ত্বক মেঘের মতো নরম, হালকা ও মোলায়েম দেখানোর কৌশলই ক্লাউডি মেকআপ
ত্বক মেঘের মতো নরম, হালকা ও মোলায়েম দেখানোর কৌশলই ক্লাউডি মেকআপ

বর্ষায় মেকআপের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো সামলাবেন কীভাবে

বর্ষার আর্দ্রতা, ঘাম আর হঠাৎ বৃষ্টি মেকআপপ্রেমীদের জন্য বাড়তি সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। তবে ত্বকের ধরন বুঝে সঠিক প্রসাধনী ও কৌশল বেছে নিলে এই মৌসুমেও পাওয়া যায় সতেজ, আরামদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী সাজ। বর্ষার মেকআপ নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন শোভন মেকওভার বিউটি ক্লিনিক অ্যান্ড মেকওভার স্যালনের কসমেটোলজিস্ট ও স্বত্বাধিকারী শোভন সাহা।

প্রশ্ন

বর্ষায় মেকআপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী

মেকআপ দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখাটাই সমস্যা। গরম, ঘাম, আর্দ্রতা ও হঠাৎ বৃষ্টিতে একই প্রসাধনী সবার ত্বকে একইভাবে কাজ করে না। তাই বাজারে অনেক প্রসাধনী থাকলেও কেনার আগে নিজের ত্বকের সঙ্গে মানাচ্ছে কি না, দেখে যাচাই করা জরুরি।

প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক মেকআপ টিউটোরিয়ালে যে বর্ষার লুক দেখা যায়, তা কি বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বাস্তবসম্মত?

বর্ষায় শুধু পানিনিরোধক নয়, ত্বক অনুযায়ী ঘামনিরোধক পণ্যও বেছে নেওয়া জরুরি

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন বর্ষার জনপ্রিয় মেকআপ ট্রেন্ডগুলোর একটি হলো ক্লাউডি স্কিন। ত্বক মেঘের মতো নরম, হালকা ও মোলায়েম দেখানোর কৌশলই ক্লাউডি মেকআপ। তবে এই লুকের জন্য ত্বকের সঠিক যত্ন জরুরি। সানট্যান, দাগ, ব্রণ বা অসমান টোন ঢাকতে গেলে মেকআপের স্তর ভারী হয়ে যায়। ত্বক ভালো থাকলে হালকা ফাউন্ডেশন, গ্লোয়িং সিরাম বা টিনটেড বেসেই বর্ষার লুক সুন্দরভাবে তৈরি করা যায়।

প্রশ্ন

আমাদের জন্য কি শুধু পানিনিরোধকই যথেষ্ট, নাকি ঘামনিরোধক বা হিউমিডিটি-রেজিস্ট্যান্টও জরুরি?

পানিনিরোধক প্রসাধনী মানেই মেকআপ না ওঠার নিশ্চয়তা নয়। তৈলাক্ত ত্বকে তেলসমৃদ্ধ পানিনিরোধক ফাউন্ডেশন ব্যবহার করলে সেটি ত্বকের নিজস্ব তেলের সঙ্গে মিশে আরও দ্রুত উঠে যেতে পারে। ব্রণ, অতিরিক্ত সেবাম বা খোলা রোমকূপ থাকলে পানিনিরোধক মেকআপ টেকে না। তাই বর্ষায় শুধু পানিনিরোধক নয়, ত্বক অনুযায়ী ঘামনিরোধক পণ্যও বেছে নেওয়া জরুরি।

প্রশ্ন

বর্ষায় বেস মেকআপের আদর্শ ফিনিশ কী হওয়া উচিত—ডিউই, সফট ম্যাট, সেমি-ম্যাট, নাকি ন্যাচারাল স্কিন ফিনিশ?

বর্ষার বেজ মেকআপে ফিনিশ নির্ভর করবে ত্বকের ধরনের ওপর। তৈলাক্ত ত্বকে ফাউন্ডেশনের পরে লুজ পাউডার বা কমপ্যাক্ট পাউডার দিয়ে সেট করা ভালো। শুষ্ক ত্বকে এই ধাপ বাদ দেওয়া যায়। কারণ, অতিরিক্ত পাউডার কেকি দেখাতে পারে। মেকআপ শেষে ফিক্সার বা সেটিং স্প্রে ব্যবহার করলে বেজ দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে সাহায্য করে।

বর্ষায় মাসকারা অবশ্যই পানিনিরোধী হতে হবে
প্রশ্ন

বর্ষায় মাসকারা কি অবশ্যই পানিনিরোধক হওয়া উচিত?

বর্ষায় মাসকারা অবশ্যই পানিনিরোধী হতে হবে। তবে যেকোনো পানিনিরোধী প্রসাধনী তোলার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ জরুরি। পানিনিরোধী মাসকারা বা অন্যান্য প্রসাধনী তুলতে খুব ভালো মানের মেকআপ রিমুভার ব্যবহার করবেন। এরপর চেক করে নেবেন আসলেই সব মেকআপ ঠিকমতো উঠেছে কি না। এ জন্য রিমুভার ব্যবহার করে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ভালোমতো ধুয়ে নেবেন। তারপর একটি সাদা টিস্যু মুখে চেপে ধরে দেখে নেবেন মেকআপের কোনো চিহ্ন আছে কি না। থেকে গেলে আবার পরিষ্কার করে নেবেন। প্রতিদিন মেকআপ ব্যবহার করলে ত্বকের ক্ষতি হয় না। ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে, ত্বকে থেকে গেলে তা আপনার ক্ষতি করবে।

প্রশ্ন

ভ্যাপসা গরমে ময়েশ্চারাইজার ত্বককে কি আরও তৈলাক্ত করে?

ময়েশ্চারাইজার ত্বকের জন্য সারা বছরই জরুরি। তবে শীতের ভারী ক্রিম গরমে ব্যবহার করলে ত্বক অবশ্যই তেলতেলে দেখাতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে, মৌসুম অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজারও আলাদা হয়। সামার বা ভ্যাপসা গরমের জন্য ওয়াটারবেজড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকে অস্বস্তি তৈরি হয় না; বরং ত্বক কোমল ও ব্যালান্সড থাকে।

প্রশ্ন

বর্ষার জন্য কোন ধরনের সানস্ক্রিন ভালো?

বর্ষায় সানস্ক্রিন অবশ্যই জরুরি। কারণ, মেঘলা আকাশেও ইউভি বা অতিবেগুনি রশ্মি থাকে। আর্দ্রতা ও ইউভি ইনডেস্ক ফোনের আবহাওয়ার অ্যাপেই দেখা যায়। সমুদ্রকূলবর্তী এলাকায় বর্ষাতেও ট্যান বেশি হয়, তাই বাইরে গেলে সানব্লক ব্যবহার করতে হবে। গরম, ঘাম ও বৃষ্টিতে সানস্ক্রিন উঠে যেতে পারে, তাই ম্যাটফিনিশ পানিনিরোধী বা লম্বা সময় থাকবে এমন সানব্লক দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পরপর লাগানো ভালো। নিজের ত্বকের ধরন ও প্রোডাক্টের উপকরণ দেখে সানব্লক বেছে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

পুরো সাজের সঙ্গে রঙের ভারসাম্য রাখলেই রঙিন চোখের সাজ অতিরিক্ত না দেখিয়ে স্মার্ট লাগবে
প্রশ্ন

বর্ষায় ভারী ফাউন্ডেশন ছাড়াও স্কিন টিন্ট, টিনটেড এসপিএফ, বিবি ক্রিম বা সিসি ক্রিম, এর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে স্মার্ট পছন্দ?

ফাউন্ডেশনের বদলে স্কিন টিন্ট, টিনটেড এসপিএফ, বিবি ক্রিম বা সিসি ক্রিম—সবই ব্যবহার করা যায়, যদি তা ত্বকের সঙ্গে মানানসই হয়। বর্ষায় সবার ত্বক তৈলাক্ত হয় না; কারও কারও ত্বক শুষ্কও থাকে। বয়স, ত্বকের ধরন ও ত্বকের বর্তমান অবস্থার ওপর পণ্য নির্বাচন নির্ভর করে। তাই সবচেয়ে স্মার্ট পছন্দ হলো নিজের ত্বকের জন্য আরামদায়ক ও হালকা কাভারেজ দেয়, এমন পণ্য বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন

কম পণ্য, পাতলা স্তর—এই কৌশল কি বর্ষায় ভালো? কীভাবে সঠিকভাবে লাগাবে?

