
এখন কল ধরার আগেই, এমনকি ফোন কাটার পরও একপলকেই জেনে নেওয়া যায় ওপাশের মানুষটির পরিচয়। ফোনের ওপারে কখনো কখনো প্রতারকও থাকে। ভুয়া পরিচয় দিয়ে কল করে টাকা হাতিয়ে নেয়। ফোনের ওপারের সেই প্রতারকদের চেনাও এখন সহজ। এই সুবিধা দিতেই এক যুগের বেশি আগে যাত্রা শুরু করেছিল ট্রুকলার।
আমাদের ব্যস্ততার শেষ নেই। ডেস্কে ফাইলের স্তূপ, ল্যাপটপে জরুরি মেইল কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। ঠিক তখনই পকেট বা ব্যাগের ভেতর বেজে উঠল স্মার্টফোনটি। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অচেনা এক নম্বর। এই ব্যস্ত সময়ে কলটি কেটে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু মিটিং শেষে যখনই ফোনটি হাতে নেন, প্রশ্ন জাগে—ফোনের ওপারে আদতে কে ছিলেন? জরুরি কোনো ফোন ছিল না তো?
একসময় অচেনা নম্বরের হদিস পেতে আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল ঢাউস সাইজের টেলিফোন ডিরেক্টরি। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে দিন বদলেছে। এখন কল ধরার আগেই, এমনকি ফোন কাটার পরও একপলকেই জেনে নেওয়া যায় ওপাশের মানুষটির পরিচয়। ফোনের ওপারে কখনো কখনো প্রতারকও থাকে। ভুয়া পরিচয় দিয়ে কল করে টাকা হাতিয়ে নেয়। ফোনের ওপারের সেই প্রতারকদের চেনাও এখন সহজ। এই সুবিধা দিতেই এক যুগের বেশি আগে যাত্রা শুরু করেছিল ট্রুকলার।
২০১১-১২ সালের দিকে প্রযুক্তিবিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত অ্যাপগুলোর একটি ছিল ট্রুকলার। অচেনা নম্বরের পরিচয় দেখানোর সুবিধার কারণে অল্প সময়েই এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। নামের মধ্যেই এর কাজের পরিচয় রয়েছে—ট্রু কলার, অর্থাৎ কল যিনি করেছেন, তাঁর প্রকৃত পরিচয়। তবে এখন ট্রুকলার শুধুই কলারের নাম দেখায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্প্যাম কল শনাক্ত করা, অবাঞ্ছিত নম্বর ব্লক করা, প্রতারণামূলক ফোন সম্পর্কে সতর্ক করা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেখানোর মতো নানা সুবিধাও যুক্ত হয়েছে।
২০০৯ সালে সুইডেনের দুই উদ্যোক্তা নামি জারিংহালাম ও অ্যালান মামেদি ট্রুকলার প্রতিষ্ঠা করেন। দুজনই সুইডেনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী ছিলেন। মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য থেকেই তাঁরা নতুন একটি সেবার কথা ভাবেন। তাঁদের ধারণার ভিত্তি ছিল পুরোনো টেলিফোন ডিরেক্টরি।
একসময় প্রয়োজনীয় নম্বর খুঁজতে মানুষ টেলিফোন ডিরেক্টরি ব্যবহার করত। কিন্তু স্মার্টফোনের যুগে সেই ব্যবস্থা কার্যত হারিয়ে যায়।
অন্যদিকে অচেনা নম্বর শনাক্ত করার প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই তাঁরা মোবাইল নম্বরভিত্তিক একটি বৈশ্বিক অনলাইন ডিরেক্টরি তৈরির উদ্যোগ নেন। শুরুতে ট্রুকলার মূলত মিসড কলের নম্বর শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হতো। সে সময় অ্যাপটি শুধু ব্ল্যাকবেরি ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। পরে অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে সেবাটি চালু হলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
ট্রুকলারের সবচেয়ে বড় শক্তি এর তথ্যভান্ডার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি ব্যবহারকারী অ্যাপটি ব্যবহারের সময় নিজেদের কনট্যাক্ট তালিকা, কলসংক্রান্ত তথ্য এবং স্প্যাম রিপোর্ট শেয়ার করেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই তৈরি হয়েছে বিশাল একটি নম্বরভিত্তিক ডেটাবেজ।
ধরা যাক, একই নম্বর হাজারো মানুষের ফোনে প্রায় একই নামে সংরক্ষিত আছে। ট্রুকলার সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে নম্বরটির সম্ভাব্য পরিচয় নির্ধারণ করে। আবার কোনো নম্বরকে যদি বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে সেই তথ্য অন্য ব্যবহারকারীদের কাছেও পৌঁছে যায়।
