বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ নিতে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর চলচ্চিত্রবিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি করেছিল বিগত সরকার। ২৩ সদস্যের কমিটির অন্তত ৫ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সদস্যরা বলছেন, পরামর্শক কমিটি নামমাত্র সক্রিয় রয়েছে। দু-একটি বাদে সদস্যদের কোনো পরামর্শই কাগজে-কলমে বাস্তবায়িত হয়নি।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা বলছেন, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কমিটির মধ্যে গা ছাড়া ভাব দেখা গেছে। দেড় বছরে চলচ্চিত্রের নীতিনির্ধারণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি এই কমিটি।

পরামর্শক কমিটির মেয়াদ আরও ছয় মাস রয়েছে। গত দেড় বছর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। নাহিদ ইসলামের মেয়াদে কমিটির দুটি বৈঠক হলেও পরে আর কোনো বৈঠক হয়নি।

পরামর্শক কমিটির এক সদস্যের অভিযোগ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্রকে তেমন অগ্রাধিকার দেয়নি।

পরামর্শক কমিটির মেয়াদ আরও ছয় মাস রয়েছে

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা বলছেন, চলচ্চিত্র নিয়ে বিগত উপদেষ্টাদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। মাসের পর মাস ধরে পরামর্শক কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। ফলে পরামর্শক কমিটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

পরামর্শক কমিটির আরেক সদস্যের ভাষ্য, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা, তবে বেশির ভাগই আমলে নেওয়া হয়নি। পদত্যাগও করতে চেয়েছিলেন তিনি।

একাধিক সদস্যের অভিযোগ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে পরামর্শক কমিটি প্রত্যাশিত কাজ করতে পারেনি। তবে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ নাকচ করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

ঢাকাই সিনেমার কতটা পরিবর্তন হলো? জানতে চাইলে ঢাকার এক শীর্ষ প্রযোজক প্রথম আলোকে জানান, তিনি কোনো পরিবর্তন দেখছেন না। দু-তিন বছর আগে চলচ্চিত্র যে জায়গায় ছিল, এখনো সে জায়গাতেই রয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্রকে তেমন অগ্রাধিকার দেয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন পরামর্শক কমিটির একাধিক সদস্য
ই-টিকেটিং, সিনেমা হল নির্মাণে ঋণ বণ্টন ও জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা সংস্কারে পরামর্শক কমিটি কোনো কাজ করেনি।

অন্তর্বর্তী সরকার কী করেছে, কী করেনি

ডামাডোলের মধ্যে পরামর্শক কমিটির দুই বৈঠকে পাঁচটি বিষয় উত্থাপন করেছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো—১. টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনতে ই-টিকেটিং কার্যকর; ২. সিনেমা হল নির্মাণে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ বণ্টন; ৩. বাংলাদেশ ফিল্ম সিটিকে কর্মমুখী করা; ৪. জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা সংস্কার এবং ৫. সার্টিফিকেশন বোর্ডের রেটিং প্রথা চালু।

পাঁচটি কাজের মধ্যে বেশির ভাগই কার্যকর করে যেতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। পরামর্শক কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য, ই-টিকেটিং, সিনেমা হল নির্মাণে ঋণ বণ্টন ও জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা সংস্কারে পরামর্শক কমিটি কোনো কাজ করেনি।

বাংলাদেশ ফিল্ম সিটিও পুরোপুরি কর্মমুখী হয়নি। তবে ফিল্ম সিটিতে সীমিত পরিসরে শুটিং শুরু হয়েছে।

সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনকে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেন্সর যুগের ইতি ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সার্টিফিকেশন বোর্ড করে সরকার। সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনকে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে দেড় বছরেও সার্টিফিকেশন আইনের বিধিমালা (রেটিং প্রথা) চূড়ান্ত হয়নি, ফলে এখনো সেন্সর আইনেই সিনেমা দেখছে সার্টিফিকেশন বোর্ড।

সরকার সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করল। পরে দেখা গেল, সেটা সেন্সর বোর্ডই। সার্টিফিকেশন শুধু নামেই এসেছে, কাজে সেটা দেখা যায়নি।
শিহাব শাহীন, নির্মাতা
সার্টিফিকেশন আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত করে যায়নি অন্তর্বর্তী সরকার

