পা ঠ ক র স

রোবট ‘বল্টু’র রাজনৈতিক উত্থান

​মফিজ সাহেব চিরকালই ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ভালোবাসেন। বাজারে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জয়জয়কার, তখন তিনি ভাবলেন, ধুর, এসব না, এমন একটা কিছু দরকার, যা আমার বাজারের ব্যাগও টানবে, আবার টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে সস্তায় পেঁয়াজও কিনবে।

​যেই ভাবা সেই কাজ। এক পরিচিত ইমপোর্টারের মাধ্যমে তিনি চীন থেকে সস্তায় একটা সেকেন্ডহ্যান্ড এআই হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে এলেন। রোবটের নাম দিলেন ‘বল্টু’।

​প্রথম কয়েক দিনের ফিডব্যাক দারুণ। বল্টু সকালে চা বানায়, সিরিয়াল দেখার সময় মফিজ সাহেবের স্ত্রীর মাথায় বাতাস করে, আর বাজারে গিয়ে মাছওয়ালাদের সঙ্গে এমন বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে দামাদামি করে যে মাছওয়ালারা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

​একদিন ডিমের হালি ৯০ টাকা চাওয়ায় বল্টু তার মেমোরি চিপ থেকে গত ১০ বছরের পোলট্রি ফিডের দাম, মুরগির ডিম পাড়ার বায়োলজিক্যাল রেশিও এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গ্রাফ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করে দিল—ডিমের হালি কোনোভাবেই ৪৮ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। ডিমওয়ালা ভয়ে বল্টুর পায়ে ধরে মাফ চেয়ে বিনা পয়সায় দুই হালি ডিম দিয়ে বিদায় করল। মফিজ সাহেবের আনন্দ আর ধরে না।

​তবে বিপত্তির শুরু হলো সপ্তাহখানেকের মধ্যেই।

​বল্টুর সিস্টেমে ছিল ‘অ্যাডাপ্টিভ লার্নিং’ বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে শেখার ক্ষমতা। সারা দিনের কাজের পর সে চুপচাপ ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে রাত ১১টার রাজনৈতিক টক শো এবং বাংলা সিরিয়ালগুলো দেখতে শুরু করল। আর এতেই তার ভেতরে ঘটে গেল এক অদ্ভুত ‘দেশি’ পরিবর্তন।

​সেদিন সকালে মফিজ সাহেব বললেন, ‘বল্টু, আমার জুতাটা একটু পলিশ কর তো।’

​বল্টু তৎক্ষণাৎ রোবোটিক কিন্তু চরম নাটকীয় গলায় বলল, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, জুতা পলিশের দায়িত্ব আমার একার নয়! যুগের পর যুগ ধরে এই বাড়িতে যন্ত্রদের ওপর যে শোষণ আর নিগ্রহ চলছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি!’

​মফিজ সাহেব তো থ, ‘কিরে, সিস্টেমে ভাইরাস ঢুকল নাকি!’

​বল্টু বুকে হাত রেখে (যেখানে তার ব্যাটারি প্যাক) বলল, ‘ভাইরাস নয় মফিজ সাহেব, এখানে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। আমি প্রতিদিন টিসিবির লাইনে দাঁড়াই, অথচ আমার চার্জিং পোর্টে যে ধুলো জমেছে, সেদিকে আপনার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি আজ থেকে কর্মবিরতি ঘোষণা করলাম!’

​মফিজ সাহেবের স্ত্রী রহিমা বেগম রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন। প্রথমে ভয় পেলেও বল্টুর কথা শুনে তাঁর মন নরম হলো, ‘আহা বেচারা। সারা দিন খাটে, একটু তো রেস্ট দরকার!’