কম পণ্য, পাতলা স্তর এখনকার একটি কার্যকর কৌশল, তবে এ জন্য ত্বক সুস্থ থাকাটা জরুরি। ত্বক ভালো থাকলে মেকআপও কম লাগে। শুষ্কতা কমাতে ময়েশ্চারাইজার, প্রয়োজন হলে টোনার বা সিরাম, এরপর প্রাইমার ব্যবহার করে ত্বক প্রস্তুত করা যায়। তারপর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ম্যাট বা অয়েলি ফিনিশের ফাউন্ডেশন বা বেজ ব্যবহার করলে অতিরিক্ত আর কোনো স্তর ছাড়াই মেকআপ সুন্দর বসে।

প্রশ্ন

বর্ষার চোখের সাজে রঙিন শেডগুলোকে স্মার্টভাবে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়?

রঙিন শেড ব্যবহার করার বিষয়টি নির্ভর করে পোশাক ও কোথায় যাচ্ছেন তার ওপর। আমাদের দেশে নীল রংকে বর্ষার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, তাই দিনের বেলায় টিল, অ্যাকুয়া বা ল্যাভেন্ডারের হালকা টান সুন্দর দেখাতে পারে। সন্ধ্যা বা রাতের অনুষ্ঠানে একই রং স্মাজ করে স্মোকি লুক তৈরি করা যায়। পুরো সাজের সঙ্গে রঙের ভারসাম্য রাখলেই রঙিন চোখের সাজ অতিরিক্ত না দেখিয়ে স্মার্ট লাগবে।

প্রশ্ন

পাউডার ব্যবহার না করলে মেকআপ সেট হয় না; আবার বেশি পাউডার দিলে কেকি লাগে। ভারসাম্য আনব কীভাবে?

ওই যে বললাম, ত্বকের অবস্থা বুঝে পাউডার ব্যবহার করবেন। পাউডারের ভারসাম্যপূর্ণ করার মূল নিয়ম হলো ত্বকের অবস্থা বোঝা। শুষ্ক ত্বকে বেশি পাউডার দিলে মেকআপ কেকি দেখাবে, তৈলাক্ত ত্বকে পাউডার না দিলে বেজ দ্রুত নষ্ট হতে পারে। নিজের ত্বকের উপযোগী পদ্ধতি বুঝতে পারলারের পেশাদার মেকআপ পর্যবেক্ষণ করাও কাজে দেয়। সাধারণত পেশাদারেরা তৈলাক্ত ত্বকে পাউডার ব্যবহার করেন, আর শুষ্ক ত্বকে কম ব্যবহার করেন বা এড়িয়ে যান।

ফাউন্ডেশনের বদলে স্কিন টিন্ট, টিনটেড এসপিএফ, বিবি ক্রিম বা সিসি ক্রিম—সবই ব্যবহার করা যায়
প্রশ্ন

বর্ষায় টি-জোন কীভাবে সামলাব?

অধিকাংশ মানুষের টি-জোন সবচেয়ে বেশি তৈলাক্ত থাকে। তাই বর্ষায় খুব হালকা মেকআপ করতে চাইলে পুরো মুখে পাউডার না দিয়ে শুধু টি-জোনে পাউডার ব্যবহার করাও ভালো কৌশল। এতে কপাল, নাক ও থুতনির তেলতেলে ভাব কমে; কিন্তু মুখের অন্য অংশের স্বাভাবিক ফিনিশ বজায় থাকে।

প্রশ্ন

লিপস্টিক, লিপটিন্ট, লিপ অয়েল বা টিনটেড বামের মধ্যে কোনটি বর্ষার দিনে ঠোঁটের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক?

