
(লেখাটিতে হালকা স্পয়লার আছে)
মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স গত কয়েক বছরে গল্পের পরিধি যতই বাড়িয়েছে, ততই যেন তার সিনেমাগুলো সাধারণ মানুষের আবেগের জায়গা থেকে দূরে সরে গেছে। একের পর এক মাল্টিভার্স, পৃথিবী ধ্বংসের হুমকি আর পরের সিনেমার জন্য অসংখ্য ইঙ্গিত দিতে গিয়ে সুপারহিরো গল্পগুলোও অনেকটা একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ সেই জায়গা থেকে একটু সরে এসে আবার ফিরে গেছে স্পাইডার-ম্যানের সবচেয়ে পরিচিত জায়গায়—সুপারহিরোর আড়ালে থাকা মানুষটির কাছে। সেটাই হয়তো মুগ্ধ করেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ‘স্পাইডার-ম্যান’ ভক্তদের। মাত্র ১০ দিনেই সিনেমাটি আয় করেছে ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা)। বাংলাদেশেও মুক্তির পর হুলুস্থুল—এক সপ্তাহর বেশি ধরে টিকিট ছিল ‘সোল্ড আউট’।
একনজরেসিনেমা: ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ধরন: সুপারহিরো, অ্যাকশন, ড্রামাপরিচালক: ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্র্যাটনচিত্রনাট্য: ক্রিস ম্যাককেনা, এরিক সামার্সঅভিনয়ে: টম হল্যান্ড, জেনডায়া, স্যাডি সিঙ্ক, জ্যাকব ব্যাটালন, জন বার্নথাল, মার্ক রুফালো, ফ্লোরেন্স পিউ, ট্রামেল টিলম্যান, লিজা কোলন-জায়াস, মাইকেল মান্ডোদৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট
২০২১ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর শেষে পৃথিবীকে বাঁচাতে পিটার পার্কারকে নিজের পরিচয় সবার স্মৃতি থেকে মুছে দিতে হয়েছিল। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের জাদুর পর সবাই স্পাইডার-ম্যানকে মনে রাখলেও পিটারকে (টম হল্যান্ড) আর কেউ মনে রাখেনি। নেড (জ্যাকব ব্যাটালন) ও এমজে (জেনডায়া), তার সবচেয়ে কাছের দুই মানুষও জানে না যে একসময় পিটার তাদের জীবনের এতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
সেই ঘটনার কয়েক বছর পরের গল্প ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’। এবারের গল্পে তিন স্পাইডার-ম্যান বা পুরোনো ভিলেনদের পুনর্মিলন নেই। পিটারকে দেখা যায় স্পাইডার-ম্যান হিসেবে নিউইয়র্কের রাস্তায় অপরাধ দমন করছে, পুলিশকে সাহায্য করেছে। নিউইয়র্কবাসীর কাছে স্পাইডার-ম্যান এখনো জনপ্রিয়। অপরাধ দমন করে শহরের মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছেন তিনি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন প্রায় শূন্য। নিজের পরিচয়ও এখন আবার গোপন। অথচ যাঁদের তিনি ভালোবাসেন, তাঁদের কথা ভুলতে পারছেন না। সারা দিনের ব্যস্ততার পরে রাতে তাঁকে ঘিরে ধরে একাকিত্ব। রাতে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেড ও এমজের জীবন দূর থেকে দেখেন।
এর মধ্যেই দীর্ঘদিনের একাকিত্ব তাঁর শরীর ও ক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে তাঁর স্পাইডার-ক্ষমতা। ফলে পিটারকে এবার শুধু নতুন শত্রুর মোকাবিলা করলেই হচ্ছে না; তাঁকে বুঝতে হচ্ছে নিজের শরীরে আসলে কী ঘটছে এবং কেন। এই দুই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’র গল্প এগোতে থাকে। আর তখনই নিউইয়র্কে দেখা দেয় এক রহস্যময় শত্রু, যে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং এক শরীর থেকে অন্য শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ড্যামেজ কন্ট্রোলের কর্মকাণ্ড ও স্করপিয়নের উপস্থিতির সঙ্গে এই রহস্যের যোগসূত্রও ধীরে ধীরে সামনে আসে।
এ সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি পিটার পার্কার। আগের সিনেমাগুলোর চঞ্চল ও হাসিখুশি পিটারের তুলনায় এবার তাঁকে অনেক বেশি পরিণত, চুপচাপ। মূলত নিজের পরিচয় হারানোর পর নেড ও এমজেকে দূর থেকে দেখেও তাদের জীবনে ফিরতে না পারার কষ্ট হল্যান্ড খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্পাইডার-ম্যানের অ্যাকশনের চেয়ে পিটার পার্কারের ভেতরের দ্বন্দ্বেই তাঁর অভিনয়ে বেশি নজর কেড়েছে। কিন্তু টম হল্যান্ডকে সারাক্ষণ সুপারহিরো চরিত্রের শারীরিক ভঙ্গি, অ্যাকশন ও আবেগের মধ্যে থাকতে হয়েছে। ফলে তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির পরিণত বয়সের জটিলতা সব সময় সমানভাবে ফুটে ওঠেনি।
জেনডায়া সেখানে অনেক বেশি স্বাভাবিক। তাঁর অভিনয়ে আছে স্বতঃস্ফূর্ততা, আত্মবিশ্বাস ও পরিণতবোধ। খুব বেশি চেষ্টা না করেও তিনি দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। বিশেষ করে পিটারের সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি দৃশ্যগুলোয় ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়। জ্যাকব ব্যাটালনও সহজাত অভিনয় করেছেন। পিটারের হারিয়ে যাওয়া জীবনের দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তাদের সঙ্গে পিটারের দূরত্বের মধ্যেও আগের সম্পর্কের একটা ছাপ রয়েছে। গল্প যখনই আবেগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, নেড চরিত্রে তাঁর কমিক টাইমিং সেটা হালকা করেছে।
খলচরিত্রে জিন গ্রে (স্যাডি সিঙ্ক) সিনেমার অন্যতম বড় চমক। শুরুতে তাকে এমন একজন শক্তিশালী ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়। নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে সে মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ফলে স্পাইডার-ম্যানের জন্য তাকে মোকাবিলা করা অন্য যেকোনো শত্রুর চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে। তবে চরিত্রটিকে শুধু শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়নি; তার আচরণের নানা পরিবর্তন পর্দায় দেখতে পান দর্শকেরা। স্যাডি সিঙ্ক এই পরিবর্তনগুলো খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর কারণে সিঙ্কের এ ধরনের অভিনয় দর্শকের কাছে পরিচিত হলেও এখানে তিনি নিজেকে ভিন্নভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। তবে তাঁর চরিত্রটি নিয়ে কিন্তু আছে। জিন আসলে পুরোপুরি ভিলেন নয়; তার উদ্দেশ্যের মধ্যে আছে নৈতিকতা, সহানুভূতি ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণা। অর্থাৎ দর্শকের ঘৃণা পাওয়ার বদলে তার প্রতি সহানুভূতি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—একজন ভিলেনের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াই যদি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা ও সহানুভূতির জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই লড়াইয়ের অর্থ কী?
ব্রুস ব্যানার/হাল্ক (মার্ক রুফালো) এবার পিটারের জীবনে একজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতার মতো কাজ করেছেন। অন্যদিকে ফ্র্যাঙ্ক ক্যাসেল/দ্য পানিশারের (জন বার্নথাল) নির্মম ভাব এবং পরবর্তী সময়ে পিটারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি বেশ উপভোগ্য ছিল। আর ইয়েলেনা বেলোভা/ব্ল্যাক উইডো (ফ্লোরেন্স পিউ) তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে থাকলেও পিটারের বিভিন্ন মিশনে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি প্রাণবন্ত উপস্থিতি সিনেমার গম্ভীর আবহে কিছুটা হালকা ভাব যোগ করেছে।
পরিচালক ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্র্যাটন ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-তে স্পাইডার-ম্যানকে আগের সিনেমাগুলোর তুলনায় একটু ভিন্নভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এখানে মাল্টিভার্স বা বড় কোনো বিশ্বসংকটের চেয়ে পিটার পার্কারের ব্যক্তিগত জীবন, একাকিত্ব এবং মানসিক পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি ভালো হলেও সমস্যা হলো, গল্পের সেই আবেগপ্রবণ দিক শেষ পর্যন্ত গভীরভাবে দাগ কাটতে পারে না। সিনেমার কিছু জায়গায় চরিত্রের আবেগকে সময় দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব দ্রুত এগিয়ে গেছে।