তবে তথ্য সংগ্রহের কাজটি এতটা সরল নয়। একই নম্বর ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ফোনে ভিন্ন নামে সংরক্ষিত থাকতে পারে। কোথাও বানান ভুল থাকতে পারে, কোথাও সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করা হতে পারে। ট্রুকলারের অ্যালগরিদম এসব তথ্য পর্যালোচনা করে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা করে।
ব্যবহারকারীরা ট্রুকলারে অনেক নম্বর নিয়ে অভিযোগ জানায়। এসব রিপোর্ট ছাড়াও স্প্যাম শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।কোনো নম্বর কত ঘন ঘন কল করছে, কতজন সেই কল গ্রহণ করছে, কতজন কল কেটে দিচ্ছে কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে কতজনকে ফোন করা হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু আচরণগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলে নম্বরটিকে সম্ভাব্য স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নম্বর যদি এক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষকে ফোন করে এবং অধিকাংশ ব্যবহারকারী সেই কল প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে সেটিকে স্প্যাম হিসেবে শনাক্ত করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।কয়েক মুহূর্তেই পরিচয় দেখানো হয় যেভাবেফোনে কল আসার সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটি ট্রুকলারের তথ্যভান্ডারে যাচাই করা হয়। মিল পাওয়া গেলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কলদাতার সম্ভাব্য পরিচয় ব্যবহারকারীর পর্দায় দেখানো হয়।
অনেক সময় কল ধরার আগেই এ তথ্য দেখা যায়। এ জন্য ট্রুকলার দ্রুতগতির অনুসন্ধানপ্রযুক্তি, তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা ও অঞ্চলভিত্তিক সার্ভার ব্যবহার করে। নিয়মিত অনুসন্ধান করা নম্বরগুলোর তথ্য আগে থেকেই সংরক্ষণ করে রাখার ফলে খুব কম সময়েই ফলাফল দেখানো সম্ভব হয়।
ভারতের ব্যবহারকারীদের নিয়ে ট্রুকলারের প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘দ্য স্টেট অব ট্রাস্ট অ্যান্ড অ্যাটেনশন অন ট্রুকলার’-এ ট্রুকলার ব্যবহারকারীদের ব্যবহার প্রবণতা নিয়ে নানা তথ্য আছে।
ট্রুকলারের ২০২৫ এই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, একজন ব্যবহারকারী গড়ে দিনে ২০ বারের বেশি অ্যাপটি খোলে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যবহারকারীদের আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ট্রুকলার অন্যান্য প্রধান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তুলনায় ২৬ থেকে ৩৮ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
এ সুবিধাকে তারা ‘ভেরিফায়েড অ্যাডিটিভ রিচ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রুকলারের প্রতি ১০ জন ব্যবহারকারীর ৮ জনের বয়স ২৫ বছরের বেশি। অর্থাৎ কর্মজীবী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখা মানুষের মধ্যেই অ্যাপটির ব্যবহার বেশি।ব্যবহারকারীদের ৪৭ শতাংশ মহানগর ও প্রথম সারির শহরে বসবাস করে। ট্রুকলারের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা ও ডিজিটাল সেবার ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এসব অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে ব্যবহারকারীর বিস্তার শুধু বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবহারকারীদের ২৩ শতাংশ মহানগরে, ২৪ শতাংশ প্রথম সারির শহরে, ২৬ শতাংশ দ্বিতীয় সারির শহরে এবং ২৮ শতাংশ তৃতীয় সারির শহরে বসবাস করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানগরগুলো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে নেতৃত্ব দিলেও ব্যবহারকারী বৃদ্ধির বড় অংশ আসছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির শহরগুলো থেকে।