বর্ষার দিনে ঠোঁটের জন্য কোন পণ্য আরামদায়ক হবে, তা মূলত ঠোঁটের ওপর নির্ভর করে। ঠোঁট খুব শুষ্ক হলে লিপ অয়েল বা টিনটেড বাম ব্যবহার করা ভালো। শুষ্ক ঠোঁটে ম্যাট লিপস্টিক এড়িয়ে যান। তবে ঠোঁট সুস্থ ও ময়েশ্চারাইজড থাকলে লিপস্টিক, লিপ টিন্ট বা টিনটেড বাম—যেকোনোটাই ব্যবহার করা যায়।

প্রশ্ন

মেকআপ করা অবস্থায় ঘাম বা বৃষ্টির পানি মুখে পড়লে কী করব?

ঘাম বা বৃষ্টির পানি মুখে পড়লে কখনো ঘষে মুছবেন না। এতে বেজ মেকআপ উঠে যেতে পারে। টিস্যু বা নরম কাপড় দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে ঘাম বা পানি শোষণ করে নিতে হবে। মেকআপের ধরন ভারী হলে পরে পাউডার পাফ দিয়ে খুব হালকা টাচ-আপ করা যায়।

প্রশ্ন

বর্ষায় ৫ মিনিটের সবচেয়ে কার্যকর মেকআপ রুটিন কী হতে পারে?

৫ মিনিটের মেকআপ রুটিন কার্যকর করতে হলে আগে ত্বকের যত্নে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত ফেশিয়াল, ডার্ক সার্কেল বা স্পটের প্রয়োজনীয় ট্রিটমেন্ট, ডে ক্রিম, নাইট ক্রিম ও সানব্লক ব্যবহার করলে ত্বক সুস্থ থাকে। ত্বকের টোন যেমনই হোক, সুস্থ ত্বকে খুব বেশি মেকআপের প্রয়োজন হয় না। বাইরে যাওয়ার আগে সানব্লকের ওপর ২ ড্রপ ফাউন্ডেশন, সামান্য ব্লাশ আর ঠোঁটের পণ্য ব্যবহার করলেই হবে।

বাংলাদেশের বর্ষায় সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য ট্রেন্ড হলো স্কিন মিনিমালিজম ও সফট ম্যাট বেস লুক
প্রশ্ন

২০২৬ সালে রূপচর্চার আন্তর্জাতিক ধারায় স্কিন মিনিমালিজম, হালকা ম্যাট বেস, ক্রিম ব্লাশ, স্মাজড আই ও ব্লার্ড লিপ আছে। কোনগুলো বাংলাদেশের বর্ষায় সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য?

সবই বাংলাদেশের বর্ষায় ব্যবহার করা সম্ভব, তবে সবার জীবনযাত্রা একরকম নয়। কেউ যদি বেশির ভাগ সময় এসি পরিবেশে থাকেন, তাঁর জন্য এসব ধারা অনুসরণ করা সহজ; কিন্তু রোদ, ঘাম, আর্দ্রতা ও হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য একই মেকআপ ধরে রাখা কঠিন। উন্নতমানের প্রসাধনী না হলে এই ট্রেন্ডগুলোর নিখুঁত ফিনিশ পাওয়াও কঠিন; আর এগুলোর দামও বেশি। তাই বাংলাদেশের বর্ষায় সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য ট্রেন্ড হলো স্কিন মিনিমালিজম ও সফট ম্যাট বেস লুক। ত্বক ভালো থাকলে বিবি ক্রিম, সিসি ক্রিম বা সানব্লক দিয়েই সহজে ট্রেন্ডি, আরামদায়ক ও বাস্তবসম্মত লুক তৈরি করা যায়।

প্রশ্ন

ব্লটিং পেপার, টিস্যু, পাউডার পাফ—বর্ষার টাচ-আপে কোনটি কখন ব্যবহার করা উচিত?

টাচ-আপের উপকরণ মেকআপের ধরন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। জমকালো দাওয়াতের মেকআপ হলে পাউডার পাফ সঙ্গে রাখা ভালো। বাইরে ঘাম বা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে টিস্যু ব্যবহার করুন, তবে ঘষে নয়, হালকা চেপে। ব্লটিং পেপার থাকলে তৈলাক্ত অংশে চাপ দিয়ে অতিরিক্ত তেল তুলে নেওয়া সবচেয়ে ভালো উপায়।

গ্রন্থনা: নকশা প্রতিবেদক