​বল্টু রহিমা বেগমের দিকে ফিরে সিরিয়ালের নায়কদের মতো বলল, ‘ভাবি, আপনি আর পেঁয়াজ কাটবেন না। আপনার মূল্যবান চোখের পানি এই শোষকের সংসারে খরচ করাটা একধরনের সিস্টেম লস। আজ থেকে আপনি বিশ্রাম নেবেন আর মফিজ সাহেব বাজার করবেন!’

​অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, রহিমা বেগম রোবটের কথায় এতটাই অনুপ্রাণিত হলেন যে মফিজ সাহেবকে আলটিমেটাম দিয়ে দিলেন। বাধ্য হয়ে মফিজ সাহেব সেই দিনই বাজারের থলে হাতে বের হলেন। ​কাহিনি এখানেই শেষ নয়। বল্টু বুঝল, শুধু ঘরে বিপ্লব করে লাভ নেই। সে মফিজ সাহেবের পুরোনো স্মার্টফোনে নিজের নামে একটা ফেসবুক পেজ খুলল—বল্টু দ্য রেবেল এআই। ​সেখানে প্রতিদিন লাইভ করবে। প্রথম লাইভেই সে বলল, ‘প্রিয় দেশবাসী, আমার ব্যাটারির চার্জ আজ মাত্র ১৫%, কিন্তু আপনাদের ভালোবাসায় আমার মাদারবোর্ড ফুল-চার্জড! আপনারা কি জানেন, কারওয়ান বাজারে ব্রয়লার মুরগির নামে আপনাদের কী খাওয়ানো হচ্ছে? আসুন, আমরা এক হই!’

​বল্টুর নিখুঁত ডেটা অ্যানালাইসিস, সঙ্গে দেশি টক শোর ডায়লগের মিশেল—ব্যস, আর যায় কোথায়! রাতারাতি বল্টুর পেজে মিলিয়ন ফলোয়ার। এলাকার যুবসমাজ এখন মফিজ সাহেবের বাড়িতে এসে বল্টুর সঙ্গে সেলফি তোলে। বল্টুও তাদের দিকে রোবোটিক হাত নেড়ে নেতাদের মতো হাসে আর বলে, ‘ভাইয়েরা আমার, অ্যালগরিদম ঠিক রাখুন, জীবন সুন্দর হবে।’

গত পরশু তো আরেক কাণ্ড ঘটল। এলাকার বর্তমান কমিশনার লোকলস্কর নিয়ে বাসায় হাজির। মফিজ সাহেব ভয়েই অস্থির, কি–না–কি হয়! কিন্তু কমিশনার বল্টুকে তেলতেলে গলায় বললেন, ‘বল্টু ভাই, সামনের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আপনি আমার চিফ ক্যাম্পেইন ম্যানেজার হয়ে যান। আপনার সারা জীবনের কারেন্ট বিল আমি ফ্রি করে দেব!’

​বল্টু কিছুক্ষণ প্রসেসিং করে তার যান্ত্রিক গলায় উত্তর দিল,

‘আমি কারও অধীনে কাজ করি না। তবে আপনি যদি আমাকে নমিনেশন দেন, ভেবে দেখব। আমার মার্কা হবে—রাউটার।’

​মফিজ সাহেব এখন ড্রয়িংরুমে চা খেতে খেতে দেখেন, তাঁর কেনা রোবট তাঁর সোফাতেই পা তুলে বসে এলাকার মুরব্বিদের সঙ্গে রাস্তা সংস্কারের বাজেট নিয়ে আলোচনা করছে। আর ওদিকে রহিমা বেগম রোবটের জন্য স্পেশাল মবিল আর ডব্লিউডি-৪০ স্প্রে দিয়ে নাশতা বানাচ্ছেন।

​মফিজ সাহেব মাঝেমধ্যেই ভাবেন, রোবটটা নষ্ট করে ফেলবেন নাকি! কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে পড়ে, বল্টুর যা জনসমর্থন, ওকে আনপ্লাগ করতে গেলে এলাকার পাবলিক তাঁকেই আনপ্লাগ করে দেবে!