ট্রুকলারের ২০২৫ সালের বার্ষিক ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে ট্রুকলারের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর মধ্যে আছে ভারত, মিসর, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ইরাক, ইথিওপিয়া, বাংলাদেশ, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান ও চিলি।
বর্তমানে বিশ্বের ৫০ কোটির বেশি মানুষ ট্রুকলার ব্যবহার করেন কোন কল গ্রহণ করবেন আর কোনটি এড়িয়ে যাবেন, তা জানার জন্য। কলার আইডি, স্প্যাম শনাক্ত ও ব্লক, প্রতারণামূলক কল প্রতিরোধ, কল মি ব্যাক, কল অ্যালার্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ‘ট্রুকলার অ্যাসিস্ট্যান্ট’ সেবাগুলো এর উল্লেখযোগ্য সুবিধার মধ্যে আছে।
এ ছাড়া ভয়েস ক্লোনিংভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তে এআই কল স্ক্যানার, গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আলাদা করে দেখানোর স্মার্ট এসএমএস, স্মার্ট নোটিফিকেশন ও জরুরি বার্তা প্রদর্শনের সুবিধাও আছে।অন্যদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য চালু করা ট্রুকলার ফর বিজনেস সেবার মাধ্যমে যাচাই করা পরিচয় ব্যবহার করে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। ২০২৫ সালে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় ১১ বিলিয়ন ভেরিফায়েড ব্যবসায়িক কল এবং ১৬ বিলিয়নের বেশি ব্যবসায়িক বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপদ থাকতে ট্রুকলার অ্যাপটি ব্যবহারের কিছু নিয়ম মেনে চলা ভালো। এতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনি অন্যরাও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচবেন।
নিজের সঠিক নাম ব্যবহার করুন:
অ্যাপে নিজের আসল নাম ব্যবহার করা উচিত। এতে অন্য কেউ যখন আপনার নম্বরটি দেখবে, তখন সহজেই চিনতে পারবে।
স্প্যাম নম্বর রিপোর্ট করুন:
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা প্রতারণামূলক নম্বর থেকে কল এলে সেটি অ্যাপে ‘স্প্যাম’ হিসেবে রিপোর্ট করুন। আপনার একটি রিপোর্ট অন্য অনেক মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।
প্রাইভেসি সেটিং পরীক্ষা করুন:
অ্যাপের সেটিংসে গিয়ে প্রাইভেসি অপশনটি দেখে নিন। আপনি আপনার তথ্য কাকে দেখাতে চান বা চান না, তা সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
ভুয়া নামে আইডি খুলবেন না:
মজার ছলে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ট্রুকলারে ছদ্মনাম বা ভুয়া নাম ব্যবহার করবেন না। এতে পেশাদার যোগাযোগে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
কারও নম্বরে ভুল ট্যাগ দেবেন না:
ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে পরিচিত কারও নম্বরকে স্প্যাম বা ভুল নামে ট্যাগ করবেন না। এটি ডিজিটাল শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
সব তথ্যের ওপর অন্ধবিশ্বাস নয়:
মনে রাখবেন, ট্রুকলারের নামগুলো মানুষের দেওয়া। তাই মাঝেমধ্যে কোনো নম্বরে ভুল নামও দেখাতে পারে। স্ক্রিনের নামের ওপর ভিত্তি করে তাৎক্ষণিক কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
অননুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড নয়:
ট্রুকলারের পেইড বা প্রিমিয়াম ফিচারগুলো ব্যবহারের জন্য থার্ড-পার্টি বা অননুমোদিত কোনো ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করবেন না। এতে ফোনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সূত্র: ফোর্বস, অ্যালিগেটর, মিডিয়াম