আমাদের শরীরের প্রতিটি কাজ, যেমন ক্ষুধা, ঘুম, মেজাজ ও বিপাক প্রক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করে হরমোন। একে বলা হয় শরীরের ‘রাসায়নিক দূত’। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রায় অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এই ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
আমরা প্রতিদিন কী খাচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের হরমোন–ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে, নাকি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাসা বাঁধবে।
চিনিযুক্ত পানীয়, সাদা চাল বা ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় দ্রুত। এ কারণে অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করতে বাধ্য হয় শরীর। দীর্ঘ সময় ধরে এমনটা চলতে থাকলে শরীর ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি করে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, পিসিওএস ও মেদ বাড়ার মূল কারণ।
ফাস্ট ফুড ও প্যাকেটজাত খাবারে থাকা উচ্চমাত্রার সোডিয়াম ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ কর্টিসল লেভেল ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং বিশেষ করে পেটের মেদ বাড়াতে সাহায্য করে।
ডালডা বা বারবার গরম করা তেলেভাজা খাবারে থাকে ট্রান্স ফ্যাট। এটি শরীরের উপকারী কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় এবং হরমোন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এটি ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।
প্লাস্টিক প্যাকেজিং ও কেমিক্যাল: প্লাস্টিকের কনটেইনারে গরম খাবার রাখা বা প্লাস্টিকের বোতলে পানি পানের ফলে ‘বিসফেনল-এ’ নামক ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করে। এই কেমিক্যালগুলো শরীরের এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে স্বাভাবিক হরমোনের কাজে বিঘ্ন ঘটায়।
অতিরিক্ত চা-কফি পানে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি উত্তেজিত হয়, বাড়িয়ে দেয় কর্টিসল। অন্যদিকে অ্যালকোহল লিভারের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে শরীর থেকে বাড়তি ইস্ট্রোজেন বের হতে পারে না। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই হরমোনজনিত জটিলতা তৈরি করে।
১. হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া।
২. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়া।
৩. ত্বকে ব্রণ ও অস্বাভাবিক চুল পড়া।
৪. নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিক।
৫. রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব বা ইনসমনিয়া।
আঁশযুক্ত খাবার: প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল কর্টিসল লেভেল কমিয়ে হরমোন ভারসাম্যপূর্ণ করতে সাহায্য করে।
বীজ ও বাদামের জাদুকরি ভূমিকা: তিসি বা ফ্ল্যাকস সিড প্রজেস্টেরন হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। তিলের ‘ফাইটোয়েস্ট্রোজেন’ ইস্ট্রোজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার সূর্যমুখী ও কুমড়ার বীজ থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। বাদামের স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ: আমাদের শরীরের বেশির ভাগ হরমোনই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, ডাল বা মুরগির মাংস রাখা অপরিহার্য। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত।
চিনি বর্জন ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম: প্রক্রিয়াজাত চিনি পুরোপুরি পরিহার করে দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম হরমোন নিয়ন্ত্রণে ওষুধের মতো কাজ করে।
হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখা কেবল সাময়িক সুস্থতা নয়; বরং দীর্ঘ জীবনেরও চাবিকাঠি। আজকের সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই আগামীর রোগমুক্ত ও প্রাণবন্ত জীবন নিশ্চিত করবে।