নির্মাতা শিহাব শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করল। পরে দেখা গেল, সেটা সেন্সর বোর্ডই। সার্টিফিকেশন শুধু নামেই এসেছে, কাজে সেটা দেখা যায়নি।’

বছরখানেক ধরে সার্টিফিকেশন আইনের বিধিমালা (রেটিং) ঝুলে রয়েছে। বিধিমালাটি চূড়ান্ত করে যায়নি অন্তর্বর্তী সরকার, ফলে এখনো কার্যকর হয়নি রেটিং প্রথা।

তবে সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনেও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তড়িঘড়ি ভাব দেখা গেছে। একাধিক সদস্য অভিযোগ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই বোর্ডে নাম দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে পদত্যাগও করেছেন।

এর বাইরে ‘চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান প্রদান নীতিমালা’ করেছে বিগত সরকার। নীতিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণায়ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। মেয়াদের শেষভাগে ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (চলচ্চিত্র-১) তসলিমা নূর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তিনি দায়িত্বে নতুন এসেছেন। পরামর্শক কমিটির কাজ নিয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।

‘চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান প্রদান নীতিমালা’ করেছে বিগত সরকার
২৩ সদস্যের কমিটিতে আ–আল মামুন, মুশফিকুর রহমান, তানিম নূর, আরিফুর রহমান, সাদিয়া খালিদসহ আরও অনেকে রয়েছেন
সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনেও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তড়িঘড়ি ভাব দেখা গেছে।

নতুন সরকারের সামনে কী কাজ

বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নিয়েছে গতকাল। নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা জানিয়ে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরামর্শক কমিটিকে কার্যকর করা দরকার। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে চলচ্চিত্র নিয়ে ৫ থেকে ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

প্রযোজকেরা বলছেন, ধুঁকতে থাকা ঢাকাই সিনেমাকে চাঙা করতে সিনেমার সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ জন্য অনুদানের বাইরে বাণিজ্যিক সিনেমার প্রযোজকদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার।

টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনতে নতুন সরকার ই-টিকেটিং কার্যকর করতে পারে।
শাহরিয়ার শাকিল, প্রযোজক

পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ দরকার। এ জন্য সিনেমা হল নির্মাণে এক হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল থেকে ঋণ বণ্টন আরও সহজ করার দাবি তুলেছেন হলমালিকেরা।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, কঠিন শর্তের বেড়াজালে ঋণ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল। ফলে গত দেড় বছরে কোনো হলের মালিক ঋণ পাননি। তিনি বলছেন, নতুন সরকার ঋণের শর্ত সহজ করলে হলের মালিকেরা উপকৃত হবেন। ঋণ পেলে মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যাও বাড়বে।

কঠিন শর্তের বেড়াজালে ঋণ তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটা বেশ জটিল।
আওলাদ হোসেন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক

মাল্টিপ্লেক্স বাড়লে ই-টিকেটিং কার্যকর করাও সহজ হবে বলে মনে করেন চলচ্চিত্র প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা আনতে নতুন সরকার ই-টিকেটিং কার্যকর করতে পারে। ফলে কত টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে, সেটা সহজেই জানা যাবে। প্রযোজক, পরিবেশকেরা উপকৃত হবেন, আবার ভ্যাট-ট্যাক্স থেকে সরকারও উপকৃত হবে।’

মাল্টিপ্লেক্স বাড়লে ই-টিকেটিং কার্যকর করাও সহজ হবে

পাশাপাশি বাংলাদেশ ফিল্ম সিটিকে কর্মমুখী করতে দুটি শুটিং ফ্লোর নির্মাণের পাশাপাশি ক্যামেরা কেনা দরকার বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ফিল্ম সিটিতে শুটিংয়ের জন্য বাইরে থেকে ক্যামেরা নিয়ে যেতে হয়। ফিল্ম সিটির জন্য ক্যামেরা কিনতে পারলে পুরোদমে শুটিং শুরু করা যাবে। পাশাপাশি এডিটিং স্টুডিও করা দরকার।

নতুন সরকার সার্টিফিকেশন বোর্ডের বিধিমালা চূড়ান্ত করলে সার্টিফিকেশন বোর্ডের কাজে গতিশীলতা ফিরবে। রেটিং প্রথা চালু হলে নির্মাতা-প্রযোজকদের ভোগান্তি কমবে।