গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত অসহায় রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন অনেকে
গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত অসহায় রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন অনেকে

চিকিৎসকের এক স্ট্যাটাসেই ক্যানসার রোগীদের পাশে অনেক সহমর্মী

নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য অনেক প্রার্থীকে ক্রাউড ফান্ডিং করতে দেখে অনেকটা মজার ছলেই ফেসবুকে অর্থসহায়তা চেয়েছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং রক্তরোগ ও রক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গুলজার হোসেন। তাঁকে অবাক করে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়াতে অনেকেই পাঠাতে থাকেন অর্থসহায়তা।

৫ জানুয়ারি স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম—

‘প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। সামনে নির্বাচন। অনেক তরুণ, নতুন মুখ নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন। দেশকে, দেশের রাজনীতিকে বদলে দিতে চান তাঁরা। আপনারা তাঁদের সমর্থন দিচ্ছেন। ভালোবাসা, দোয়া ও আশীর্বাদ দিচ্ছেন।

এ বছর অনেকেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েই জনগণের কাছে টাকা চাচ্ছেন। এর নাম ক্রাউড ফান্ডিং।...

ক্রাউড ফান্ডিংয়ের এই ধারণা আমাকেও উদ্বুদ্ধ করেছে।

না, আমি নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছি না। রাজনীতি আমার কাজ না। দেশ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও আমার নেই। ওসব অনেক ওপরের লেভেলের কাজ। আমি একজন সামান্য চিকিৎসক।

প্রিয় দেশবাসী, আমি ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা করে থাকি। আমার রোগীরা মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। আমি যেসব হাসপাতালে কাজ করি, বড়লোকেরা সেসব হাসপাতালে যানও না।

আমার রোগীদের একটা বড় অংশ চিকিৎসার মাঝপথে হারিয়ে যান মূলত অর্থের অভাবে। ভালো হয়ে যেতে পারতেন, এমন রোগীরা চিকিৎসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

গত ছয় বছরে এমন অসংখ্য বেদনাদায়ক স্মৃতি আমার আছে।

ভাবছি আমিও ক্রাউড ফান্ডিংয়ে নামব। আমার রোগীদের জন্য আমি এই ডিজিটাল ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করব। সামাজিক মাধ্যমে বিকাশ নাম্বার দেব। কেউ যদি আমাকে ‘বিকাশ গুলজার’ বলেন আমি আপত্তি করব না।...

ব্লাড ক্যানসারের রোগীদের অনেক খরচ। তাসনিম জারা যে ৪৭ লক্ষ টাকা পেয়েছেন, এই পরিমাণ টাকা পেলে কমপক্ষে ২০ জন ব্লাড ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা খরচ হয়ে যেত।

শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করব। কেউ চাইলে নিজে এসে দেখে যেতে পারবেন কোন রোগীকে কত টাকা দেওয়া হচ্ছে।

আমার ঘোষণায় কোনো স্টান্ট নেই। ফাঁকা আওয়াজ নেই। কারণ, আমার কাজের ক্ষেত্র সকলেরই জানা।

কোনো কিছু বদলে দেওয়ার মতো হাইপোথেটিক্যাল ইস্যু আমার নেই। আমার ক্ষেত্রটি খুবই স্পষ্ট এবং প্র্যাকটিক্যাল। কিছু মানুষের জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে আপনি আমার সঙ্গে এসে দাঁড়াবেন। মানুষটি বেঁচে গেলে আমাদের আনন্দ হবে। না বাঁচলেও আমরা বলতে পারব, ‘আমরা তাকে একা ছেড়ে দিইনি।’

কেমন হবে কাজটা বলুন তো?’

এই স্ট্যাটাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলাম আমার বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর। অ্যাকাউন্ট দুটিকে আলাদা করে রেখেছি। আগেই ব্যক্তিগত টাকা সরিয়ে নিয়েছি। এই দুই হিসাবে সব মিলিয়ে ৬ জানুয়ারি অবধি সংগ্রহ ৩ লাখের ওপর। এখন টাকা যা আসবে গরিব রোগীদের হাতে তুলে দেব।

সহায়তার জন্য পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে আপাতত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে আমার যে ব্লাড ক্যানসারের রোগীরা আছেন, তাঁদের নিয়েই কাজটা শুরু করছি। এটি একটা ট্রাস্টি হাসপাতাল। মূলত দরিদ্র রোগীদের জন্যই ওই হাসপাতাল।

প্রশ্ন করতে পারেন, চাকরিসূত্রে আমি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিজি হাসপাতাল) সহকারী অধ্যাপক। সেখানে নয় কেন?

পিজি হাসপাতাল বড় প্রতিষ্ঠান। সেখানে হুট করে এ রকম কাজ শুরু করা কঠিন। তা ছাড়া ওখানে রোগী অনেক। ফান্ড খুব বড় না হলে হালকা ঝামেলাতেও পড়তে পারি। তবে করা যাবেই না, তেমনও নয়।

প্রথম রোগী হিসেবে একজনকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। তাঁর আগামী দুই মাসের কেমোথেরাপির বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। অথচ ভদ্রলোক ভেবেছিলেন চিকিৎসা ব্যয় হয়তো আর টানতেই পারবেন না। মন খারাপ করে বলছিলেন, ‘স্যার, আর তো পারতেছি না। বাড়ি যাই। দেখি কিছু ব্যবস্থা হয় কি না।’

এই যে অনিশ্চিত পথে যাত্রা করা মানুষটা আশার আলো দেখলেন, আশায় বুক বাঁধতে পারলেন, এর মূল্য কী দিয়ে হবে, আমি জানি না। এরপর আরও দুজন সহায়তা পাবেন। তাঁরা কতটা হকচকিত হয়ে আমাদের দিকে তাকাবেন, মনে মনে সেই দৃশ্যটাই কল্পনা করছি।