সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর দুশ্চিন্তা না করার জন্য নিজের মধ্যে একটি সীমা তৈরি করা দরকার
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর দুশ্চিন্তা না করার জন্য নিজের মধ্যে একটি সীমা তৈরি করা দরকার

অতিরিক্ত চিন্তা থামানোর কৌশল ‘৬:৩০ নিয়ম’

এই অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাস থেকে কিছুটা বের হতে কাজে লাগতে পারে ‘৬: ৩০ নিয়ম’। অর্থাৎ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর দুশ্চিন্তা না করার জন্য নিজের মধ্যে একটি সীমা তৈরি করা। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কীভাবে কাজ করে ‘৬: ৩০ নিয়ম’।

সংসারের খরচ, চাকরি–বাকরি, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন—জীবনে ভাবনার বিষয় কম নয়। নানা দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে চিন্তা এসেই যায়। কিন্তু কোনো একটি বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে ভাবতে যখন একই চিন্তার মধ্যে আটকে পড়েন, তখন তা হয়ে উঠতে পারে অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাস। একটি ভাবনা থেকে আরেকটি ভাবনা, সেখান থেকে পুরোনো কথায় ফিরে যাওয়া, এভাবে চলতে থাকে চিন্তার অন্তহীন চক্র।

প্রতিদিনের ব্যস্ততায় এসব চিন্তা কিছুটা দূরে রাখা গেলেও রাতে বিছানায় যাওয়ার পর অনেকের মনে সেসব আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ফলে ঘুমাতেও দেরি হয়, মনও সহজে শান্ত হতে চায় না।

এই অতিরিক্ত চিন্তার অভ্যাস থেকে কিছুটা বের হতে কাজে লাগতে পারে ‘৬: ৩০ নিয়ম’। অর্থাৎ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর দুশ্চিন্তা না করার জন্য নিজের মধ্যে একটি সীমা তৈরি করা। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কীভাবে কাজ করে ‘৬: ৩০ নিয়ম’।

‘৬: ৩০ নিয়ম’ কী?

কানাডার মনোরোগ চিকিৎসক ভিক্টোরিয়া ডোনাহুর মতে, কোনো বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলে অনেক সময় মনে হয়, আমরা বুঝি সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। কিন্তু বাস্তবে একই চিন্তার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। ‘৬: ৩০ নিয়ম’ অনেকটা ‘ওয়ারি শিডিউলিং’ পদ্ধতির মতো। এটি মূলত দুশ্চিন্তা কমানোর একটি কৌশল।

এতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় রাখা হয়, যখন বারবার যে চিন্তাগুলো ফিরে আসে, সেসব নিয়ে ভাবা। এটি কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (সিবিটি) নীতির ওপরও ভিত্তি করে তৈরি। এই থেরাপিতে নেতিবাচক চিন্তা ও আচরণের ধরন পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত চিন্তা যদি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটির ফারকফ গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক এলি ক্রেইম বলেন, ‘দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর করার চেষ্টা না করে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা এর জন্য বরাদ্দ করাই এই কৌশলের উদ্দেশ্য। এতে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক শিখতে পারে, প্রতিটি উদ্বেগের চিন্তার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

সমস্যা সমাধান নাকি শুধু চিন্তা?

‘৬: ৩০ নিয়ম’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাস্তব সমস্যা সমাধান ও একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবার মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। সন্ধ্যার পর কোনো চিন্তা মাথায় এলে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘এ বিষয়ে আজ রাতে আমি আসলে কিছু করতে পারি কি?’

যদি করার মতো কিছু থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আর যদি কিছুই করার না থাকে, তাহলে নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে, এখন একই বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকলেও সমস্যার সমাধান হবে না।

দুশ্চিন্তা ও কম ঘুম থেকেও শরীরে নানা সমস্যা হতে পারে। মডেল: জুলফিকার

উদাহরণস্বরূপ, অফিস থেকে ফেরার পর মনে পড়ল, পরদিন একজন সহকর্মীকে ফোন করতে হবে। রাতভর ‘ফোনটা যদি করতে ভুলে যাই’—এমন চিন্তা না করে ফোন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে রাখা যায়। যেমন, নিজেকে বলুন, ‘আগামীকাল সকাল ৮টায় ফোনটা করব।’ এতে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে, বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে না।

কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও একই পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে। রাতে বারবার সেই ঘটনার কথা না ভেবে পরদিন শান্তভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, ‘এটা নিয়ে এখন আর কিছু ভাবব না, কাল কথা বলব।’

ঘুমের জন্যও উপকারী হতে পারে

ক্রেইমের মতে, ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টা যদি মানসিক চাপ ও নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেটে যায়, তাহলে মস্তিষ্কের ‘ঘুমের মোডে’ যাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই ঘুমের আগে মানসিক ও আবেগগত উত্তেজনা কমিয়ে রাখা ঘুমানো সহজ করতে পারে।

তাই যাঁরা রাত ১০টায় ঘুমাতে যান, তাঁরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা বা ৭টার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে চিন্তা না করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। তবে যাঁরা রাতের শিফটে কাজ করেন বা সন্ধ্যার পর ব্যস্ত থাকেন, তাঁরা নিজেদের ঘুমের সময় অনুযায়ী এই সীমা ঠিক করে নিতে পারেন।

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আমাদের ভেতরের ইতিবাচকতাকে খেয়ে ফেলে

৬: ৩০ নিয়ম কীভাবে অনুশীলন করবেন

নির্ধারিত সময়ে দুশ্চিন্তা না করাটা অনেকের কাছেই কঠিন হতে পারে। তাই সে সময় অন্য কোনো আনন্দদায়ক কাজে ব্যস্ত রাখুন। সন্ধ্যায় প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন অথবা নতুন কোনো শখ ও আগ্রহের বিষয়ে সময় দিতে পারেন। ডোনাহু বলেন, ‘৬: ৩০ নিয়ম আমাদের সন্ধ্যার সময়টা ফিরিয়ে দেয়। ফলে আমরা সম্পর্কের প্রতি আরও মনোযোগী হতে পারি। একই সঙ্গে যোগাযোগ ও আনন্দের জন্যও সময় বের করার সুযোগ তৈরি হয়।’

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর কোনো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলে তা সামলানোরও কিছু উপায় আছে। এ বিষয়ে ক্রেইম নিজেকে প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন, ‘এ বিষয়ে আজ রাতে আসলে কিছু করার আছে কি?’

যদি থাকে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। আর যদি কিছু করার না থাকে, নিজেকে মনে করিয়ে দিন, বিষয়টি নিয়ে বারবার ভাবলেও সমস্যার সমাধান হবে না।

সবশেষে

অতিরিক্ত চিন্তা যদি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয় এবং তা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এটি যদি ঘুম, কাজ বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: রিয়্যাল সিম্পল