
২০০৩ সালের এক শরতের রাত। সেই সময় মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি ছিলেন অসাধারণ কম্পিউটার প্রোগ্রামার। এ নিয়ে তাঁর ব্যাপক প্রশংসা ছিল। সেই রাতে নিজের কম্পিউটারের সামনে বসে নতুন একটি ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। ব্লগ লেখা ও প্রোগ্রামিংয়ের তীব্র ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে তাঁর ছাত্রাবাসের কক্ষ থেকে জন্ম নেয় নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম, যার নাম আজকের ‘ফেসবুক’।
এই ডিজিটাল বিপ্লবের পেছনে যে গল্পটি রয়েছে, তা কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়, এটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা ও ক্ষমতার গল্প। সেই গল্পকে ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যোগাযোগ, খবর জানা, মতপ্রকাশ—সবকিছু মিলে দূরত্বকে কমিয়ে আনার গল্পটি একসময় মানবিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়।
কীভাবে একজন শিক্ষার্থী ফেসবুক তৈরি করেন, সেই গল্প নিয়ে ১৬ বছর আগে ডেভিড ফিঞ্চার নির্মিত সিনেমাটি যেন এখন মানবিক সম্পর্কের প্রাসঙ্গিক গল্প। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি তুমুল আলোচনা তৈরি করে। সঙ্গে নিয়ে আসে বিতর্ক। সফলতার পেছনের এই বিতর্ক দর্শক নতুন করে ভাবিয়েছে।
ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা কে? শুরুতে কার উদ্যোগ ছিল? এ তথ্য তুলে ধরার কারণে সিনেমাটি দেখতেই চাননি স্বয়ং মার্ক জাকারবার্গ। সিনেমার শুরুতেই দেখা যায়, এডুয়ার্ডো সেভেরিন (অ্যান্ড্রু গারফিল্ড) ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান আর্থিক সহায়তাকারী ছিলেন। তিনি নিজের অর্থ বিনিয়োগ করে প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান বড় হতে থাকলে মার্ক জাকারবার্গ ক্রমে ব্যবসার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চান। এই পরিবর্তন বন্ধুত্বে প্রথম বড় ফাটল তৈরি করে, যাঁরা পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, বন্ধুত্বের টানাপোড়েন এবং জটিল আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে যান।
এই বিতর্ক সিনেমার দর্শক স্বাভাবিক ভাবে নেননি। সিনেমাটি যতই এগিয়ে চলে, ততই বোঝা যায়, বড় সাফল্য কখনো কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করে। মার্ক জাকারবার্গ বিশ্বকে সংযুক্ত করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেও সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারেননি। এ কারণেই চলচ্চিত্রটি শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়, বন্ধনের গল্প নয়; উচ্চাকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব এবং বন্ধুত্ব হারানোর গল্পও। বন্ধুত্ব হারালেও পিছপা হননি। একের পর এক তিনি এই প্ল্যাটফর্মের বিকাশ ঘটান। সিনেমা একইভাবে এসেছে মার্কের পরিশ্রমের গল্প। সেই মার্ক আজ ২২৮ বিলিয়ন ডলারের মালিক। অল্প সময়েই ফেসবুকের এই প্রতিষ্ঠাতা ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী বিলিয়নিয়ারের একজন হয়ে ওঠেন।
তবে এই দ্বন্দ্ব হয়তো আরও বাড়তে পারত। কারণ, শুটিংয়ের আগেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ১৭৮ পেজের চিত্রনাট্য থেকে ৩০ পেজ ফেলে দেয়। সমালোচকেরা মনে করেন, ফেলে দেওয়া অংশ হয়তো আরও বিতর্ক তৈরি করত। এই নিয়ে পরে অবশ্য পরিচালক ডেভিড বলেছিলেন, সিনেমার দৈর্ঘ্য কমাতে কিছু অংশ কাটছাঁট করেছেন।
মার্ক জাকারবার্গ চরিত্রে জেসি আইজেনবার্গের অভিনয় ছিল চলচ্চিত্রের প্রাণ। তিনি যেমন মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী, তেমনি সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর এবং আবেগ প্রকাশে অক্ষম দর্শকদের ভাবায়। তিনি প্রচলিত অর্থে নায়ক নন; বরং এমন এক চরিত্র, যাঁর সাফল্য একই সঙ্গে মুগ্ধতা ও অস্বস্তি তৈরি করে। বন্ধু এডুয়ার্ডো সেভেরিন চরিত্রের প্রতি দর্শকদের ভালোবাসা থাকলেও পরবর্তী সময়ে মার্কের সাফল্যের সংগ্রাম মানবিক আবেগের ভারসাম্য এনে দেয় গল্পে। সবশেষে সিনেমাটি এটাই মনে করিয়ে দেয়, তাঁদের বন্ধুত্বের ভাঙনই ছবির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক।
সিনেমাটির শেষ দৃশ্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। কোটি মানুষকে একত্র করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা একজন তরুণ, নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আশায় বন্ধুত্বের অনুরোধের জবাবের অপেক্ষায় থাকে। এই দৃশ্য পুরো সিনেমার মূল বক্তব্যকে একমুহূর্তে স্পষ্ট করে—প্রযুক্তি মানুষকে কাছে আনতে পারে, কিন্তু মানবিক সম্পর্কের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। কারণ, সম্পর্ককে পাশ কাটিয়ে নিজের মতো এগিয়ে চলেছিলেন মার্ক।
চলচ্চিত্রটি কোনো সরল জীবনীচিত্র নয়। এটি প্রযুক্তি ইতিহাসের তথ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে কিছু অসামঞ্জস্য থাকলেও শিল্পগত সত্যে সিনেমাটি খুবই শক্তিশালী। সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে এটি দেখায়, পৃথিবীকে সংযুক্ত করার স্বপ্ন কখনো কখনো মানুষকে আরও একা করে দেয়। যে কারণে সিনেমা পোস্টারে লেখা ছিল, ‘৫০ কোটি মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়তে গেলে পথেই কিছু শত্রু তৈরি হবেই।’
২০১৪ সালের এক প্রশ্নোত্তরে জাকারবার্গ জানান, বাস্তব গল্পটি হয়তো খুব সিনেম্যাটিক নয়। তিনি মন্তব্য করেন, সত্যিকার গল্প দেখালে হয়তো কেবল তাঁকে দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কোড লিখতে দেখা যেত—যা নাটকীয় চলচ্চিত্রের জন্য যথেষ্ট আকর্ষণীয় না–ও হতে পারত। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সিনেমায় এমন অনেক বিষয় যোগ করা হয়েছে, যা সত্য নয় এবং আমার কাছে কষ্টদায়ক মনে হয়েছিল।’
‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ সেই বছর আট শাখায় অস্কার মনোনয়ন পায়। সিনেমাটি তিনটি শাখায় অস্কার জয় করে। সিনেমার বাজেট ছিল চার কোটি ডলার। এটা আয় করে ২২ কোটি ডলার। আজ মার্ক জাকারবার্গের জন্মদিনে দেখে নিতে পারেন সিনেমাটি। মার্ক জাকারবার্গের জন্মদিন ১৪ মে ১৯৮৪ সালে। সিনেমাটির আইএমডিবি রেটিং ৭.৮। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটায়।
তথ্য: আইএমডিবি, ভ্যারাইটি, দ্য হলিউড রিপোর্টার।