চিত্রগ্রাহক ব্রেট পাওলাকের কাজ সিনেমাটির অন্যতম ভালো দিক। ১.৯০: ১ আসপেক্ট রেশিওতে ধারণ করা ফ্রেমে ক্ল্যাসিক স্পাইডার-ম্যান কমিকের একটা ছাপ রয়েছে। নিউইয়র্কের উঁচু ভবন, সরু রাস্তা ও শহরের ওপর দিয়ে স্পাইডার-ম্যানের দোল খাওয়ার দৃশ্যগুলো দেখতে বেশ সুন্দর। মেঘলা আকাশ, কম আলো এবং তুলনামূলক গাঢ় ভিজ্যুয়াল টোন পিটারের একাকিত্বের সঙ্গেও ভালোভাবে মানিয়ে যায়।
সাম্প্রতিক অনেক সুপারহিরো সিনেমার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিরিক্ত সিজিআই ও ধ্বংসযজ্ঞ। একের পর এক বিস্ফোরণ, শহর ধ্বংস, বিশাল ডিজিটাল দানব—সব মিলিয়ে দর্শকের মধ্যে একধরনের ‘সুপারহিরো ক্লান্তি’ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সিনেমা সে পথে হাঁটেনি। ছবিতে অ্যাকশন কম, কিন্তু যা আছে সেটা বেশ উপভোগ্য।
মিলিটারি ট্যাংকের সঙ্গে স্পাইডার-ম্যানের লড়াই, স্করপিয়নের সঙ্গে সংঘর্ষ ও দ্য হ্যান্ডের নিনজাদের সঙ্গে মারামারি বেশ উপভোগ্য। ক্র্যাটনের আগের সিনেমা ‘শান-চি অ্যান্ড দ্য লেজেন্ড অব দ্য টেন রিংস’-এর মতো এখানেও মার্শাল আর্ট কোরিওগ্রাফিতে তার দক্ষতার ছাপ দেখা যায়। ক্যামেরার মুভমেন্ট দারুণ এবং স্পাইডার-ম্যানের ওয়েব-স্লিংগিং এখনও আগের মতোই মজার। একটি স্পাইডার-ম্যান সিনেমা হিসেবে দর্শক যে ধরনের ‘ওয়াও মোমেন্ট’ আশা করেন, সিনেমাটি সেখানে নিজেকে আলাদাভাবে তুলে ধরতে পারেনি। ফলে অ্যাকশন খারাপ না হলেও এটিকে সিনেমার বড় শক্তি বলা কঠিন। মাইকেল জ্যাকিয়ানোর আবহসংগীত সিনেমার আবহ তৈরিতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। পিটারের একাকিত্ব, অস্বস্তি ও আবেগের মুহূর্তগুলোয় আবহসংগীত ছিল মানানসই।
তবে সিনেমাটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সমন্বয়হীনতা। প্রায় আড়াই ঘণ্টার গল্পে পিটারের একাকিত্ব, নতুন শত্রু ও তার ক্ষমতার পরিবর্তন একসঙ্গে এসেছে। ফলে কিছু জায়গায় গল্প ধীর মনে হয়েছে, আবার কিছু বিষয় প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত শেষ হয়েছে। কয়েকটি সাবপ্লটও মূল গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মিশতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের আরেকটি পরিচিত সমস্যা—পরের সিনেমার জন্য আগেই গল্পের জায়গা তৈরি করে রাখা। নতুন-পুরোনো চরিত্র ও ভবিষ্যতের নানা ইঙ্গিতের কারণে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ নিজের গল্প বলার পাশাপাশি পরের গল্পের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। একদিকে সিনেমাটি মাল্টিভার্সের জটিলতা থেকে বেরিয়ে পিটার পার্কারের ব্যক্তিগত গল্পে ফিরতে চেয়েছে, অন্যদিকে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের গতানুগতিক দুনিয়া থেকেও পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
আর এখানেই সিনেমাটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া হাইপ আর সিনেমাটির বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়। ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর সাফল্য, পাঁচ বছরের অপেক্ষা মিলিয়ে প্রত্যাশা ছিল বড়। কিন্তু সেই তুলনায় সিনেমাটির গল্প ও নির্মাণ বেশ পরিচিতই মনে হয়েছে। ‘প্রজেক্ট হেইল ম্যারি’র মতো একই সময়ের একটি সিনেমা যেখানে গল্প, আবেগ ও নতুনত্ব দিয়ে দর্শককে বেশি চমক দিতে পেরেছে, সেখানে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ অনেকটাই নিরাপদ পথে হেঁটেছে।
পরিণত পিটার পার্কারকে তুলে ধরার চেষ্টা থাকলেও সেই গল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি। অভিনয়, ভিজ্যুয়াল ও অ্যাকশন ভালো হলেও সব মিলিয়ে এমন কোনো সিনেমা তৈরি হয়নি, যা ‘স্পাইডার-ম্যান’–এর সেরা সিনেমাগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারে। নতুন এই ‘স্পাইডার-ম্যান’ সিনেমা উপভোগ্য, কিন্তু নামের মতো ‘ব্র্যান্ড নিউ’ হয়ে উঠতে পারেনি।