হার্টের রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হলে যে রোগ হয়, তাকে বলে করোনারি হৃদ্রোগ। এর সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো, বুকে চাপধরা ব্যথা। অনেক সময় প্রথম লক্ষণই হতে পারে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। এমন পরিস্থিতিতে অ্যানজিওগ্রাম করার দরকার হতে পারে। অ্যানজিওগ্রাম করলে কয়টা রক্তনালিতে কতটা এবং কী ধরনের ব্লক আছে, ধরা পড়ে। অ্যানজিওগ্রামের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঠিক করা হয় চিকিৎসা—ওষুধ, রিং (স্টেন্ট) নাকি ওপেন হার্ট (বাইপাস) অপারেশন।
বাইপাস অপারেশনে ব্লক হওয়া রক্তনালিকে সরাসরি খোলা হয় না; বরং শরীরের অন্য জায়গা থেকে শিরা বা ধমনি নিয়ে নতুন একটি বিকল্প পথ তৈরি করা হয়, যাতে রক্ত সহজে হার্টে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ পুরোনো ব্লকটিকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাস্তা বানানোই এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য।
এককথায়, না। বাইপাস করলেই সারা জীবনের জন্য নিশ্চিন্ত—এমন ধারণা ভুল। করোনারি হৃদ্রোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। রক্তনালির ভেতরে চর্বি, কোলেস্টেরল ও রক্তের অন্যান্য পদার্থ জমে ধীরে ধীরে রক্তনালি সরু হয়ে যায়। একবার এই প্রক্রিয়া শুরু হলে পুরোপুরি তা থামিয়ে দেওয়া যায় না, বিশেষ করে যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল থাকে এবং কেউ যদি ধূমপান না ছাড়ে।
ওপেন হার্ট বা বাইপাসের পরও নতুন করে সমস্যা হওয়ার কয়েকটি কারণ হলো—
নতুন ব্লক: আগে যেসব রক্তনালিতে সমস্যা ছিল না, সময়ের সঙ্গে সেখানে নতুন করে ব্লক হতে পারে।
বাইপাসের পথেই ব্লক: যে নতুন রক্তনালি দিয়ে বিকল্প পথ তৈরি করা হয়, সেটিও সময়ের সঙ্গে সরু বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে শিরা দিয়ে তৈরি নতুন বিকল্প পথে।
পুরোনো ছোট ব্লকের বৃদ্ধি: অপারেশনের সময় সব ব্লক একসঙ্গে বাইপাস করা সম্ভব হয় না। ছোট বা জটিল ব্লকগুলো পরে বড় হয়ে আবার সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অনেক রোগী মনে করেন, ‘অপারেশন হয়ে গেছে, এখন আর ওষুধ বা নিয়ম মানার দরকার নেই।’ এটাই বড় ভুল। কারণ, ওষুধ বন্ধ করলে দ্রুত তৈরি হতে পারে নতুন ব্লক।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। ধূমপান নতুন রক্তনালিকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে রক্তনালি আবার সংকুচিত হতে থাকে।
হ্যাঁ, প্রয়োজন হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাইপাস অপারেশনের ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ রোগীর আবার অ্যানজিওগ্রাম করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রিং (স্টেন্ট) বসানোর প্রয়োজন পড়ে। যদি অপারেশনের পর আবার বুকে ব্যথা হয় বা নতুন করে হার্ট অ্যাটাক হয়, তাহলে অ্যানজিওগ্রাম করে দেখা লাগতে পারে।
এতে বোঝা যায়—
নতুন ব্লক হয়েছে কি না।
বাইপাসের তৈরি পথ খোলা আছে কি না।
যদি ব্লক এমন হয়, যা রিং বা স্টেন্ট দিয়ে ঠিক করা সম্ভব, তাহলে ওপেন হার্টের পরও রিং লাগিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
বাইপাস একটি অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা। এটি উপসর্গ কমায়, জীবনমান বাড়ায়, অনেক ক্ষেত্রে আয়ুও বাড়ায়। কিন্তু এটিকে স্থায়ী সমাধান ভাবলে ভুল হবে। বরং অপারেশনের পরই শুরু হয় আসল দায়িত্ব। বাইপাস সার্জারির পর জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে—
নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।
রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটতে হবে।
নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে।
ওপেন হার্ট মানেই সমস্যার শেষ নয়। নতুন জীবনের শুরু। সচেতনতা, নিয়ম মেনে চলা ও সময়মতো পরীক্ষা—এই তিনটিই পারে আপনাকে দ্বিতীয়বার বড় ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে।